উপনিষদ – রামমোহন রায়

সম্পাদক সমীপেষু ,

বাংলাদেশে বেদ উপনিষদের চর্চা যখন প্রায় লোপ পেয়েছিলো , সেই সময় রাজা রামমোহন রায় পাঁচটি উপনিষদ অনুবাদ ও ব্যখ্যাসহ বাংলাভাষায় প্রকাশিত করে ভারতীয় আধ্যাত্মসাধনার শ্রেষ্ঠত্য বাংলা দেশে পুনঃ প্রচারিত করেছিলেন ।

উপনিষদের মধ্যে দশখানি অতি  প্রাচীন এবং শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য তাদের ভাষ্য  রচনা করেছিলেন । এই দশটির মধ্যে পাঁচ টি উপনিষদের বাংলা অক্ষরে মূল শ্লোক এবং বাংলাভাষায় ব্যখ্যা রাজা রামমোহন রায়ই প্রথম প্রকাশ করেন।

এই প্রচ্ছদে পাঁচটি উপনিষদ, – কেন, ইশ, কঠ, মুন্ডক ও মান্ডুক্য, একে একে প্রকাশিত হবে ।

 

১৩৩৬ সালে  শ্রীসুধিরলাল বান্দ্যপাদধ্যায় রাজা রামমোহন রায়ের এই পাঁচটি উপনিষদ ছোট আকারে প্রকাশ করেছিলেন । সে বই টি এখন আর পাওয়া যায় না ।

Raja Rammohan Roy

তলবকার উপনিষদ

বা

কেনোপনিষদ

       ওঁ তৎসৎ। সামবেদের তলবকার উপনিষদের ভাষা বিবরণ ভগবান ভাষ্যকারের ব্যখ্যানুসারে করা গেল। বেদে তে যে যে ব্যক্তির প্রামান্য জ্ঞান আছে, তাঁহারা ইহাকে মান্য এবং গ্রাহ্য অবশ্যই করিবেন; আর যাহার নিকট বেদ প্রমান নহেন তাহার সহিত সুতরাং প্রয়োজন নাই।

     ওঁ তৎসৎ। কেনেষিতং ইত্যাদি শ্রুতিসকল সামবেদিয় তলবকার শাখার নবম অধ্যায় হয়েন। পুর্‌ব্ব পুর্‌ব্ব অধ্যায়ে কর্ম এবং দেবোপাসনা কহিয়া এ অধ্যায়ে শুদ্ধ ব্রহ্মততত্ব কহিতেছেন; অতএব এ অধ্যায়কে উপনিষৎ অর্থাৎ বেদ-শিরােভাগ কহা যায়। এ সকল শ্রুতি ব্রহ্মপর হয়েন, কর্ম্মপর নহেন। শিশ্যের প্রশ্ন ও গুরুর উত্তর কল্পনা করিয়া এই সকল শ্রুতিতে আত্মতত্ম কহিয়াছেন। ইহার তাৎপর‍র্য এই যে , প্রশ্ন ও উত্তর রূপে যাহা কহা যায় তাহা অনায়াস বোধ হয়; আর দ্বিতীয় তাৎপর্য্য এই যে , প্রশ্ন ও উত্তরের দ্বারা জানাইতেছেন যে, উপদেশ ব্যাতিরেকে কেবল তর্কেতে ব্রহ্মতত্ব জানা যায় না।

 কেনেষিতং পততি প্রেষিতং মনঃ

                                        কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্ত।

কেনেষিতাং বাচমিমাং বদন্তি

                                    চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবো যুনক্তি।।১।।

    কোন্‌ কর্ত্তার ইচ্ছামাত্রের দ্বারা মন নিযুক্ত হইয়া আপনার বিষয়ের প্রতি গমন করেন অর্থাৎ আপন বিষয়ের চিন্তা করেন; আর কোন্‌ কর্ত্তার আজ্ঞার দ্বারা নিযুক্ত হইয়া সকল ইন্দ্রিয়ের প্রধান যে প্রাণ-বায়ু তিনি আপন ব্যাপারে প্রবর্ত্ত হয়েন ; আর কার প্রেরিত হইয়া শব্দরূপে বাক্য নিঃসরণ হয়েন যে বাক্যকে লোক কহিয়া থাকেন; আর কোন্‌ দীপ্তিমান কর্ত্তা চক্ষুঃ ও কর্ণকে উহাদের আপন আপন বিষয়েতে নিয়োগ করেন।।১।।

শিষ্‌য এইরূপে জিজ্ঞাসা করিলে পরে গুরু উত্তর করিতেছেন।

শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং মনসো মনো যদ্বাচো হ

বাচং স উ প্রাণস্য প্রাণঃ চক্ষুষশ্‌চক্ষুরতিমুচ্য

ধীরাঃ প্রেত্যাস্মাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি।।২।।

তুমি যাঁহার প্রশ্ন করিতেছ, তিনি শ্রোত্রের শ্রোত্র হয়েন এবং অন্তঃকরণের অন্তঃকরণ, বাক্যের বাক্য প্রাণের প্রাণ, চক্ষুর চক্ষু হয়েন, অর্থাৎ যাঁহার অধিষ্ঠানে এই সকল ইন্দ্রিয় আপন আপন কার্য্যেতে প্রবর্ত্ত হয়, তিনি বাহ্ম হয়েন। এই হেতু শ্রত্রাদির স্বতন্ত্র চইত্ন্যা আছে এমন জ্ঞান করিবে না। এইরূপে ব্রাহ্মকে জানিয়া আর শ্রোত্রাদিতে আত্মভাব ত্যাগ করিয়া জ্ঞানীসকল এ সংসার হইতে মৃত্যু হইলে পর মুক্ত হয়েন ।।২।।ন তত্র চক্ষুর্গচ্ছতি ন বাগ্‌গচ্ছতি নোমনো ন

বিদ্মো ন বিজানীমো যথৈতদনুশিষ্যাদন্যদেব

তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি ইতি শুশ্রুম

পূর্ব্বেষাং যে নস্তদ্ব্যাচ্চক্ষিরে।।৩।।

      যেহেতু ব্রহ্ম জ্ঞানেন্দ্রিয়সকলের জ্ঞানেন্দ্রিয় স্বরুপ হইয়াছেন এই হেতু চক্ষুঃ তাঁহাকে দেখিতে পায়েন না, বাক্য তাঁহাকে কহিতে পারেন না, আর মন তাঁহাকে কহিতে পারেন না, আর মন তাঁহাকে ভাবিতে পারেন না এবং নিশ্চয় করিতেও পারেন না। অতএব শিষ্যকে কি প্রকারে ব্রহ্মের উপদেশ করিতে হয় তাহা আমরা কোন মতে জানি না। কিন্তু বেদে এক প্রকারে উপদেশ করেন যে, যাবৎ বিদিত বস্তু অর্থাৎ যে যে বস্তুকে জানা যায় তাহা হইতে এবং অবিদিত হইতে, অর্থাৎ ঘট পটাদি হইতে ভিন্ন হইয়া ঘট পটাদিকে যে মায়া প্রাকাশ করেন সে মায়া হিতেও ভিন্ন ব্রহ্ম হয়েন। তর্ক এবং যজ্ঞাদি শুভকর্ম্মের দ্বারা জ্ঞানগোচর হয়েন না; কিন্তু এইরূপ আচার্য্যের কথিত যে বাক্য তাহার দ্বারা এক প্রকারে তাঁহাকে জানা যায়। ইহা আমারা পূর্ব্ব আচার্য্যদের মুখে শুনিয়া আসিতেছি, যে আচার্য্যেরা আমাদিগকে ব্রহ্মোপদেশ করিয়াছেন  ।।৩।।

শিষ্যের পাছে অন্য কাহাকে ব্রহ্ম করিয়া বিশ্বাস হয় তাহা নিবারণের নিমিত্ত পরের পাঁচ শ্রুতি কহিতেছেন।

যদ্বাচানভ্যুদিতং যেন বাগভ্যুদতে

তাদেব ব্রাহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদ্মুপাসতে।।৪।।

      যাঁহাকে বাক্য অর্থাৎ বাগিন্দ্রিয় এবং বর্ণ আর নানা প্রকার পদ ইঁহারা করিতে পারেন না, আর যিনি বাক্যকে বিশেষ বিশেষ অর্থে নিযুক্ত করেন, তাঁহাকেই কেবল ব্রহ্ম করিয়া তুমি জান ; অন্য যে পরিচ্ছিন্ন যাঁহাকে লোকসকল উপাসনা করেন সে ব্রহ্ম নহে  ।।৪।।

যন্মনসা ন মনুতে যেনাহুর্মনোমতং।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে।।৫।।

যাঁহাকে মন আর বুদ্ধির দ্বারা লোকে সঙ্কল্প এবং নিশ্চয় করিতে পারেন না , আর যিনি মন আর বুদ্ধিকে জানিতেছেন এইরূপ ব্রহ্মজ্ঞানীরা কহেন, তাঁহাকেই কেবল ব্রহ্ম করিয়া জান। অন্য যে পরিচ্ছিন্ন যাহাকে লোকসকল উপাসনা করে যে ব্রহ্ম নহে।।৫।।

যচ্চক্ষুষা ন পশ্যতি যেন চক্ষুংষি পশ্যতি ।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ।।৬।।

    যাঁহাকে চক্ষুর্দ্বারা লোকে দেখিতে পায়েন না, আর যাঁহার অধিষ্ঠানেতে লোকে চক্ষূবৃত্তিকে অর্থাৎ ঘটপটাদি যাবদ্বস্তুকে দেখেন, তাঁহাকেই কেবল ব্রহ্ম করিয়া তুমি জান । অন্য যে পরিচ্ছিন্ন যাহাকে লোকসকল উপাসনা করে সে ব্রহ্ম নহে ।।৬।।

যৎ শ্রোত্রেণ ন শৃণোতি যেন শ্রোত্রমিদং শ্রতং ।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ।।৭।।

   যাঁহাকে কর্ণেন্দ্রিয় দ্বারা কেহ শুনিতে পায়েন না , আর যিনি এই কর্ণেন্দ্রিয়কে শুনিতেছেন , তাঁহাকেই কেবল ব্রহ্ম করিয়া তুমি জান । অন্য যে পরিচ্ছিন্ন যাহাকে লোকসকল উপাসনা করে সে ব্রহ্ম নহে  ।।৭।।

যৎ প্রাণেন ন প্রাণিতি যেন প্রাণঃ প্রণীয়তে ।

তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ।।৮।।

   যাঁহাকে ঘ্রাণেন্দিয় দ্বারা লোকে গন্ধের ন্যায় গ্রহণ করিতে পারেন না , আর যিনি ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে তাহার বিষয়তে নিযুক্ত করেন , তাহাকেই কেবল ব্রহ্ম করিয়া তুমি জান । অন্য যে পরিচ্ছিন্ন যাহাকে লোকসকল উপাসনা করে সে ব্রহ্ম নহে  ।।৮।।

   পূর্ব্বে যে উপদেশ গুরু করিলেন তাহা হইতে পাছে শিষ্য এই জ্ঞান করে যে, এই শরীরস্থিত সোপাধি যে জীব তিনি ব্রহ্ম হয়েন,  এই শঙ্কা দূর করিবার নিমিত্ত গুরু কহিতেছেন ।

          যদি মন্যসে সুবেদেতি দভ্রমেবাপি
                           ৺ নূনং ত্বং বেত্থ ব্রহ্মণো রূপং ।
          যদস্য ত্বং যদস্য দেবেষ্বথ নু
                           মীমাংস্যমেব তে মন্যে বিদিতম্ ।।৯।।
 
          আমি অর্থাৎ এই শরীরস্থিত যে আত্মা সাক্ষাৎ ব্রহ্ম হই অতএব আমি সুন্দররূপে ব্রহ্মকে জানিলাম, এমত যদি তুমি মনে কর, তবে তুমি ব্রহ্মস্বরূপের অতি অল্প জানিলে। আপনাতে পরিচ্ছিন্ন করিয়া যে তুমি ব্রহ্মের স্বরূপ জানিতেছ সে কেবল অল্প হয় এমত নহে, বরঞ্চ দেবতাসকলেতে পরিচ্ছিন্ন করিয়া ব্রহ্মের স্বরূপ যে জানিতেছে তাহাও অল্প হয় । অতএব তুমি ব্রহ্মকে জানিলে না ; এই হেতু এখন ব্রহ্ম তোমার বিচার্য্য হয়েন । এই প্রকার গুরুর বাক্য শুনিয়া শিষ্য বিশেষমতে  বিবেচনা  করিয়া  উত্তর করিতেছেন , আমি  বুঝি  যে  ব্রহ্মকে  এখন  আমি জানিলাম  ।।৯।।

        কিরূপে শিষ্য ব্রহ্মকে জানিলেন তাহা শিষ্য কহিতেছে ।

 নাহং মন্যে সুবেদেতি নো ন বেদেতি বেদ চ ।

               যো নস্তদ্বেদ তদ্বেদ নো ন বেদেতি বেদ চ ।।১০।।
          আমি ব্রহ্মকে সুন্দর প্রকারে জানিয়াছি এমত মনে করি না , আর ব্রহ্মকে আমি জানি না এরূপও আমি জানি না এরূপও আমি মনে করি না । আর আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পূর্ব্বোক্ত বাক্যকে বিশেষমতে জানিতেছেন , সে ব্যক্তি ব্রহ্মতত্ত্বকে জানিতেছেন । পূর্ব্বোক্ত বাক্য কি তাহা কহিতেছেন , ——- ব্রহ্মকে আমি জানি না এমত মনে করি না , আর ব্রহ্মকে সুন্দররূপে জান এরূপও মনে করি না । অর্থাৎ যথার্থ রূপে ব্রহ্মকে জানি না ;  কিন্তু ব্রহ্মকে সত্য-স্বরূপ করিয়া বেদে কহিয়াছেন ইহা জানি  ।।১০।।

এখন গুরু-শিষ্য-সম্বাদ দ্বারা যে অর্থ নিষ্পন্ন হইল তাহা পরের শ্রুতিতে কহিতেছেন ।

  যস্যামতং তস্য মতং মতং যস্য ন বেদ সঃ ।

          অবিজ্ঞাতং বিজানতাং বিজ্ঞাতমবিজানতাম্ ।।১১।।
 
      ব্রহ্ম আমার জ্ঞাত নহেন এরূপ  নিশ্চয় যে ব্রহ্মজ্ঞানীর হয়, তিনি ব্রহ্মকে জানিয়াছেন । আর আমি ব্রহ্মকে জানিয়াছি এরূপ নিশ্চয় যে ব্যক্তির হয়, সে ব্রহ্মকে জানে না । উত্তম জ্ঞানবান ব্যক্তির বিশ্বাস এই যে, ব্রহ্ম আমার জ্ঞেয় নহেন । আর উত্তম জ্ঞানবিশিষ্ট যে ব্যক্তি নহেন  তাঁহার বিশ্বাস এই যে, ব্রহ্ম আমার জ্ঞেয় হয়েন  ।।১১।।

পরের শ্রুতিতে কি প্রকারে ব্রহ্মের জ্ঞান হইতে পারে তাহা কহিতেছেন ।

                                                      প্রতিবোধবিদিতং মতমমৃতত্বং হি বিন্দতে ।                                                                                                 আত্মনা বিন্দতে বীর্য্যং বিদ্যয়া বিন্দতেহমৃতম্ ।।১২।।

      জড় যে চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়, সে ব্রহ্মের অধিষ্ঠানের দ্বারা চেতনের ন্যায় ঘটপটাদি বস্তুর জ্ঞান করিতেছে, ইহাতেই সাক্ষাৎ চৈতন্যস্বরূপ ব্রহ্ম প্রতীত হইতেছেন । এইরূপে ব্রহ্মের যে জ্ঞান সেই উত্তম জ্ঞান হয় ; যেহেতু এইরূপ জ্ঞান হইলে মোক্ষ হয় । আর আপনার যত্নের দ্বারাই ব্রহ্মজ্ঞানের সামর্থ্য হয়, সেই ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারা মুক্তি হয়  ।।১২।।

                                                                                 ইহ চেদবেদীদথ সত্যমস্তি

     ন চেদিহাবেদীন্মহতী বিনষ্টিঃ ।

                                                                                 ভূতেষু ভূতেষু বিচিন্ত্য ধীরাঃ

               প্রেত্যাস্মাল্লোকাদমৃতা ভবন্তি ।।১৩।।
     যদি এই মনুষ্যদেহেতে ব্রহ্মকে পূর্ব্বোক্ত প্রকারে যে ব্যক্তি জানে, তবে তাহার ইহলোকে প্রার্থনীয় সুখ ও পরলোকে মোক্ষ দুই সত্য হয় । আর এই মনুষ্যশরীরে পূর্ব্বোক্ত প্রকারে ব্রহ্মকে যে না জানে, তবে তাহার অত্যন্ত ঐহিক পারত্রিক ক্লেশ হয় । অতএব জ্ঞানী সকল স্থাবরেতে এবং জঙ্গমেতে এক আত্মাকে ব্যাপক জানিয়া ইহলোক হইতে মৃত্যু হইলে  পরমব্রহ্ম প্রাপ্ত হয়েন  ।।১৩।।

ব্রহ্ম সকলের কর্ত্তা এবং দুর্জ্ঞেয় হয়েন , ইহা দেখাইবার নিমিত্ত পরে এক আখ্যায়িকা অর্থাৎ এক বৃত্তান্ত কহিতেছেন

ব্রহ্ম হ দেবোভ্যো বিজিগ্যে

তস্য হ ব্রহ্মণো বিজয়ে দেবা অমহীয়ন্ত ।

ত ঐক্ষন্তাস্মাকমেবায়ং

বিজয়োহস্মাকমেবায়ং মহিমেতি ।।১৪।।

      ব্রহ্ম দেবতাদের নিমিত্তে জয় করিলেন অর্থাৎ দেবাসুর সংগ্রামে জগতের কল্যাণের নিমিত্ত দেবতাদিগকে জয় দেয়াইলেন । সেই ব্রহ্মের জয়েতে অগ্নি প্রভৃতি দেবতা সকল আপন আপন মহিমাকে প্রাপ্ত হইলেন । আর তাঁহারা মনে করিলেন যে , আমাদিগেরই এ জয় আর আমাদিগেরই এ মহিমা অর্থাৎ এ জয়ের সাক্ষাৎ কর্ত্তা  আমরাই হই  ।।১৪।।

তদ্ধৈষাং বিজজ্ঞৌ তেভ্যো হ প্রাদুর্বভুব

তন্ন ব্যজানন্ত কিমিদং যক্ষমিতি ।।১৫।।

সেই অন্তর্য্যামী ব্রহ্ম দেবতাদের এই মিথ্যাভিমান জানিলেন । পাছে দেবতাসকল এই মিথ্যাভিমানের দ্বারা অসুরের ন্যায় নষ্ট হয়েন, এই হেতু তাঁহাদিগকে জ্ঞান দিবার নিমিত্ত বিস্ময়ের হেতু মায়ানির্ম্মিত অদ্ভুতরূপে বিদ্যুতের ন্যায় তাঁহাদিগের চক্ষুর গোচর হইলেন । ইনি কে পূজ্য হয়েন তাহা দেবতারা জানিতে পারিলেন না ।।১৫।।

তে অগ্নিমব্রুবন্‌ জাতবেদ এতদ্বিজানীহি

কিমেতৎ যক্ষমিতি ।  তথেতি ।

          তদভ্যদ্রবৎ তমভ্যবদৎ কোহসীতি ।
          অগ্নির্ব্বা অহমস্মীত্যব্রবীজ্জাতবেদা বা
                                                  অহমস্মীতি ।।১৬।।
          সেই দেবতাসকল অগ্নিকে কহিলেন যে, হে অগ্নি, এ পূজ্য কে হয়েন ইহা তুমি বিশেষ করিয়া জান । অগ্নি তথাস্তু বলিয়া সেই পূজ্যের নিকট গমন করিলেন । সেই পূজ্য অগ্নিকে জিজ্ঞাসা করিলেন অর্থাৎ অগ্নির কর্ণগোচর এই শব্দ হইল যে, তুমি কে । অগ্নি উত্তর দিলেন যে, আমার নাম অগ্নি হয়, আমার নাম জাতবেদ হয় অর্থাৎ আমি বিখ্যাত হই ।।১৬।।

তস্মিংস্ত্বয়ি কিং বীর্য্যমিতি অপীদং সর্ব্বং

 দহেয়ং যদিদং পৃথিব্যামিতি ।

   তস্মৈ তৃণং নিদধাবেতদ্দহেতি ।।১৭।।
    তখন অগ্নিকে সেই পূজ্য কহিলেন, এমন বিখ্যাত যে তুমি অগ্নি তোমাতে কি সামর্থ্য আছে তাহা কহ । তখন অগ্নি উত্তর দিলেন যে, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের মধ্যে যে কিছু বস্ত আছে সে সকলকেই আমি দগ্ধ করিতে পারি । তখন সেই পূজ্য অগ্নির সম্মুখে এক তৃণ রাখিয়া কহিলেন যে, এই তৃণকে তুমি দগ্ধ কর, অর্থাৎ যদি এই তৃণকে তুমি দগ্ধ করিতে না পার, তবে আমি দগ্ধ করিতে পারি এমত অভিমান আর করিবে না ।।১৭।।

তদুপপ্রেয়ায় সর্ব্বজবেন তন্ন শশাক দগ্ধুং

স তত এব নিববৃতে নৈতদশকং বিজ্ঞাতুং ।।১৮।।

     তখন অগ্নি সেই তৃণের নিকট গিয়া আপনার তাবৎ পরাক্রমের দ্বারা তাহাকে দগ্ধ করিতে পারিলেন না । তখন অগ্নি সেই স্থান হইতে নিবর্ত্ত হইয়া দেবতাদিগকে কহিলেন যে, এ পূজ্যকে হয়েন তাহা জানিতে পারিলাম না ।।১৮।।

অথ বায়ুমব্রুবন্ বায়বেতদ্বিজানীহি

কিমেতদ্ যক্ষমিতি । তথেতি ।

     তদভ্যদ্রবেৎ তমভ্যবদৎ কোহসীতি বায়ুর্ব্বা
 
               অহমস্মীত্যব্রবীন্মাতরিশ্বা বা অহমস্মীতি ।।১৯।।
      পশ্চাৎ সেই সকল দেবতারা বায়ুকে কহিলেন যে, হে বায়ু, এ পূজ্য কে হয়েন তাহা তুমি বিশেষ করিয়া জান । বায়ু তথাস্তু বলিয়া সেই পূজ্যের নিকট গমন করিলেন । সেই পূজ্য বায়ুকে জিজ্ঞাসা করিলেন অর্থাৎ বায়ুর কর্ণগোচর এই শব্দ হইল যে, তুমি কে । বায়ু উত্তর দিলেন যে, আমার নাম বায়ু হয়, আমার নাম মাতরিশ্বা হয় অর্থাৎ আমি বিখ্যাত হই  ।।১৯।।

তস্মিয়ংস্তৃয়ি কিং বীর্য্যমিতি অপীদং

সর্ব্বমাদদীয় যদিদং পৃথিব্যামিতি ।

          তস্মৈ তৃণং নিদধাবেতদাদৎস্বেতি ।।২০।।

     তখন বায়ুকে সেই পূজ্য কহিলেন, এমন বিখ্যাত যে তুমি বায়ু তোমাতে কি সামর্থ্য আছে তাহা কহ । তখন বায়ু উত্তর দিলেন যে, বিশ্বব্রহ্মান্ডের মধ্যে যে কিছু বস্তু আছে সে সকলকেই গ্রহণ করিতে পারি । তখন সেই পূজ্য বায়ুর সম্মুখে এক তৃণ রাখিয়া কহিলেন যে, এই তৃণকে তুমি গ্রহণ কর অর্থাৎ যদি এই তৃণকে গ্রহণ করিতে তুমি না পার, তবে আমি গ্রহণ করিতে পারি এমত অভিমান আর করিবে না ।।২০।।

তদুপপ্রেয়ায় সর্ব্বজবেন তন্ন শশাকাদাতুং

স তত এব নিববৃতে নৈতদশকং বিজ্ঞাতুং যদেতদ্‌ যক্ষমিতি ।।২১।।

   তখন বায়ু সেই তৃণের নিকটে গিয়া আপানার তাবৎ পরাক্রমের দ্বারাতে তাহাকে গ্রহণ করিতে পারিলেন না ।  তখন বায়ু সেই স্থান হইতে নির্বত্ত হইয়া দেবতাদিগকে কহিলেন যে , এ  পূজ্য কে হয়েন তাহা জানিতে পারিলাম না ।।২১।।

অথেন্দ্রমব্রুবন্‌ মঘবন্নেতদ্বিজানীহি

কিমেতদ্‌যক্ষমিতি । তথেতি ।

তদভ্যদ্রবৎ তস্মাত্তিরদধে ।।২২।।

  পশ্চাৎ সেইহে  সকল দেবতারা ইন্দ্রকে কহিলেন যে , ইন্দ্র এই পূজ্য কে হয়েন তাহা তুমি বিশেষ করিয়া জান । ইন্দ্র তথাস্তু বলিয়া  সেই পূজ্যের নিকট গমন করিলেন । তখন সেই পূজ্য ইন্দ্র হইতে চক্ষুর নিমেষের ন্যয় অন্তর্ধান করিলেন অর্থাৎ ইব্দ্রের চক্ষু গোচর আর থাকিলেন না  ।।২২।।

স তস্মিন্নেবাকাশে স্ত্রিয়মাজগাম বহুশোভমানামুমাং হৈমবতীং তাং হোবাচ কিমেতদ্‌

যক্ষমিতি ব্রহ্মেতি হবাচ ব্রহ্মণো বা এতদ্বিজয়ে মহীয়ধ্বমিতি ।।২৩।।

      ইন্দ্র ঐ আকাশে সেই পূজ্যকে দেখিতে না পাইয়া নির্বত্ত না হইয়া তথায় থাকিলেন । তখন বিদ্যারূপিণী মায়া অতি সুন্দরী উমারূপেতে ইন্দ্রকে দেখা দিলেন । ইন্দ্র তাঁহাকে প্রাপ্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন যে , কে এ পূজ্য এখানে ছিলেন । তিনি ব্রহ্ম আর এই ব্রহ্ম জয়েতে তোমার ম্মহিমা প্রাপ্ত হইয়াছে   ।।২৩।।

ততো হৈব বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি তস্মাদ্বা

এতে দেবা অতিতরামিবান্যান্‌ দেবান্‌

যদগ্নির্ব্বায়ুরিন্দ্রস্তে হ্যেনৎ নেদিষ্ঠং পস্পর্শু

স্তে হ্যেনৎ প্রথমো বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি ।।২৪।।

     সেই বিদ্যার উপদেশেতেই ইনি ব্রহ্ম ইহা ইন্দ্র জানিলেন । যে হেতু অগ্নি বায়ু ইঁহারা ব্রহ্মের সমীপ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন আর যেহেতু অতি নিকটস্থ ব্রহ্মের সহিত ইঁহাদিগের আলাপাদি দ্বারা সম্বন্ধ হইয়াছিল , আর যে হেতু ইঁহারা অন্য দেবতার পুর্ব্বে ব্রহ্ম করিয়া জানিয়াছিলেন , সেই হেতু অগ্নি , বায়ু , ইন্দ্র অন্য দেবতা হইতে শ্রেষ্ঠের ন্যায় হইলেন । কারণ এই যে , বিদ্যাবাক্য হইতে ইন্দ্র ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হইলেন আর ইন্দ্র হইতে প্রথমত অগ্নি ও বায়ু ব্রহ্ম করিয়া জানিয়াছিলেন ।।২৪।।

তস্মাদ্বা ইন্দ্রোহতিতরামিবান্যান্‌ দেবান্‌ স হ্যেনন্নেদিষ্ঠং পস্পর্শ স হ্যেনত্‌ প্রথম বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি ।।২৫।।

    যেহেতু ইন্দ্র ব্রহ্মের অতি সমীপে গমনের দ্বারা সম্বন্ধ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, আর যেহেতু অগ্নি বায়ু অপেক্ষা করিয়াও উমার বাক্যেতে প্রথমে ব্রহ্মকে জানিয়াছিলেন, সেই হেতু অগ্নি বায়ু প্রভৃতি সকল দেবতা হইতেও ইন্দ্র শ্রেষ্ঠের ন্যায় হইলেন অর্থাৎ জ্ঞানেতে যে শ্রেষ্ঠ সেই শ্রেষ্ঠ হয় ।।২৫।।

তস্যৈষ আদেশো যদেতদ্বিদ্যুতো ব্যদ্যুতদা ইতী ন্ন্যমীমিষদা ইত্যধিদৈবতং ।।২৬।।

    সেই যে উপমারহিত ব্রহ্ম তাঁহার এই এক উপমার কথন হয়, যেমন বিদ্যুতের প্রকাশের ন্যায় অর্থাৎ একেবারেই তেজের দ্বারা বিদ্যুতের ন্যায় জগতের ব্যাপক হয়েন । আর অন্য উপমা কথন এই যে, যেমন চক্ষুর্নিমেষ অত্যন্ত দ্রুত এবং অনায়াসে হয়, সেইরূপ ব্রহ্ম সৃষ্ট্যাদি এবং তিরোধান অনায়াসে করেন । এই যে উপমা তাহা দেবতাদের বিষয়ে কহিয়াছেন ।।২৬।।

অথাধ্যাত্মং যদেতদ্‌ গচ্ছতীব চ মনোহনেন চৈতদুপস্মরত্যভীক্ষনং সঙ্কল্পঃ তদ্ধ তদ্বনং

নাম তদ্বনমিত্যুপাসিতব্যং স য এতদেবং বেদাভিহৈনং সর্ব্বাণি ভূতানি সংবাঞ্ছন্তি ।।২৭।।

      এখন মনের বিষয়ে সর্ব্বব্যাপি ব্রহ্মের তৃতীয় আদেশ এই যে, এই ব্রহ্মকে যেন পাইতেছি এমৎ অভিমান মন করেন, আর এই মনের দ্বারা সাধক জ্ঞান করেন ব্রহ্মকে যেন ধ্যানগোচর করিলাম, আর মনের পুনঃ পুনঃ সঙ্কল্প অর্থাৎ ব্রহ্মবিষয়ে সাধকের পুনঃ পুনঃ স্মরণ হয় । তাৎপর্য এই যে, পূর্ব্বের দুই উপমা আর পরের এই আদেশ অল্পবুদ্ধি ব্যক্তির জ্ঞানের নিমিত্ত কহেন । যেহেতু উপমাঘটিত বাক্যকে অল্পবুদ্ধিরা অনায়াসে বুঝিতে পারে, নতুবা নিরুপাধি ব্রহ্মের কোনো উপমা নাই এবং মনও তাঁহাকে প্রাপ্ত হইতে পারেন না । সেই যে ব্রহ্ম, তিনি সকলের নিশ্চিত ভজনীয় হয়েন, অতএব সর্ব্বভজনীয় করিয়া তিনি বিখ্যাত হয়েন । এই প্রকারেতে তাঁহার উপাসনা কর্ত্তব্য । যে ব্যক্তি এই প্রকারে ব্রহ্মের উপাসনা করে তাহাকে সকল 
লোক প্রার্থনা করেন ।।২৭।।

     পূর্ব্ব উপদেশের দ্বারা সবিশেষ ব্রহ্মতত্ত্ব শ্রবণ করিয়া, নির্ব্বিশেষ ব্রহ্মতত্ত্ব জানিবার নিমিত্ত্ব আর যাহা পূর্ব্বে কহিয়াছেন তাহাতে উপনিষদের সমাপ্তি হইল, কি আর কিছু অবশেষ আছে, ইহা নিশ্চয় করিবার জন্য শিষ্য কহিতেছেন ।।

উপনিষদং ভো ব্রূহীত্যুক্তা ত উপনিষৎ 
                    ব্রাহ্মীং বাব ত উপনিষদমব্রূমেতি
          তস্যৈ তপো দমঃ কর্ম্মেতি প্রতিষ্ঠা
                    বেদাঃ সর্ব্বাঙ্গানি সত্যমায়তনং ।।২৮।।

     শিষ্য বলিতেছেন যে, হে গুরু, উপনিষৎ অর্থাৎ ব্রহ্ম বিষয় পরম রহস্য যে শ্রুতি তাহা আমাকে কহ । গুরু উত্তর দিলেন যে, উপনিষৎ তোমাকে কহিলাম, অর্থাৎ প্রথমত নির্ব্বিশেষ পশ্চাৎ সবিশেষ করিয়া ব্রহ্মতত্ত্বকে কহিলাম ; ব্রহ্মতত্ত্ব-ঘটিত যে বাক্য সে উপনিষৎ হয় তাহা তোমাকে কহিলাম ; অর্থাৎ পূর্ব্বে যাহা কহিয়াছি তাহাতেই উপনিষদের সমাপ্তি হইল । তপ আর ইন্দ্রিয়নিগ্রহ আর অগ্নিহোত্রাদি কর্ম্ম আর বেদ আর বেদের অঙ্গ অর্থাৎ ব্যাকরণ প্রভৃতি ইঁহারা সেই উপনিষদের পা হয়েন, অর্থাৎ এ সকলের অনুষ্ঠান যে ব্যক্তি ইহজন্মে কিম্বা পূর্ব্বজন্মে করিয়াছে, উপনিষদের অর্থ সেই ব্যক্তিতে প্রকাশ হয় । আর উপনিষদের আলয় সত্য হয়েন অর্থাৎ সত্য থাকিলেই উপনিষদের অর্থস্ফুর্ত্তি থাকে ।।২৮।।

যো বা এতামেবং বেদ অপহত্য পাপ্নামনন্তে স্বর্গে লোকে জ্যেয়ে প্রতিতিষ্ঠতি প্রতিতিষ্ঠতি ।। ২৯ ।।

     কেনেষিতং ইত্যাদি শ্রুতিরূপ যে উপনিষৎ তাহাকে যে ব্যক্তি অর্থত এবং শব্দত জানে, সে ব্যক্তি প্রাক্তন কে নষ্ট করিয়া অন্তশূন্য সকল হইতে মহান্ আনন্দস্বরূপ পরমাত্মাতে অবস্থিতি করে । শেষ বাক্যতে যে পুনরুক্তি সে নিশ্চয়ের দ্যোতক এবং গ্রন্থসমাপ্তির জ্ঞাপক হয় ।।২৯।।


  ইতি সামবেদীয় তলবকারোপনিষৎ সমাপ্তা ।।
সামবেদীয় তলবকারোপনিষদের সমাপ্তি হইল ইতি ।।
প্রথম ছাপা প্রকাশ – শকাব্দা ১৭৩৮ ইংরাজী ১৮১৬ । ১৭ আষাঢ় ২৯ জুন।।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *