দুর্ভিক্ষের কবলে বিশ্বের দু-কোটি মানুষ – পলাশ পাল

দুর্ভিক্ষের কবলে বিশ্বের দু কোটি মানুষ

ঋগবেদের উপাখ্যানে ক্ষুধাকাতর ঋষি বামদেব বলেছিলেন, ‘অভাবের জন্য আমি কুকুরের নাড়িভুঁড়ি রান্না করে খেয়েছি, দেবতারাও আমাকে কোনো সাহায্য দেয়নি’।

পলাশ পাল

খবরটা সংবাদ মাধ্যমে এসেছে, কিন্তু ততটা গুরুত্ব পায়নি। মহাকাশ গবেষণা, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপনাস্ত্র উৎক্ষেপণ, ট্রাম্প-জমানা, হিন্দুত্ববাদের জয়োল্লাস, ইসলামিক স্টেট, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ-ই সবটুকু নজর কেড়ে নিয়েছে। তবে রাষ্ট্রসংঘ উদ্বেগ চাপা রাখতে পারেনি। গত কয়েক বছর ধরে দুর্ভিক্ষ বারবার হানা দিয়েছে কেনিয়া, ইথিওপিয়া, উগান্ডা, চাদ, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, তানজানিয়া সহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। এবার সেই তালিকা আরো দীর্ঘ হতে চলেছে। ইয়েমেন, দক্ষিণ সুদান, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়া—চারটি দেশের দুই কোটির বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। অবিলম্বে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের সংস্থান না-করতে পারলে সবাই অনাহারে মারা যাবে। ইউনিসেফ-এর হিসেব অনুযায়ী, তালিকায় রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ শিশু। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে রাষ্ট্রসংঘ ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো মানবিক বিপর্যয়’ বলে ঘোষণা করেছে।

দুর্ভিক্ষের কবলে বিশ্বের দু কোটি মানুষ
দুর্ভিক্ষের কবলে বিশ্বের দু কোটি মানুষ
দু’কোটি সুডানিজ শিশু, নারী, পুরুষ গৃহহারা এবং অনাহারে

রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ইয়েমেনে প্রতি দশ মিনিটে একটি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে, ৫ বছরের কম বয়সি ৫ লক্ষ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ দিন কাটাচ্ছে অনাহারে। দক্ষিণ সুদানে ইতিমধ্যে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে প্রায় এক লক্ষ মানুষ, দুর্ভিক্ষের দোরগোড়ায় আরো এক লক্ষ। দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা প্রয়োজন। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ায়। গত ডিসেম্বর মাসের হিসেব অনুযায়ী ৭৫ হাজার শিশু খাদ্যাভাবের ঝুঁকিতে ছিল, বর্তমানে নাইজেরিয়া ও তার পাশ্ববর্তী অঞ্চলে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ চরম খাদ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সোমালিয়ায়, মাত্র ছয় বছর আগের দুর্ভিক্ষে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ২ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষের। চলতি বছরে আবার চরম খরার কবলে পড়েছে দেশটি। খাদ্য ও পানীয় জলের অভাবে মার্চ মাসের শুরুতেই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অবিলম্বে ৬২ লক্ষ মানুষের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য প্রয়োজন।

কেন আফ্রিকার দেশগুলি বারবার দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ছে, বিশেষজ্ঞরা এর কারণ হিসাবে খরা, দারিদ্র, অভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা, গোষ্ঠীগত সংঘাত ও সুশাসনের অভাবকে দায়ী করে থাকেন। পাশাপাশি, অনেকেই আবার সঙ্কটের মূলে ঔপনিবেশিক শাসকবর্গের অপরিকল্পিত নীতিকে দোষারোপ করেন। তাঁদের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ আরোহণের লোভে অবাধে বৃক্ষ নিধন, শিল্পায়নের নামে লাগামছাড়া পরিবেশ দূষণের কারণে গ্রীন হাউস গ্যাসের প্রভাব, প্রকৃতিগত ভবেই উত্তপ্ত এই অঞ্চলকে অতিরিক্ত খরা প্রবণ করে তুলেছে। এই সঙ্গে রয়েছে এবছরের এল নিনোর প্রভাব।

ইয়েমেন দীর্ঘদিন ধরেই গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত, সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুতি বিদ্রোহীদের লাগাতার সংঘর্ষ চলছে। গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিবর্গ। সরকারি বাহিনীকে মদত দিচ্ছে সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে হুতি বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন জানানোর অভিযোগ রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির মধ্যে ইয়েমেন অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল রাষ্ট্র। তাই নিজের ক্ষমতায় এতবড় বিপর্যয়ের মোকাবিলা করা তার পক্ষে অসম্ভব। উপরন্তু সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর নৌপথে নিষেধাজ্ঞার কারণে খাদ্য সরবরাহের পরিকাঠামো সম্পূর্ণ বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে।

গৃহযুদ্ধ
ইয়েমেন গৃহযুদ্ধ

রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব এন্তেনিও গুতেইরেস বলেছেন, আগামী জুলাই মাসের মধ্যে ৪৪০ কোটি ডলারের তহবিল জোগাড় না-হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। কিন্তু আশঙ্কার ব্যাপার হল, মার্চ মাস পর্যন্ত মাত্র নয় কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ছে। রাষ্ট্রসংঘের আবেদন সত্ত্বেও বিশ্বের ধনী দেশগুলির কাছ থেকে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, একদিন এই সব দেশ থেকে কোটি কোটি ডলার মূল্যের সম্পদ নির্গমন হয়েছে, সেই সম্পদে বলীয়ান হয়ে তারা গড়ে তুলেছে দুনিয়াব্যাপী অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। আর তাই, অনেকে মনে করেন, উন্নত দেশগুলির নৈতিক কর্তব্য হল দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যান অনুযায়ী একথা নিশ্চিত যে, চরম দারিদ্রের সংজ্ঞা অনুসারে দৈনিক ১.৯০ ডলারের কম উপার্জন করে, গত ত্রিশ বছরে এরকম চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা লক্ষনীয়ভাবে কমেছে। পাশাপাশি একথাও অনস্বীকার্য যে, গত একশ বছরের হিসাব করলে বর্তমান পৃথিবীতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের মাত্রা সর্বাধিক। বিশ্বায়নের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে যেটুকু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়েছে, তার সুফলও সমানভাবে বন্টিত হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেশের সঙ্গে দেশের, পশ্চিমের সঙ্গে অবশিষ্ট বিশ্বের, ধনীর সঙ্গে দরিদ্রের বৈষম্য আরো বেড়েছে। ২০১৭-র জানুয়ারীতে প্রকাশিত অক্সফ্যাম-এর ‘৯৯ শতাংশের অর্থনীতি’ শিরোনামের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ সবচেয়ে দরিদ্র ৩৬০ কোটি মানুষের সমান সম্পদ বিশ্বের ৮ শীর্ষ ধনী ব্যক্তির সম্পদের সমান। ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে ৬২ জন শীর্ষ ধনী ব্যক্তির কাছে বিশ্বের অর্ধেক মানুষের সমপরিমান সম্পদ থাকার কথা বলা হয়েছিল। অক্সফাম-এর পরিসংখ্যান অনুসারে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রতি দশ জনের একজন দৈনিক ২ ডলারের-ও কম উপার্জন করে এবং তাই দিয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।

রাষ্ট্রসংঘের সচিব
রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব

২০১২ সালে রাষ্ট্রসংঘ বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ‘জিরো হাঙ্গার চ্যালেঞ্জ’ নামে একটি কর্মসূচী হাতে নেয়। এর লক্ষ্য ছিল, উদ্বৃত্ত খাবার নষ্ট না করে তা নিরন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসেব অনুসারে, প্রতিবছর উন্নত দেশের ধনীরা যে পরিমান খাদ্য নষ্ট করে (২২২ মিলিয়ন টন), প্রায় সমপরিমান খাদ্য উৎপাদন করে নিন্ম-সাহারার অধিবাসীরা (২৩০ মিলিয়ন টন)। সারা পৃথিবী জুড়ে প্রতিবছর প্রায় ১৩০০ মিলিয়ন টন খাদ্যের অপচয় হচ্ছে। শুধুমাত্র ইউরোপেই যে পরিমান খাদ্যের অপচয় হচ্ছে, তা দিয়ে প্রায় ২০ কোটি মানুষের ভরণপোষণ সম্ভব। ইউএনইপি-র তথ্য অনুযায়ী, উন্নতবিশ্বের দেশগুলির একজন নাগরিক প্রতিদিন যেখানে পানীয় ও গৃহস্থলির কাজে গড়ে ৩৮০ লিটার বিশুদ্ধ জল ব্যবহার করছে, সেখানে নিন্ম-সাহারার দেশগুলিতে নিরাপদ জল ব্যবহার করছে এমন মানুষের সংখ্যা মাত্র ৫১ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন নাগরিকের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য দৈনিক ৫০ লিটার জলের প্রয়োজন। অথচ আফ্রিকার গ্রামীন জনজাতির মানুষদের প্রাপ্তি সেখানে মাথাপিছু ৩০ লিটার, কোনো কোনো দুর্গম অঞ্চলে তার পরিমান ৪ লিটারের-ও কম। 

বিখ্যাত মার্কিন দার্শনিক পিটার উঙ্গার তাঁর ‘লিভিং হাই এবং লেটিং ডাই আওয়ার ইলিউশন অব ইনোসেন্স’ গ্রন্থে বলেছিলেন, উন্নত বিশ্বের মানুষদের নৈতিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য, তৃতীয় বিশ্বের দুর্দশাগ্রস্থ মানুষদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে সাহায্য করা এবং তাদের অকাল মৃত্যু প্রশমন করতে ত্যাগ স্বীকার করা, তাদের নৈতিক দায়িত্ব। পিটার উঙ্গারের এই নৈতিকতার তত্ত্বটির মূল অনুপ্রেরণা ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত দার্শনিক পিটার সিঙ্গারের ‘ফেমিন, অ্যাফ্লুয়েন্স এন্ড মরালিটি’ নামের একটি প্রবন্ধ, যেটি লেখা হয়েছিল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা বিপুল শরনার্থীদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক কর্তব্যকে সামনে রেখে। পিটার সিঙ্গারের মূল বক্তব্য ছিল, কোনো ব্যক্তির পক্ষে যদি তার ধন-সম্পদ দিয়ে দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করার সুযোগ থাকে, উদাহরণ হিসাবে দুর্ভিক্ষের সময় ত্রান সরবরাহের মতো মানবিক কাজ, সেটা পালন না-করা হবে তাদের অনৈতিক কাজ। বাংলাদেশের উদ্বাস্তদের প্রতি কর্তব্য পালনকে সামনে রেখে প্রবন্ধটি লেখা হলেও সিঙ্গারের এই আবেদন ছিল বিশ্বজনীন। 

ঋগবেদের উপাখ্যানে ক্ষুধাকাতর ঋষি বামদেব বলেছিলেন, ‘অভাবের জন্য আমি কুকুরের নাড়িভুঁড়ি রান্না করে খেয়েছি, দেবতারাও আমাকে কোনো সাহায্য দেয়নি’। বিশ্বের ২ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে দাঁড়িয়ে, যে বিপুল পরিমান উদ্বৃত্ত খাদ্য ও পানীয় জলের প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে, তার সামান্য অংশও যদি অভুক্ত মানুষের কাছে সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারে, কিংবা বিশ্বের ধনশালীদের বিপুল সম্পদের ভগ্নাংশ-ও যদি ব্যায় করেন, তবে বহু মানুষ দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বেঁচে যায়। জানা নেই কবে সেদিন ফিরে আসবে, যেদিন তাদের বিবেক দংশন হতে শুরু করবে, এবং নৈতিকতার খাতিরে হলেও দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।https://image.slidesharecdn.com/globalgoals-151008155305-lva1-app6891/95/your-responsibility-as-a-global-citizen-the-global-goals-3-638.jpg?cb=1444320039


এরপর পড়ুন অর্ধ বিধবা
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *