তেজপাতা – bay leaf

বে লিফ , বিজ্ঞানসম্মত নাম লড়াস নোবিলিস (Laurus Nobilis) ;  “তেজপাত্তা” হিন্দিতে,  “মশলা আকু” তেলেগুতে,  “বিরিনজি ইলাই” তামিলে, মালায়লামে “কারুবাইল”, কান্নাডা ভাষায়  “পাঠঠা”, বাংলায় “তেজপাতা”, “মশলা আকু” তেলেগুতে, “বিরিনজি ইলাই” তামিলে, মালায়লামে “কারুবাইল”, কান্নাডা ভাষায় “ল্যভেঙ্গাডা ইলে”, বাংলায় “তেজপাতা”, গুজরাটিতে “আতকায়া ভাগারানু”, মারাঠি ভাষায় “তমাল পাত্র” এবং সবশেষে পাঞ্জাবিতে “তেজপাট্টা” । তেজপাতা একটি আয়ুর্বেদীয় গাছ যা মূলত ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় দেখতে পাওয়া যায় । তবে ভারতের মতো ক্রান্তীয় অঞ্চলেও এদের দেখা মেলে। তেজপাতা মূলত ব্যবহৃত হয় রন্ধনের ক্ষেত্রে এবং সুগন্ধি প্রস্তুতিতে ।

ভারতীয় তেজপাতা প্রজাতিতে মূলত তিনটি শিরার মতো অংশ দেখা যায় তা আকারে ডিম্বাকৃতি এবং নরম হয় এই তেজপাতা সাধারণত একটু তীক্ষ্ণ হয় যা স্বাদে কিছুটা কটু বা তিক্ত হয় । এই তেজপাতা স্বাদে এবং গন্ধে অনেকটা দারুচিনির মতো হলেও কিছুটা হালকা হয়. তেজপাতা ব্যবহৃত হয় সাধারণত সতেজ, শুকনো এবং গুঁড়ো হিসাবে । তিক্ত স্বাদের জন্য তেজপাতা শুধু মুখে খাওয়া যায় না , তা মূলত আমিষ এবং নিরামিষ বিভিন্ন পদের স্বাদ বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়। ভারতীয়, নেপালি এবং ভুটানের বিভিন্ন রান্নার পদে তেজপাতার সবথেকে বেশি ব্যবহার দেখা যায় । মোগলাই খানা, বিশেষত বিরিয়ানি এবং বিভিন্ন কোর্মা রান্নার অন্যতম মূল উপাদান তেজপাতা । শুকনো তেজপাতা গরম মসলায় অন্য মাত্রা আনে আর এই পাতা নিঃসৃত তেল সুগন্ধি তৈরির অন্যতম উপাদান । তেজপাতা থেকে যে তেল নিষ্কাশিত হয় তার ঔষধিক গুনের জন্যও তা বিভিন্ন অসুস্থতাতে পথ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় । এই তেলের গুণাবলী বিভিন্ন কীটপতঙ্গ প্রতিরোধে সক্ষম । রন্ধন সম্বন্ধীয় গুণাবলী ছাড়া তেজপাতার ঔষোধিক গুন জীবাণু প্রতিরোধক, ছত্রাক প্রতিরোধক, এবং আমাদের শরীরের পয়ঃপ্রণালী সম্যসায় সাহায্য করে ।

ছবি : প্রিয়াঙ্কা বি
ছবি : প্রিয়াঙ্কা বি

তেজপাতার মধ্যে অনেক উদ্ভিজ্জ  উপাদান, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ আছে যা আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে উপযোগী. ঐতিহাসিক সময়ে গ্রিক এবং রোমানদের মধ্যে এই ভেষজ উপাদানটির বহুল ব্যবহার দেখা যেত এবং তারা বিশ্বাস করতো যে তেজপাতা বুদ্ধি, শান্তি এবং রক্ষার প্রতীক. এর বিভিন্ন গুণাবলী সম্বন্ধে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো ।

মধুমেহর চিকিৎসা

মধুমেহ রোগের দ্বিতীয় প্রকারটি যেটি আমাদের শরীরের পক্ষে খুবই ক্ষতিকারক , সেই রোগের প্রধান কারণ যে শর্করা তার পরিমান যাতে রক্তে বৃদ্ধি না প্রায়, শুধু তাই নয় শরীরে মেদ বা চর্বি রোধ করতে তেজপাতা ক্ষমতাশালী । তেজপাতা শুধু শরীরে শর্করার পরিমান কমায় না, আমাদের হৃৎপিণ্ডের কার্যকলাপ সঠিক ভাবে চালাতে সাহায্য করে । তেজপাতা মানুষের শরীরে ইন্সুলিন সৃষ্টির প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে যাতে শরীরে এই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা সঠিক ভাবে বজায় থাকে ।

পরিপাকে সাহায্যকারী

তেজপাতা মানব শরীরে পাকস্থলীর পরিপাক ক্ষমতা ঠিক রাখতে সাহায্য করে যাতে আমাদের কোনো রকম অজীর্ণতা না হয় । সকালে আমরা যে চা পান করি তার সাথে একটি বা দুটি তেজপাতা একসাথে গরম জলে ফুটিয়ে নিয়ে পান করলে আমাদের হজম জনিত কিছু সমস্যা যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য, অম্লমধুরতা থেকে আমরা নিষ্কৃতি পেতে পারি । বদহজম এবং গ্যাসের ক্ষেত্রে ৫ গ্রাম তেজপাতার সাথে একটি আদার টুকরোকে ২০০ মিলিগ্রাম জলে ফোটানো উচিত যতক্ষণ না জল নিজের পরিমানের ৪ ভাগের ১ ভাগ হচ্ছে । এর সাথে অল্প পরিমান মধু মিশিয়ে দিনে দু বার করে পান করলে উপরিউক্ত অসুবিধা থেকে আরাম পাওয়া যায় । এই মিশ্রণ শারীরিক দুর্বলতা থেকে আমাদের শরীর সুস্থ রাখতে উপকারী ।

ঠান্ডা রোগসংক্রমণ প্রতিকারক

তেজপাতা সর্দিজ্বর, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে. শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় গরম জলের সাথে দুই থেকে তিন টি তেজপাতা দিয়ে ফোটানো উচিত দশ মিনিট ধরে । তারপর একটি শুকনো তোয়ালে ওই মিশ্রনে ভিজিয়ে নিয়ে হালকা করে বুকের উপর দিলে তা সর্দিজ্বর এবং সংক্রামক রোগ থেকে আরাম পেতে সহায়তা করে ।

ব্যাথা নিরাময়কারী

তেজপাতা থেকে যে তেল নিঃসৃত হয় তার মধ্যে উত্তেজক রোধকারী কিছু উপাদান থাকে যা ব্যাথা নিরাময়ে সাহায্যকারী যেমন মচকানোজনিত ব্যাথা, মাংসপেশিতে মোচড়জনিত ব্যাথা, সন্ধিপ্রদাহ বা গেঁটেবাত । কপালের পার্শ্বদেশ যদি তেজপাতা দিয়ে মালিশ করা যায় তাহলে মাথাধরা এবং মাথার অন্য অসুখ নিরাময়ে সাহায্য করে । গরম জলে তেজপাতা ফুটিয়ে তা পান করলে মাথাব্যাথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ।

উদ্বেগ এবং বাধ্য বাধকতা

খুব কম মানুষই এটা জানে যে তেজপাতা আমাদের উদ্বেগ এবং চাপ বা বাধ্য বাধকতা কমাতে সাহায্য করে বা বলা ভালো যে আমাদের মানসিক শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে । পুদিনা পাতার কিছু গুণাবলী যা তেজপাতায় থাকার দরুন আমাদের শরীরে উত্তেজনা বৃদ্ধিকারী হরমোনকে ( যে রস রক্তের সাথে মিশে আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে সচল রাখে) নিয়ন্ত্রিত করতে পারে । আমাদের প্রচন্ড উদ্বেগের সময়ে আমরা যাতে নিজেদের ঠিক রাখতে পারি সেদিকে খেয়াল রাখে ।

তেজপাতায় উপস্থিত কিছু খনিজ পদার্থ(মিনারেলস) এবং খাদ্যপ্রাণের (ভিটামিন) তালিকা নিচে উল্লিখিত হলো ।

 

খনিজ পদার্থ/খাদ্যপ্রাণ            পুষ্টিকারক গুন                      শতকরা হিসাবে উপস্থিতি

কর্মশক্তি/উদ্দ্যম                         ৩১৩ কিলো ক্যালোরি                         ১৫.৫ %

শর্করা জাতীয় পদার্থ                   ৭৪.৯৭ গ্রাম                                        ৫৭ %

আমিষ উপাদান                          ৭.৬১ গ্রাম                                          ১৩ %

স্নেহদ্রব্য                                      ৮.৩৬ গ্রাম                                         ২৯ %

পথ্য সম্বন্ধীয় তন্তু                        ২৬.৩গ্রাম                                         ৬৯ %

ফোলেটস                                  ১৮০ মিলিগ্রাম                                     ৪৫ %

নিয়াসিন                                   ২.০০৫ মিলিগ্রাম                                  ১২.৫ %

প্যারিডক্সিনে                               ০.৪২১ মিলিগ্রাম                                 ১৩৩ %

রিবোফ্লাভিন                              0০.৪২১ মিলিগ্রাম                                 ৩২ %

ভিটামিন এ                                ৬১৮৫ মিলিগ্রাম                                  ২০৬ %

ভিটামিন সি                               ৪৬.৫মিলিগ্রাম                                   ৭৭.৫ %

সোডিয়াম                                  ২৩ মিলিগ্রাম                                      ১.৫ %

পটাসিয়াম                                  ৫২৯ মিলিগ্রাম                                    ১১ %

ক্যালসিয়াম                                ৮৩৪ মিলিগ্রাম                                   ৮৩ %

কপার                                       ০.৪১৬ মিলিগ্রাম                                  ৪৬ %

আয়রন বা লোহা                       ৪৩ মিলিগ্রাম                                       ৫৩৭ %

ম্যাগনেসিয়াম                             ১২০ মিলিগ্রাম                                    ৩০ %

ম্যাঙ্গানিজ                                  ৮.১৬৭ মিলিগ্রাম                                 ৩৫৫ %

ফসফরাস                                  ১১৩ মিলিগ্রাম                                     ১৬ %

সেলেনিয়াম                                 ২.৪ মিলিগ্রাম                                    ৫ %

জিঙ্ক                                         3৩.৭০ মিলিগ্রাম                                  ৩৩ %

 

উপরিউক্ত সমস্ত বর্ণনা বিভিন্ন তথ্য থেকে নিয়ে একত্রিত করা হয়েছে । পাঠকগণ চাইলে এই প্রবন্ধ আলোচনা সাপেক্ষ ।

 

~ তীর্থঙ্কর মণ্ডল

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *