অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    অকৃতদার নিঃসঙ্গ অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন মরমী ও নিজস্ব জীবনবৃত্তের রূপাকার – তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘তিতাস একটি নদীর নাম‘ । মাতৃপিতৃহীন অদ্বৈত বরাবরই নিজেকে আড়ালে রাখতে ভালবাসতেন । অপরদিকে মেধাবী ছাত্র হয়েও কলেজের পড়া ছেড়ে অর্থোপার্জনের জন্য কলকাতায় এসে ‘ত্রিপুরা’ পত্রিকায় কর্মজীবন শুরু করেন । কলকাতায় আসার পর নরেন্দ্রনাথ মিত্র , সাগরময় ঘোষ ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় । ‘দেশ’ ,  ‘নবশক্তি’ ,  ‘মোহাম্মদী’ ,  ‘নবযুগ’ , ‘আজাদ’ প্রভৃতি পত্রিকায়ও তিনি কাজ করেছেন । বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা বেরোলেও চারের দশকে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতির পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত  ‘এক পয়সায় একটি ‘ গ্রন্থ সিরিজে লিখে তিনি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন ।

তিতাস একটি নদীর নাম

         তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম‘ তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৫৬-তে প্রকাশিত হয় । তাঁর অন্যান্য উপন্যাস হল ‘রাঙামাটি’ (‘চতুষ্কোণ’ পত্রিকায় ১৩৭১ সনের বৈশাখ থেকে চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশিত), ‘শাদা হাওয়া’ (‘সোনার তরী’ পত্রিকায় ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে) । তাঁর কযেকটি ছোটগল্প হল ‘স্পর্শদোষ’ , ‘সন্তানিকা’ , ‘বন্দী বিহঙ্গ’ , ‘কান্না’ । এছাড়া অনুবাদমূলক রচনা  ‘জীবনতৃষ্ণা’ (Irving Stone-এঁর Lust For Life-এর অনুবাদ) ও বহু শিশুপাঠ্য রচনা তিনি লিখেছেন ।

       লেখকের মৃত্যুর পর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে আশ্বিন মাসে প্রকাশিত হয় । বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসের ধারায় এই উপন্যাস অনন্য সংযোজন – ‘পদ্মানদীর মাঝি‘ ও সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা‘-র সঙ্গে। ‘তিতাস…’-এর কথাবস্তু চারটি খন্ডে বিন্যস্ত – ১) তিতাস একটি নদীর নাম , প্রবাস খন্ড , ২)  নয়া বসত , জন্মমৃতুবিবাহ , ৩) রামধনু , রাঙা নাও , ৪) দু-রঙ প্রজাপতি , ভাসমান ।

উপন্যাসের গঠন বিন্যাস সর্ম্পকে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন : উপন্যাসটির গঠন নির্দোষ নহে । উহার গঠন বিন্যাস এককেন্দ্রিক নহে , বহু স্তর বিভক্ত , উহার  প্রধান চরিত্রসমুহ বিভিন্ন  পর্যায় বিভিন্ন  ।  উহার ঘটনা পরণতিও নানা  বিচ্ছিন্ন , কিন্তু একভাব  সূত্র  গথিত আখ্যানের যোগফল  , কোন  বিশেষ  চরিত্রের অনিবার্য  ক্রমবিকাশাভমুখী  নহে ।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ -এর চরিত্রগুলি গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে । এই উপন্যাস তাই এক বিরাট চরিত্র চিত্রশালা – তা গণজীবনের বিচিত্রা । এই জীবন নারী পুরুষ সব শ্রেণীর মানুষের সমাবেশে গঠিত । মালোদের প্রতিনিধি স্থানীয় চরিত্র কিশোর ।  রোমান্টিক কিশোর  তিতাসের কলোচ্ছল প্রবাহের মতো উজ্জ্বল , সে চিরকিশোর । মন তার তরতাজা ,  হৃদয় তার  প্রেমে ভরপুর , পরোপকার প্রবৃত্তিতে তার প্রাণ উচ্ছ্বসিত । একদিকে তার সৌন্দর্যপিপাসু দৃষ্টি , অন্যদিকে মালো সমাজের মানুষের মঙ্গল করবার বাসনা – এই দুই দিকই ঔপন্যাসিক  চিত্রিত করেছেন নিপূণভাবে ।

সুবল কিশোরের সঙ্গী হিসেবে উপন্যাসে আবির্ভূত হলেও কিশোরের থেকে চরিত্রটি স্বতন্ত্র । তার বন্ধুপ্রীতি , ধর্মাধর্মবোধ , হিতাহিতজ্ঞান প্রভৃতি চরিত্রটিকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করেছে । আবার কিশোর বালক অনন্ত মালোদের পরিবারচ্যূত প্রায় নিঃসঙ্গ এক বালক , যার পিতৃপরিচয সে জানে না । বাল্যকালে মাতৃহারা , অপরের দয়াদাক্ষিণ্যে যে মানুষ হয়েছে এমন এক শিশু সন্তান এই অনন্ত । তবুও অনন্তর চোখভরা বিস্ময় , এই বিস্ময় এই জগৎ ও জীবন সম্পর্কে । অনন্ত ‘পথের পাঁচালী’র অপুর মত রোমান্টিক দ্রষ্টা  । দু’জনের দৃষ্টিতে প্রকৃতি ও মানুষ অভিন্নভাবে ধরা দিয়েছে । তিতাসের অনন্ত  প্রবাহের সংকেত হল অনন্ত । এই জীবনপ্রবাহের সূত্রে এসেছে অনন্তর কাছে অনন্তবালা । নিপূণ এই বুনন অদ্বৈতের । এই অনন্তর মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনের দিকটিকে স্পষ্ট করেছেন অদ্বৈত । এই পরিবর্তন জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে , অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ।

     তিতাসের নায়িকা দু’জন – তাদের একজনের উপস্থিতি নামহীন , অন্যজনের উপস্থিতি নামমাত্র ।  নারী হিসেবে তারা ব্যক্তিত্বহীন নয় – তাদের কার্যকলাপও কাহিনীতে নেই এমন নয় , কিন্তু তারা হয়ে উঠেছে অনন্তর মা, বাসন্তী – সুবলার বউ অনন্তর মাসী ( অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস একটি নদীর নাম – অচিন্ত্য বিশ্বাস ।)

মালোদের লোকসংস্কৃতির সরূপ জীবন্তরূপ পেয়েছে এই উপন্যাসে । লোকসংস্কৃতি , মাঘমন্ডলের ব্রতের গান ( লও লও সুরজ ঠাকুর লও তোষের জল, / মাপিয়া জুখিয়া দিমু সপ্ত আঁজল ।) , লোকসংস্কার , লোকবিশ্বাস প্রভৃতি উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে চরিত্রের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে । যেমন , শ্রাবণ মাসে মনসাপূজাকে কেন্দ্র করে মালোপাড়ার মেয়েটা এক অভিনব বিবাহের আয়োজন করে । এর নাম নাম জালাবিয়া । নিজস্ব সংস্কৃতির প্রকাশে লোকভাষার ব্যবহারও তাৎপর্যপূর্ণ । যেমন – মাগন সরকারের কাছে কাদির জিজ্ঞাসা করবে –

 তার চোখে চোখ রাইখ্যা জিগামু – তার ইমানের কাছে জিগামু , আমার বাড়ির গোপাট দিয়া যাইবার সময় তারে বিনা খতে টাকা দিছি – সেই কথাটা মনে আছে কিনা ।

– যদি কয় মনে নাই ?

–  পারব না । মহুরী পারব না । আমার এই চোখের ভিতর দিয়া আল্লার গজব তারে পোড়াইয়া খাক করব । কি সাধ্য আছে তার, এই রক্ম দিনে ডাকাতি ,  হাওরে ডাকাতি করব ?

অদ্বৈতের প্রখর ইতিহাস চেতনার পরিচয় এই উপন্যাসের শেষে মালোদের অধিকার বজায় রাখার প্রসঙ্গে । তারাশঙ্করের ‘কালিন্দী’ উপন্যাসে কালিন্দীর জেগে ওঠা চরকে কেন্দ্র করে যে দ্বন্দ্ব তারই ভিন্ন রূপ পাই এই উপন্যাসে । তিতাসের চর জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মালোদের তার উপর অধিকারের দিন শেষ হয়ে যায় । কারন মালোদের অধিকার জলের উপর , জল শুকিয়ে গেলে সেই অধিকার তারা হারায় । উপন্যাসের শেষে তাই দেখা যায় মালোদের পরিণতির চিত্র :

অনেক মালো পরিবার গ্রাম ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে ।  যারা আগেই গিয়াছে তারা ঘর দুয়ার জিনিসপত্র নৌকাতে বোঝাই করিয়া লইয়া গিয়াছে । যারা পরে গিয়াছে তারা ঘরদুয়ার জিনিসপত্র ফেলিয়াই গিয়াছে । তারা কোথায় গেল যারা রহিয়া গিয়াছে তারা জানিতেই পারলো না । তারা কতক গিয়াছে ধানকাটায় ,  কতক গিয়াছে  বড় নদীর পারে । সেখানে বড় লোকেরা মাছ ধরার বড় রকমের আয়োজন করিয়াছে ।  মালোরা সেখানে খাইতে পাইবে আর নদীতে তাদের হইয়া  মাছ ধরিয়া  দিবে ।

তাঁর ‘রাঙামাটি‘ উপন্যাসটি ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ রচনা – তখন তিনি ‘নবশক্তি‘ পত্রিকার সম্পাদক । উন্যাসের বিষয় প্রেম । এ বিষয়ে অচিন্ত বিশ্বাসের আলোচনার সূত্রাবলী হল :

 ক) দু’টি নরনারীর আকর্ষণ-বিকর্ষণ-ঈর্ষা-অভিমান-অহঙ্কার-উপেক্ষা-বিতৃষ্ণা প্রভৃতির টানাপোড়েন কিভাবে একমুখী প্রেমের জন্ম দিলো , রেণুকা ব্যানার্জী কিভাবে নবকুমারকে গ্রহণ করে জীবনের পথ খুঁজে পেল, তারই রম্যকাহিনী ‘রাঙামাটি’ ।

খ) পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকৃত অনুকরণ যে কত বিভ্রান্তিকর নগর কলকাতার পাশ্চাত্য ভাবাদর্শের অন্ধ অনুকারী অভিজাত স্মাজের কদর্যতা থাকে কত মিথ্যা গ্লানির জন্ম দিতে পারে অদ্বৈত সেইকথা সার্থকভাবে উপন্যাসে ছড়িয়ে দিয়েছেন ।

গ) ‘রাঙামাটি’ অদ্বৈতের কল্পনার এক ‘ইউটোপিয়া’ । … সমাজ পূনর্গঠন তথা অন্ত্যোর্দয়ের পথ সন্ধান করতে গিয়ে অদ্বৈত খুঁজে পেয়েছেন  তাঁর ‘রাঙামাটি’ ।

ঊপন্যাসের নায়ক নবকুমার রাঙামাটির আদর্শ বহন করে চলেছে । গ্রামীন জীবনের পূনর্গঠনের ইচ্ছা তার মধ্যে যথেষ্ট । এছাড়া পরনিন্দা ও পরচর্চা পটীয়সী জ্ঞানদা , ম্লান বেদনাতুর বিনয়েন্দ্র , ব্যর্থ প্রেমিক হিরণ , স্নেহশীলা , অভিমানিনী , ব্রজরানী , রেণুকা , মনোরমা প্রভৃতি চরিত্রগুলিও নিপূণ তুলিতে অঙ্কিত ।

শাদা হাওয়া‘ উপন্যাসটি ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে শারদ সংখ্যায় ‘সোনার তরী‘ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় উপন্যাসটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে । গ্রন্থটির শ্রেণী সম্বন্ধে লেখক নিজেই জানিয়েছেন –

নারী মাংস সম্পর্কে জীলের যদি টমের মত অত বুভুক্ষা থাকতো তাহলে জেনকে মাঝে রেখে দুই বন্ধুর মধ্যে রীতিমত নাটকীয় সংঘাত জেগে উঠতে পারত । তাতে এ কাহিনী একটি চিত্তাকর্ষক উপন্যাসের মর্যাদা পেত । তা যখন হয়নি , তখন পাঠকগণকে এ  কাহিনীতে উপন্যাসের রস  উপভোগে বঞ্চিতই থাকতে হল ।

উপন্যাসের সংহত রচনারীতিতে মাত্র চারটি পরিচ্ছেদে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা  ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূহুর্তের সঙ্গে বিশ্বরাজনীতির গতি-প্রকৃতিকে উপস্থাপিত করেছেন । চারটি পরিচ্ছেদের মধ্যে প্রথমটির নাম নেই । পরের তিনটি পরিচ্ছেদের নাম ‘সেন্টিমেন্টাল টম’ , ‘শ্রমিক নেতার স্বপ্ন’ এবং ‘গুডবাই জীল’ । দেশী ও বিদেশী দুই ধরনের চরিত্র এসেছে কাহিনীতে ।

গুপ্তচর গোবিন্দ শর্মা , জেন , টম , জীল , শ্রমিক নেতা বিনয় বাগচী , মতিলাল ও অচিন্ত্য এরাই প্রাধান চরিত্র । এর মধ্যে জেন বিদেশিনী । বিনয় বাগচী প্রভাবশালী মননশীল ব্যাক্তীত্ব – তার মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনের সৎ নেতার ভূমিকাকে লেখক উপস্থাপিত করেছেন । উপন্যাসটিতে গ্রাম ও শহরের সম্পর্ক , প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্ক , দেশীয় বিদেশী রাজনীতি , সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বক্তব্য স্থান পেয়েছে । তিনি উপন্যাসে সমকালীন ঔপনিবেশিক নীতির কুফলকে মেলে ধরেছেন । নামকরণের মধ্যেও রয়েছে সেই ভাবাদর্শ । শাদা হওয়ার অর্থ হল সেই ভাবাদর্শ , যা মানুষকে বদলে দেয় । সারা পৃথিবীতে শ্বেতাঙ্গদের কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি যে আচরণ তা তিনি সমর্থন করতে পারেননি ।

ছোটগল্প রচনায়ও তার কৃতিত্ব প্রশংসনীয় । তিনি মঁপাসার গল্পরীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন । ‘সন্তানিকা’ গল্পে চিত্রীত হয়েছে নারীর সন্তান স্নেহের দিকটি । গল্পের মুখ্য চরিত্র নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধ ধনঞ্জয় ঘোষাল । স্নেহকাতর মানুষের তীব্র বেদনাবোধ গল্পের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে । অন্যদিকে ‘স্পর্ষদোষ‘ গল্পে বন্ধুত্ব ও সাহচর্যের স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে –

মানুষের বন্ধুত্ব ও সাহচর্যে জীবনের ভজা অনেক পাইয়াছি । অবস্থা বিপর্যয়ে মানুষ তাহাকে পর করিয়াছে । এখন ইতর জীবের সঙ্গে বন্ধুত্বে তাহার আপত্তি নাই ।

ভজা ও খেকির মাধ্যমে শ্রমজীবি মানুষ যে ভিক্ষুকে পরিণত হচ্ছে , সেই নিষ্ঠুর দিকটিকে উপস্থাপিত করেছেন লেখক ।

কান্না‘ গল্পটি মানবিক । গুরুদয়ালের কান্না-ই গল্পের কথাবস্তু । দুই বউয়ের মৃত্যুতে নিঃসঙ্গ গুরুদয়ালের আক্ষেপ গল্পে স্থান পেয়েছে ।

 

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের জন্য বাংলা উপন্যাস-সাহিত্যে তাঁর খ্যাতি । স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সেই জনপ্রিয়তা পেয়ে যেতে পারেননি । তবুও তাঁর এই কীর্তি পাঠক মহলে স্মরনীয় হ্যে থাকবে ।

~ দেবেশ দাস

তিতাস একটি নদীর নাম – download e- book

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *