কবিতা গুচ্ছ ~ শ্রাবন বোস

  • কিন্তু সম্পর্ক মানে একটা ঘরের মতো, সেই ঘরে আদৌ আমরা যার সাথে থাকতে চাইছি, সে আমাদের রাখতে চায় কিনা যত্ন করে! একশো বার জানার দরকার আছে….

যখন সম্পর্ক

শ্রাবন বোস

 

ভালোবাসলে একতরফাও ভালোবাসা যায়, খুব দূর থেকে ছুঁয়ে থাকা যায়, সে ভালোবাসে কিনা! সে গুরুত্ব দেয় কিনা! সে রাত জেগে অপেক্ষা করে কিনা! জানার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু সম্পর্ক একতরফা হয় না…..

যার সাথে সম্পর্কে যাবো বলে আমরা ভাবি, তার মতামতের অবশ্যই প্রয়োজন পড়ে। তার ভেতর অনুভূতি আছে কিনা! একলা ঘরে আমার কথা মনে পড়ে কিনা! তার সব বন্ধুদের চেয়ে বেশি আমায় গুরুত্ব দেয় কিনা!

বৃষ্টি হলে আমার সাথে পাড়ার মোড়ে ভিজতে চায় কিনা! খুব দুপুরে ঘুমের ঘোরে আমার ডাকনাম ধরে ডাকে কিনা! ঘাসের ডগায় জমা শিশিরের মতো আমায় আলতো হাতে স্পর্শ করতে চায় কিনা! আমায় না দেখতে পেল পাগলামি করে কিনা! অবশ্যই সমস্তটা জানার প্রয়োজন আছে…..

যখন সম্পর্ক

বিকেল বেলায় উটকো হাওয়া দিলেই ছেঁড়া ঘুড়ির মতো আমার আঙুলে পেঁচিয়ে যেতে চায় কিনা! সন্ধেবেলায় আকাশ জুড়ে উঠলে ঝড় আমায় নিয়ে চিন্তা করে কিনা! বারবার ফোন করে “কোথায় আছি, কী করছি” জানতে চায় কিনা! টেনশনে এঘর ওঘর পায়চারি করে কিনা!

জ্বরের সময় পুড়লে শরীর সে আসবে কিনা খবর নিতে! একটু রান্না করে খাইয়ে দিতে! মাথায় ঠান্ডা হাত ছোঁয়াতে! এগুলো জানার প্রয়োজন আছে….

আমায় ভেবে মাঝরাতে কখনো কোনো লম্বা চিঠি লিখেছে কিনা! লাল গোলাপ কিনে আমায় না দিতে পারার শোকে পাপড়ি গুলো কখনো ছিঁড়ে ফেলেছে কিনা! সবটা জানার দরকার আছে….

ভালোবাসা এক তরফা হতে পারে, সম্পর্ক নয়। তাই কারোর মনে যদি অপরজনের প্রতি খুব গাঢ় বন্ধুত্বের চেয়ে একটু বেশি অনুভূতি জাগে, ইম্মিডিয়েট অপরজনকে সেটা বলা উচিত, নিজের কাছে সৎ থাকা উচিত….

তার মনে বন্ধুত্বের থেকে বেশি কোনো অনুভূতি না থাকলে বেরিয়ে আসা উচিত, সরে যাওয়া উচিত সেই জায়গা থেকে…

ভালোবাসা একটা অনুভূতি যার কোনো বন্ধন নেই, শুধুই খোলা আকাশ আছে, মুক্তির হাওয়া আছে, লাগামছাড়া বেপরোয়া ডানার ভরে উড়ে যাওয়ার দুচোখ জুড়ে স্বপ্ন আছে…

কিন্তু সম্পর্ক মানে একটা ঘরের মতো, সেই ঘরে আদৌ আমরা যার সাথে থাকতে চাইছি, সে আমাদের রাখতে চায় কিনা যত্ন করে! একশো বার জানার দরকার আছে….


গোপন প্রেম

জলঝুপ্পুস সন্ধে বেলায় অভিমানী গাল ফুলিয়ে দুই হাঁটুর মধ্যিখানে মুখ গুঁজে বসে থাকবো, খুব চাইবো মাথায় হাত বুলিয়ে রাগ ভাঙাক, কিন্তু এলেই কাছে এক ধাক্কায় দূরে ঠেলে সরিয়ে দেবো….

শ্রাবন বোস

 

আমরা অনেকসময় আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক লুকিয়ে রাখি, আমাদের প্রত্যেকের জীবনে একটা নিষিদ্ধ প্রেম থাকে, যেখানে গেলে আমরা তৃপ্ত হই, যার কথা রাত বাড়লেই মনে পড়ে…..

এই নামডাকহীন সম্পর্কে আবদ্ধ দুটো মানুষ ছাড়া যে প্রেমের কথা ভুলেও কাউকে কক্ষনো বলতে পারবে না কেউই….

বাথরুমের আয়নায়, ভাত ফোটানো রান্না ঘরে, কাপড় মেলতে যাওয়া দুপুরের ছাদে, ভিড়জমানো ব্যস্ত ক্রসিংয়ে একলা হলেই যার নরম আঙ্গুল এসে একঝটকায় ঘেঁটে দিয়ে যাবে এলোমেলো চুল, যেন কোনো দামাল ছেলে কাদা মাঠে ভিজতে ভিজতে ছুঁড়ছে বল আকাশের দিকে তাক করে….

বয়সে অনেকবড় বা অনেকটাই ছোট মানুষের প্রেমে পড়লে একটা আলাদা শিহরণ কাজ করে, একটা আলাদা টান থাকে সেসব প্রেমে! একটা আলাদা রহস্য থাকে, যে রহস্য উন্মোচন করার নেশায় মানুষ সারাদিন নিজের প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার চেষ্টা করে….

গোপন প্রেম

একটা ভীষণরকম অসম্পূর্ণ প্রেম হোক! যাকে গলা টিপে খুন করা যাবে না গোটা জীবনে। থেঁতো করে বেটে চিবিয়ে খেয়ে ফেলাও যাবে না, গলার কাছে বিঁধে থাকবে মাছের কাঁটার মতো….

আমাদের শরীরের যে যে জায়গা গুলো অন্ধকারে ডুবে আছে বহুকাল, ঠিক সেই সেই জায়গাগুলোতে নরম রোদের কুঁড়ি সেজে সে আলো জ্বেলে দেবে একটু একটু করে….

যে ব্যথার আঁচ আমাদের খুব কাছের মানুষও বুঝতে পারে না কখনো, সেই ব্যথার স্বর ওই মানুষটা চিনে ফেলবে আমাদের গলার আওয়াজ শুনে….

আমরা শুধু একবার চোখ খুলে দেখবো, আধঘুমে জল খাওয়ার অজুহাতে তার আদর খাওয়ার চেষ্টা করবো, সফল হবো না তবুও, খুব কাছে এসেও আমরা নিজেদেরকে গুটিয়ে নেবো…

সে শুধু স্বপ্নে ছোঁবে আমাদের, বাস্তবে নয়! বাস্তবে ছুঁলে ঘুম ভেঙে যাবে, স্বপ্ন মরে যাবে…

জলঝুপ্পুস সন্ধে বেলায় অভিমানী গাল ফুলিয়ে দুই হাঁটুর মধ্যিখানে মুখ গুঁজে বসে থাকবো, খুব চাইবো মাথায় হাত বুলিয়ে রাগ ভাঙাক, কিন্তু এলেই কাছে এক ধাক্কায় দূরে ঠেলে সরিয়ে দেবো….

—-কতদিন তোমার কাছে যাইনি! আজ একটু তোমার কাছে যাবো? আমার রোজ রোজ হ্যাংলামি করে তোমার কাছে যেতে ভালো লাগে না, তবুও তোমায় না পেলে মরে যাবো…

——তুই নীল পাঞ্জাবি পরে আসিস, আমি হলুদ শাড়ি পরবো, দরজার কাছে দাঁড়াবো চুপ করে, স্রেফ তোকে একবার দেখেই ঘরে ঢুকে যাবো। বেশি কাছে গেলে আর নিজের জগতে ফিরতে পারবো না তাই…..

সব প্রেমে মাথা উঁচু করে হাত ধরে হাঁটা যায় না সকলের সামনে, কিছু প্রেমে পর্দার আড়ালে একে অপরের বুকে মাথা গুঁজে ভিজে নিতে হয় বেহায়া নরম বৃষ্টিতে…..


মনে পড়ে

যার জন্য তুমি আজকে ভালোবাসতে ভয় পাও, একদিন সেই তোমাকে ভীষন ভালোবাসতে শিখিয়েছিলো…..

শ্রাবন বোস

 

মনে পড়ে?

যে তোমাকে মাঝ পথে ছেড়ে গিয়েছিলো, একদিন সেই সারাজীবন একসাথে হাঁটবে বলেছিলো……. মনে পড়ে??

যে তোমার অশ্রু সাগর উপেক্ষা করে চলে গিয়েছিলো, একদিন সেই মন খারাপ হলে তার কাঁধে মাথা রাখতে বলেছিলো…… মনে পড়ে??

যার জন্য তুমি আজও বিনিদ্র রাত কাটাও, একদিন সেই তোমাকে রাত জাগতে শিখিয়েছিলো….. মনে পড়ে??

যার জন্য তুমি স্বপ্ন দেখতে ভয় পাও, সেই তোমার চোখে অজস্র স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলো….. মনে পড়ে??

যার জন্য তুমি আজকে ভালোবাসতে ভয় পাও, একদিন সেই তোমাকে ভীষন ভালোবাসতে শিখিয়েছিলো…..
মনে পড়ে????


আপনার জন

তুমি আমি এক হয়ে নিজেদের বিলিয়ে গেলাম।

শ্রাবন বোস

হয়তো তোর মনে আছে
কত শাখা প্রশাখার ঝাঁকে
হারিয়ে ফেলে নিজেদের
এগোচ্ছি চূড়ান্ত লক্ষ্যে।
রঙিন বসনে রঙ্গিনী
হয়ে যেদিন দিলি ধরা
ভেবেছি তোকে আপনার জন
এগিয়ে নিয়ে যাব ধারা।
চিন্তন গতি বিধিতে
ধরা পড়ে সমন্বয়,
অঘোষিত নায়ক ,তবে
করবো দিগ্বিজয়।
গোপনে রাখা ভাবনা যত
সামনে এলো শেষে।
আমার সকল মনের কথা
বলে দিলাম আবেগে ভেসে।

প্রণয় পর্ব শেষে
হলো শুভ পরিণয়
কল্পনা শেষে বাস্তবের
ছোঁওয়া পায়।
কত কত দায়িত্ব বাঁধা
পর্বতসম অভিমান।
উঁচু নিচু সরণী ধরে
বিবাহ অভিযান।
ব্যস্ততার মারপ্যাচে
সম্পর্কের পদস্খলন।
ভিড় ঠেলে নতুন অতিথিতে
পাই নিজেরই প্রতিফলন।

কর্ম ব্যস্ততা,
অসীম দায়ভার।
চলমান সময় স্রোতে
পেতে থাকি বহু উপহার।
প্রতি পলে বেড়ে চলে
বয়সের কাঁটা।
দিনশেষে সব ছেড়ে
অন্তিম পথেতে হাঁটা।
স্মৃতির ফলকে খোদাই
কত ঘটনার বিবরণ,
সব শেষে করতে হবে
মহাকালের হাতে সমর্পণ।
চাওয়া পাওয়ার লীলায়
কী দিলাম ,কী পেলাম?
তুমি আমি এক হয়ে
নিজেদের বিলিয়ে গেলাম।


বেঁচে থাকা

কিন্তু যতবার তুমি সামনে এসে দাঁড়াও আমি আমার পুরোনো অগোছালো ভাঙাচোরা আমিকে ভালোবেসে ফেলি। আমি আয়না ঢেকে তোমার চোখে নিজেকে খুঁজে পাই, আমায় সুন্দর লাগে দেখতে…..

শ্রাবন বোস

আমার মধ্যে এক গভীর খুনি লুকিয়ে আছে, আমার নিজেকে খুন করতে ভালো লাগে…..

নিজেকে মেরে ফেলে নতুন ভাবে প্রতি মুহূর্তে জন্ম নিতে ভালো লাগে। আমার ভালো লাগে ভাবতে আমার কেউ নেই কোনো খানে, পরিযায়ী পাখিদের মতো উড়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে…..

যারা কোনোদিন ঘর বাঁধতে চায় না, তারা কোনোদিন ঘরে ফেরার মায়া বোঝে না, তারা কোনোদিন প্রিয় মানুষের পরোয়া করে না….

পুরোনো পোশাক, ছেঁড়া চাদর, ধুলোমাখা আসবাবপত্র যেভাবে পাল্টায় মানুষ, আমিও নিজেকে এক্কেবারে সেভাবেই পাল্টে ফেলতে চাই প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে….

কিন্তু যতবার তুমি সামনে এসে দাঁড়াও আমি আমার পুরোনো অগোছালো ভাঙাচোরা আমিকে ভালোবেসে ফেলি। আমি আয়না ঢেকে তোমার চোখে নিজেকে খুঁজে পাই, আমায় সুন্দর লাগে দেখতে…..

আমার গালের ব্রণ, আমার কাঁচাপাকা চুল, আমার চোখের তলার কালি, আমার কপালের ভাঁজ সমস্তটাই সুন্দর হয়ে ওঠে।

মনে হয় শুধু তোমায় ছোঁবো বলেই এখনো নিজেকে মেরে ফেলতে পারিনি…..

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *