গড়পঞ্চকোট – শহর কলকাতা ছেড়ে দুই-পা বাড়ালেই – প্রিয়াঙ্কা বি

গড়পঞ্চকোট - শহর কলকাতা ছেড়ে দুই-পা বাড়ালেই - প্রিয়াঙ্কা বি

গড়পঞ্চকোট

প্রিয়াঙ্কা বি

অল্প সময়ে নতুন কোন জায়গায় যাব, যেখানে শহরের কোলাহল, জটিলতা আর ইঁটের খাঁচায় আকাশ ঢাকা নেই। এদিক সেদিক জিগ্যেস করে আর ইন্টারনেট হাতড়ে একেবারে মনের মতো জায়গা পেয়ে গেলাম — গড়পঞ্চকোট, জেলা পুরুলিয়া। ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে গেল, পাহাড়ে ঘেরা সবুজে মাখামাখি সাজানো কটেজগুলো দেখে। আরো সুন্দর হল কটেজগুলোর নাম। অর্জুন, পলাশ, মহুয়া, পিয়াল এমন আরো, —যেন প্রকৃতির কোল।

ঠিক বর্ষাকালটা আরম্ভ হচ্ছে, আর মনে পড়ছে গড়পঞ্চকোটের কথা। যদিও আমি আর আমার বন্ধু — সৃষ্টিছাড়া, পায়ে সরষে দানাযুক্ত দুই সখীতে গড়পঞ্চকোট গেছিলাম, তখন সেপ্টেম্বর মাস। মানে বৃষ্টি বিদায় নেওয়ার বেলা। তাও অমন সবুজ পাহাড় ঘেরা গড়ে যে কি বৃষ্টি হতে পারে তার ‘স্মৃতি যেন জোনাকি — জ্বলে নেভে’। আমাদের নদীমাতৃক দেশ, ‘বৃষ্টি পায়ে পায়ে’, ছোট থেকে দেখছি, বৃষ্টি আমাদের অতো নিয়মের ধার ধারে না, (আমাদের দুই বান্ধবীর মতো) তাই বৃষ্টি নয়, খেয়াল করুন কলকাতা শহরের গায়ে সবুজ পাহাড় হেলান দিয়ে বসে আছে নিশ্চিন্তে। শুধু তাই নয়, সে পাহাড়ের উপত্যকার খাঁজে খাঁজে রাজারাজরার ইতিহাস লুকিয়ে আছে, বিছিয়ে আছে নীল হ্রদ, লাল মাটির রাস্তা, সাজানো মাটির গ্রাম। —কি পায়ের তলায় সরষেগুলো কি সচল হল? তাহলে আমরা দুই বান্ধবীতে কি করেছিলাম বলি।

তখন বাঙালী মন জুন-জুলাইয়ের ছুটি-হীন নিত্যকার অফিস জীবন কাটিয়ে একেবারে মাথার চুল ছেড়া মেজাজে। সঙ্গে বছর দু’য়ের নতুন সংসারে গরমে নরমে চ্যাটচ্যাটে মস্তিষ্ক, বলছে — চল পালাই। কিন্তু এমন ডাকে সাড়া দিতে ঘর-গৃহস্থালীর মানুষদের বয়ে গেছে। তাই জোট বাঁধলাম দুই বান্ধবীতে। অল্প সময়ে নতুন কোন জায়গায় যাব, যেখানে শহরের কোলাহল, জটিলতা আর ইঁটের খাঁচায় আকাশ ঢাকা নেই। এদিক সেদিক জিগ্যেস করে আর ইন্টারনেট হাতড়ে একেবারে মনের মতো জায়গা পেয়ে গেলাম — গড়পঞ্চকোট, জেলা পুরুলিয়া।

তথ্যপাতি স্মৃতি থেকে মুছে গেছে প্রায়, কারণ আমরা গেছিলাম প্রায় বছর ছ’য়েক আগে। তারপর পায়ের সরষে অনেক জায়গায় ছুটিয়েছে। জীবনের ঘটনার ঘনঘটাও কম নয়, তাই মস্তিষ্ক এখন শুধু সারমর্মটুকু মনের গোপন কুঠুরীতে গচ্ছিত রাখে। তা সেই কুঠুরী হাতড়ে, ইন্টারনেটের সহযোগিতায় নিশ্চিত হয়ে তবে এখানে তথ্য দিচ্ছি। আর ছবিও হারিয়ে ফেলেছি কালের কুচক্রে। কিছু খুঁছে পেলাম আমাদের সবেধন নীলমণি ফেসবুক-এ, নিজের যত্নের অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে। ছবিগুলো আমার সাধের পকেট সাইজ সোনি সাইবার শটে তোলা। প্রায় আট বছরের সাধের ক্যামেরা সঙ্গীটিকে বছর দুই হল গৃহবন্দী করে ফেলেছি। তার সতীন এখন আমার হাতের মোবাইল সেট। ভারী অন্যায় যুগ চলছে। যাক, সে অন্য কথা। তথ্যপ্রমাণ সব দিলাম, এবার আসি আসল কথায়।  

২০১২ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন-এর ইন্টারনেট সাইট ওত যুগোপযোগী না থাকলেও সেবা ও সহযোগিতা বেশ মসৃণ ছিল, নিশ্চয়ই এখন আরো ভালো হয়েছে। দু’জন মহিলা বেশী ঝুঁকি না নিয়ে সস্তায় পুষ্টিকর সেবার স্মরণাপন্ন হলাম। মনে আছে ডাব্লিউবিএফডিসি-র সাইটে কটেজের উপযোগিতা, প্রাপ্যতা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য পাওয়া গেলেও, অনলাইন বুক করা যেত না। ফোনে কথা বলে, ইন্টারনেটে অফিসের ঠিকানা খুঁজে আমি দৌঁড়ালাম হিন্দ সিনেমা হলের কাছে ডাব্লিউবিএফডিসি-র  অফিসে ননএসি রুম বুক করতে। দু’দিনের জন্য থাকা খাওয়া সম্ভবতঃ হাজার বারোশ পড়েছিল তখন, শুধু তাই নয় একদিন আমাদের এসি রুম-এ সরিয়ে দিয়েছিলেন দায়িত্বে থাকা বনবিভাগ কর্মীরা। সে গল্পে পড়ে আসছি। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি — ডাব্লিউবিএফডিসি-র অফিস লোকেশন সম্ভবত সল্ট লেক হয়ে গেছে। যদি যেতে চান, যোগাযোগের ঠিকানা খেয়াল করে নেবেন।

হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে পাড়ি দিয়েছিলাম, বোধহয় কোন শনিবার অফিসের হাফ ছুটির পর। হাওড়া থেকে ট্রেনে। কোন ট্রেন আজ আর মনে নেই। কুমারডুবি স্টেশনে নেমেছিলাম, —বান্ধবীর স্মৃতি হাতড়ে জানলাম। স্টেশন থেকে কটেজের গাড়ি আমাদের রিসিভ করেছিল। কোন অসুবিধা হয়নি। স্বাভাবিক কারনেই এই জাতীয় কটেজগুলো খুব সুন্দর জায়গায় সুন্দরভাবে সাজানো থাকে। ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে গেল, পাহাড়ে ঘেরা সবুজে মাখামাখি সাজানো কটেজগুলো দেখে। আরো সুন্দর হল কটেজগুলোর নাম। অর্জুন, পলাশ, মহুয়া, পিয়াল এমন আরো, —যেন প্রকৃতির কোল।

ডাব্লিউবিএফডিসি-র একটি কটেজ

রাতে বাঙালী খাবারের জন্য ক্যান্টিনের সুব্যবস্থা আছে। সুন্দর দেখতে ক্যান্টিনটি। প্রকৃতি আর কটেজগুলোর সঙ্গে বেশ মানানসই। নিরিবিলিতে প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে আহার শেষ করা যায়। তবে এখানে থেকে বাইরে আর কোথাও খাবার খেতে হলে বেশ কসরত করতে হবে। কারণ জায়গাটি শহর জীবন থেকে দূরে। আমাদের সমস্ত ব্যবস্থাই বেশ তৃপ্তিদায়ক লেগেছিল, তাই আমরা অন্য কোন ব্যবস্থাপনার খোঁজও করিনি। আমরা নিশ্চিন্তে সবুজে মননিবেশ করেছিলাম। যে ঘরটি বুক করেছিলাম সে ঘরটি বেশ বড়-সড়। সুন্দর দৃশ্যসুখ জানলার বাইরে হাতছানি দিচ্ছে। ডাব্লিউবিএফডিসি-র গড়পঞ্চকোট ব্যবস্থাপনায় কিন্তু বিভিন্ন দামের অনেক রুম আছে। যতদূর মনে পড়ে ডাল, ঝুরি ঝুরি আলুভাজা, ডিমের ঝোল, ভাত দিয়ে রাতের ভোজ পর্ব সেরে ডাব্লিউবিএফডিসি-র কম্পাউন্ডে সামান্য ঘোরাঘুরি করে, রাতে আরামের ঘুম দিলাম। পরের দিন সকালে ডাব্লিউবিএফডিসি-র কর্মচারীদেরই ঠিক করে দেওয়া এসি চারচাকায় সওয়ার হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম, সকালের লুচি তরকারী খেয়ে।

আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোকই গাইডের কাজ করলেন নিপূণভাবে। প্রথমেই গেলাম গড়পঞ্চকোটের প্রাচীন ইতিহাস যেখানে ঝোঁপে ঝাড়ে, পাহাড়ি জঙ্গলে চাপা পড়ে আছে সেখানে।   

ছোটনাগপুর মালভূমির একটি অংশ পাঞ্চেৎ পাহাড়। ইতিহাস সেই পাহাড়েই ঘেরা। লোকারণ্য থেকে দূরে জঙ্গলের মধ্যে সেই গড়ে গিয়ে দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়বে ভগ্নপ্রায় অসংরক্ষিত পঞ্চরত্ন মন্দির। এ হয়তো শিখর রাজবংশের শেষ নিদর্শন। শেষ বলতে বাধ্য হচ্ছি, — সংরক্ষণের অভাবে অবহেলায় ওখানে কোন ইতিহাসই আর আমাদের মত পরিযায়ী দর্শকদের জন্য অবশিষ্ট নেই। ঐতিহাসিকরা পড়াশোনা করে পুঁথিগত যা করে রেখেছেন তাই হয়তো সম্বল। তবে আমাদের বিজ্ঞ ড্রাইভার মশাই যখন ধংসস্তূপের সামনে দাঁড় করিয়ে অমন জনমানব বর্জিত জায়গায় ইতিহাসের পাতা মেলে ধরছিলেন, আমাদের রীতিমত রোমাঞ্চ হচ্ছিল। আমি আবার কল্পনা প্রবণ মানুষ। মনে মনে সিংদেও রাজবংশের গড়েই ঢুকে পড়লাম। পাহাড়ের পর পরিখা ঘেরা শিখর রাজধানী পঞ্চকোট— নিশ্চিন্ত গড়। পাঁচ মাইল জুড়ে নাকি ছিল তাঁদের পাথরের দুর্গ। আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বারো বর্গমাইল এলাকা জুড়ে। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। বর্গী আক্রমণে পঞ্চকোট রাজধানীর গড় গরিমা হারিয়েছিল। এখন শুধু পঞ্চরত্ন মন্দির যা কিনা দুর্গের ভেতর নাটমন্দির হিসেবে ছিল তাই রাজবংশের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টেরাকোটার রাস মন্দিরটির কাছে গেলে তার গায়ের সৌখীন কারুকাজ এখনো মুগ্ধ করবে।

পঞ্চরত্ন মন্দির

মন্দিরটিতে অনেকগুলো স্তর সম্ভবত ছিল মন্দির গহ্বরে পৌঁছানোর আগে। সেসব আর অবশিষ্ট নেই। মন্দির গহ্বরে কোন মূর্তি নেই। হয়তো কখনো ছিল, সে এখন পড়াশোনার বিষয়। শুধু গুগল করেই অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। তা শুধু গুগল করবেন কেন? সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়ার আগে একবার নিজেরাই চলে যান। ঘণ্টা পাঁচেকের পথ বই তো বেশি নয়।

ওই গড়ের প্রধান দুর্গে ট্রেক করে পৌঁছাতে হয়। আমরা যখন গেছিলাম তখন বৃষ্টি বাদলায় সে রাস্তা আর ট্রেকের যুগ্যি ছিল না। জঙ্গল আর পিচ্ছিল পথ। তবে বুঝতে পেরেছি কত অ্যাডভেঞ্চার লুকিয়ে আছে সে রাস্তায়। আমি বলবো এ লেখার শেষ পর্যন্ত পড়ে তবে ঠিক করুন কোন ঋতুতে যাবেন। যাইহোক, ট্রেক করা হবে না বলে আমরা ফিরে এলাম পাঞ্চেৎ লেকে। 

পাঞ্চেৎ লেক ও তার পাশের রাস্তা

তিন দিক পাহাড় ঘেরা বনানী, মাঝে মাটির চওড়া রাস্তা, একপাশে বড়ো পাঞ্চেৎ হ্রদ, আরেকপাশে মাঠ, জঙ্গল পেরিয়ে লোকালয়। এখানে মনে আছে জলের পাশে ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আছি, দেখতে পেলাম দূরে পাঞ্চেৎ পাহাড়ের মাথায় মেঘ জমেছে। আর ধীরে ধীরে সাদা বৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, যেন আমাদের গায়ের শহুরে গন্ধ ধুয়ে না দিলে শান্তি পাচ্ছিল না। অগত্যা শহুরে প্রাণীরা, এসি গাড়ীতে চড়ে বসলাম। ফিরে যাব রিসর্টে। পথ ঘাটের কথা খুব অন্যায় রকম ভুলে গেছি। বড্ড অপরাধী লাগছে যখন লিখতে বসেছি। তবে মনে আছে, ফিরেছি যখন বৃষ্টি থেমে গেছে। দু’জনে ঠিক করলাম হেঁটে আশপাশ টুকু দেখবো। ডাব্লিউবিএফডিসি-র ঘেরাটোপ থেকে বেড়োলেই গেটের উল্টো দিকে গ্রামের মেঠো পথ।

গ্রামের পথ

আগেই বলেছি সরকারী রিসর্ট, ডাব্লিউবিএফডিসি-র রিসর্ট এতো সুন্দর জায়গা বেছে তৈরী করা হয় যে, খুব দৌঁড় ঝাঁপ করে স্পট দেখতে না গেলেও চলে। যারা হানিমুন মানেই দীঘা ছোটেন তারা কিন্তু গড়পঞ্চকোটের নির্জন সবুজে আসতেই পারেন। আমি যদিও পরামর্শ দিয়ে দেখেছি, যারা দীঘা, মন্দারমণি পছন্দের তালিকায় রাখেন তারা এমন পাহাড় ঘেরা নির্জন সবুজকে পছন্দ করেন না। বড্ড একাকী, বেশহুরে যে। তবে একদম নিরাপদ। যদি কোন অঘটন হয়, জানবেন সেটা আপনার ঘরে বসেও হওয়ার ছিল। আর যারা নেচার ফোটগ্রাফার তাদেরও কিন্তু বিষয়ের অভাব হবে না। প্যানারমিক ল্যান্ডস্কেপে হাতেখড়ি দিতে চাইলে একাই চলে যান। জায়গাটি আমার ভারী পছন্দ হয়েছে, তাই একরকম তোষামোদই করে ফেলছি বোধহয় আপনাদের পাঠানোর জন্য।  

অন্ধকার হয়ে এলে আমরা চা-এর ক্যান্টিনে চলে এলাম। এই ক্যান্টিনটি আমাদের আরো পছন্দ হল। একদম গ্রামের কুঁড়ে ঘরের আদলে তৈরি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা। জানলাম এমন মেঘলা সন্ধ্যায় মুরগীর মাংসের পকোড়া পাওয়া যাবে চা-এর সঙ্গে। এক্কেবারে উত্তম ব্যবস্থা। একটি টেবিল দখল নিয়েছি চা, পকোড়া অর্ডার করে, আকাশ আছড়ে পড়লো দরজার বাইরে। এমন পাগল করা বৃষ্টি ‘বাপের জন্মে’ দেখিনি ভাই!

রাতে রিসর্টে

ওমন চড়াই-উৎরাই রিসর্টের রাস্তাও মুহুর্তে পাহাড়ি নদী হয়ে গেলো। আর তেমনি বাজ পড়ার আওয়াজ। কোনো গাছের যে সেদিন অপঘাত ঘটেছে আমি নিশ্চিত। আমাদের চা-পকোড়ার স্বাদ ওই আবহাওয়ায় দ্বিগুণ হয়ে গেলো। বেড়িয়ে যে নিজেদের রুমে যাব সে উপায়ও যখন বন্ধ হল, —নিরামিষ, আমিষ মিলিয়ে দু-তিন প্লেট পকোড়া দু-কাপ চায়ের সঙ্গে হজম করলাম। তবে ওমন উপাদেয় চা-পকোড়া সাবার করার জন্য ওমন বৃষ্টিকে শতকোটি ধন্যবাদ। গড়পঞ্চকোট আমাদের এত সুন্দর সুন্দর অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে, —আমরা সত্যি কৃতজ্ঞ হয়ে আছি। অবাক করা বৃষ্টির দৃশ্য, অনেকক্ষণ চেষ্টা করেছি আমার একমাত্র সম্বল সোনি সাইবার শটটিকে সাক্ষীগোপাল করতে। খুব হতাশ হয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। কেননা তখনো আমরা সেলফি গার্ল হতে শিখিনি। ভাগ্যিস, তাই অনেক সবুজ, নীল, ধূসর শুধু তৃপ্তির জন্য উপভোগ করে আসতাম, ভালোলাগার প্রমাণ কি সব সময়  জাহির করে দেখানো যায়?   

বৃষ্টি থামতে রাত দশটা বেজে গেল। সোজা মেইন কোর্স খাবারের ক্যান্টিনে চলে এলাম। বৃষ্টি থামতেই রিসর্টের রাস্তাগুলো পাহাড়ি নদী থেকে ফিরে রাস্তা হয়ে গেল। খেতে বসেছি বড় মাপের একটি বুনো পোকা মাথার উপর উড়ে এল। এই ব্যাপারে আমি বেজায় ভিতু। আমার বান্ধবীর চোখে প্রথম পড়েছিল পোকাটা, পাশের টেবিলে একদল ছেলে খেতে বসেছিল (যারা ওই বিকেলে রিসর্টে এসেছে যখন আমরা বাইরে ছিলাম) দেখে আমাকে চাপা স্বরে মিটিমিটি হেসে বলল, ‘একটা ব্যাপার হবে, চিৎকার করবি না একদম’। কি বলছে যথারীতি বুঝলাম না, আর সেই সুযোগে বেয়াক্কেলে পোকাটা আমার কানের পাশ দিয়ে উড়ে গেল। আমি বান্ধবীর কথা রেখেছিলাম। ভব্যতা বোধ আমার চিৎকারকে চাপা আর্তনাদে পরিবর্তন করে দিল। কেউ আমাকে দেখে হেসেছিল কিনা জানিনা, আমি একপ্রকার টেবিলের তলায় সেঁধিয়ে গেছিলাম। বীরাঙ্গনা বান্ধবী যখন নিশ্চিত করলো যে আমার সন্মান বাঁচাতে পোকাটি মানব সমাজ ত্যাগ করে বেড়িয়ে গেছে, তখন অপরাধীর মত মাথা তুলে খাওয়া-দাওয়া সারলাম।

রুমে ফিরেছি কি দরজায় কেউ নক করলো। তখন সবে ঘরের দরজার লক পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছি যে, নিশ্চিন্তে রাতে ঘুমাতে কোন অসুবিধা হবে না। কেননা ঘরে ঢোকার সময়ে আবিষ্কার করেছি সেই ছেলেদের দলটি আমাদেরই ফ্লোরে প্রায় পাশের রুমে এসে উঠেছে। যদিও রুমের বাইরে কমন বারান্দায় রাতে পাহাড়া থাকবে শুনেছি, তবু ছেলেপিলের দল রাতে রঙিন জলে ডুবে কি রং দেখাবে তার ভরসা পাচ্ছিলাম না। আহা! পুরুষরে! যতই সভ্য ভব্য পোশাকে ঘোরো না কেন সভ্যতা আজ বড়বেশী অবিশ্বাসের চোখে দেখে, ভীন গ্রহের কোন অপকারী প্রাণী ভাবে তোমায়। এই ধারণা ভাঙার দায়ও কিন্তু তোমাকেই নিতে হবে, যদি হও  বন্ধু —হে তুমি পুরুষ! 

সবে গুছিয়ে বিছানায় গা এলিয়েছি কি আমাদের দরজায় নক। আওয়াজ দিয়ে জানলাম রিসর্টের কোন কর্মচারী। কি ব্যাপার বুঝলাম না। দরজা খুলতেই উনি যে প্রস্তাব দিলেন, এমন প্রস্তাব আগামী জীবনে আর কেউ দেবে না, সে কথা হলফ করে বলতে পারি । 

কর্মচারী ভদ্রলোক বিনয়ের সঙ্গে বললেন , —’ ম্যাডাম! একটি এসি রিসর্ট খালি হয়েছে, আপনাদের জন্য রেডি করে আসছি। আপনারা যদি নিজেদের জিনিস গুছিয়ে নেন, আপনাদের পৌঁছে দেব!’ —ভ্যাবাচেকা খেয়েছেন কখনো? আমরা রীতিমত অবাক।  ভাবলাম ভুল রুমে নক করে ফেলেছেন। জানালাম আমাদের দু’রাতের জন্য এই কটেজটিই বুক করা আছে, আমরা বুকিং-এ কোন পরিবর্তন করিনি। পারতপক্ষে সেই সময়ে অনলাইন ব্যবস্থা ওত সুবিধেজনক না থাকায় রাতারাতি কিছু পরিবর্তন আনা সম্ভবও ছিল না। আর যখন বৃষ্টি-বাদলা হয়ে প্রকৃতি নিজ দায়িত্বে এয়ার কন্ডিশন করে দিয়েছে তখন রাতদুপুরে হঠাৎ বেশী টাকা দিয়ে এসি রুম নিতে যাব কেন হে! তাতে তিনি জানালেন, ওনাদের রেঞ্জ অফিসার বলেছেন আমাদের এসি রুমে সরিয়ে নিয়ে যেতে; আমরা দু’জন মহিলা—পাশের রুমেই একদল পুরুষ এসেছে। যদিও সারারাত পাহাড়া থাকে, তবু ব্যবস্থা যখন ওনারা করতে পেরেছেন তখন অযথা ঝুঁকি নেবেন না। আর এসি রুমের চার্জ ওনারা নেবেন না। আমাদের নিরাপত্তাই ওনাদের কাম্য।

‘তুমি মায়ের মতোই ভালো

          আমি একলাটি পথ হাঁটি…’

টিপ টিপ বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। ভদ্রলোক অমায়িক বদনে বড় একটি ছাতার তলায় আমাদের ব্যাগগুলো নিয়ে পথ দেখিয়ে চললেন। আমরা নিজেদের ছাতায় পেছন পেছন এসি কটেজে ঢুকলাম। ভদ্রলোক নতুন রুমের ব্যবস্থাপাতি বুঝিয়ে এসির রিমোট হাতে দিয়ে জানিয়ে গেলেন, চাইলে আমরা ব্যবহার করতে পারি।            

WBFDC Compound

সকালও অপেক্ষা করে ছিল, আমাদের বিস্ময়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য। রাতে তো বুঝিনি কেমন কটেজে উঠেছি। ভেতরটুকু বুঝে নিয়ে আনন্দে, কৃতজ্ঞাতায় গদগদ হয়ে রাত কাটিয়েছি। ঘুম ভেঙে টুথ ব্রাশ হাতে দরজা খুলেছি, —কি সাংঘাতিক! পাঞ্চেৎ পাহাড় সবুজ চাদর গায়ে জড়িয়ে একেবারে কটেজের গায়ে চলে এসেছে। আমরা সকালের চা ঘরেই আনিয়ে নিলাম। পাঞ্চেৎ পাহাড় মশাইকে সামনে রেখে দু’জনে চায়ের কাপ নিয়ে বসে গেলাম মুগ্ধ হয়ে। কটেজটি আমাদের একতলায়। বারান্দা বলতে খোলা ছাদ। যতটা না হলে শহুরে মানুষরা তৃপ্তি পাবেননা ঠিক ততটুকুই ডাব্লিউবিএফডিসি ডিপার্টমেন্ট ইঁট, কাঠ, সিমেন্ট দিয়ে প্রকৃতিকে আড়াল করেছে। বাকি টুকু সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রন করে ডেকোরেট করা, আর তার বাইরে তো প্রকৃতি নিজেই সেজে বসে আছেন।

এমন করে পাহাড় গড়পঞ্চকোটকে ঘিরে আছে, এটা মাত্র আড়াইশ কিলোমিটার দূরে কলকাতায় বসে কল্পনা করা যায় না চট করে। ফেরার সময় তো ছকে বাঁধা। দুপুরের খাবার সক্কাল সক্কাল খেয়ে রূপকথার রাজ্য থেকে বিদায় নিলাম। কর্মচারীদের আন্তরিকতা ফেরার সময় আমাদের আরও আপন করে নিল। যেন আত্মীয়ের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমাদের এসি কটেজটির উল্টো দিকে ডাব্লিউবিএফডিসি-র উদ্যোগে বনজ সম্পদের অফিসিয়াল স্টল। সেখানে বসে হিসেব পত্র মিটিয়ে, বনজ মধু কিনে, খোস গল্প করে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ডাব্লিউবিএফডিসি-র গাড়িতেই ফেরার পথ ধরলাম। ফেরার পথে দামোদর নদের মাইথন ড্যাম দেখে আবার উল্টো পায়ে কুমারডুবি স্টেশন যাব। 

দু’জনে দু’প্যাকেট মুড়ি মাখা নিয়ে বিকেলের রোদে পিঠ দিয়ে ড্যামের চওড়া রেলিং-এ চড়ে বসলাম। এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে বসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। তবে দুঃখ যা পেলাম তা হল মুড়ি মুখে চালান করতে রীতিমত নাকানি চোবানি কান্ড। হাওয়ার ঠেলায় সব মুঠো থেকে পালিয়ে যাচ্ছে, মুখে দেব কি উপায়ে। সেই নিয়ে কিছুক্ষন মজা করে, আবার গাড়িতে ফিরে গেলাম। গাড়ি ড্যাম থেকে দূরে পাহাড়ের বাঁকে দাঁড় করাতে হয়েছিল। নইলে ইউ টার্ন নেওয়ার অনুমতি বাঁধের উপর বোধহয় নেই, এমন কিছু কারণ ড্রাইভার ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন। যাকগে ওতে আমাদের উপভোগের মাত্রায় কোন খামতি আসেনি। এখন হঠাৎ মনে পড়লো, আমরা ডাব্লিউবিএফডিসি-র ক্যান্টিনে সকালের খাবার খেয়ে বেড়িয়েছিলাম। দুপুরের খাওয়া আমরা মাইথন ড্যাম-এর গায়ে পাহাড়ের পায়ের কাছে কোন রেস্তরায় সেরেছিলাম; ড্রাইভার ভদ্রলোকই তার জানাশোনা আমাদের রুচি সম্মত রেস্তোরায় নিয়ে গেছিলেন।       

মাইথন ড্যাম কিন্তু আলাদা করে ঘুরতে যাওয়া যায়। এখানেও ড্যামকে কেন্দ্র করে লজ আছে। দামোদর নদের উপর এই ড্যামটি দুঃখের নদ দামোদরের বদনাম ঘোচানোর জন্যই ১৯৪৮ সালে আইন করে বানানো হয়। উদ্দেশ্য নদে বন্যার জল নিয়ন্ত্রন ও সেই সঙ্গে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। নদের উপর সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারেজটি রীতিমত দর্শনীয় ও ট্যুরিজম খ্যাত। এই ড্যামে একটি দ্বীপও আছে; সবুজ দ্বীপ বলা হয়। সেখানে টুরিস্টদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বোটের ব্যবস্থা আছে। আমাদের কাছে অবশ্য সে সময় ছিল না। সবুজ দ্বীপ যেতে হলে মাইথনে একদিন থাকতে হবে।

আমরা পাহাড়, জঙ্গল, নদনদী, প্রাকৃতিক-কৃত্রিম সরবর, দ্বীপ, পাহাড়ী গ্রাম, সবুজ, সোঁদা মাটি সব কিছুকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাঁধা সময়ের মধ্যে বাঁধা গরুর মতো নিজ নিজ গোয়ালে ফেরত এলাম। মনে রয়ে গেল গড়পঞ্চকোট। কি সুন্দর নামটা না? নামেই রাজার গল্প উঁকি দিচ্ছে। এমন জায়গার নাম ঠিক এমনই হতে হত। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন নয়। নামেই পরিচয়।

গড়পঞ্চকোট নিয়ে ইন্টারনেটে এত তথ্য আছে যে আমি আর, সেসব তথ্য দিয়ে ভারী করলাম না। যারা যেতে ইচ্ছুক তারা এই লেখা পড়ে ঠিক সব তথ্য খুঁজে নেবেন। কিছু লিঙ্ক আমি আপনাদের সুবিধার্থে লেখার মধ্যেই দিয়ে রেখেছি। যাবেন কিন্তু। ফিরে এসে জানাবেন আপনাদের কেমন লাগলো। আপনাদের অভিজ্ঞতা শোনার অপেক্ষায় রইলাম।

 

 

   

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *