দেবী দুর্গা

প্রথম পর্ব

মহাকাব্যিক ও পৌরাণিক ঐতিহ্যে

দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপই আমাদের কাছে জনপ্রিয়  । কিন্তু মার্কন্ডেয় পুরানে  ৭০০ টি স্তব গাথা হয়েছে দেবী দুর্গার বর্ণনা ও বন্দনা করতে । শুধু আমাদের কাছে কেনো একদম প্রথম শতাব্দি থেকেই তিনি এরুপেই জনপ্রিয়তা পেয়েছেন ! যদিও স্হাপত্য গুলির মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে পার্থক্য দেখা যায় , যেমন দেবীর হাতের সংখ্যা  ৮/১০/১২/১৬/১৮ কখনো দেবী সিংহের উপর অধিষ্ঠিত কখনো সিংহ তার পাশে অবস্থিত ; কোনো জায়গায় মহিষাসুর মানুষ ,কখনো পশু আবার কোথাও অর্ধেক অর্ধেক । কোনো মূর্তিতে দেবী উগ্ররুপিনী আবার কোথাও শান্তরুপিনী মাতৃকা- আসলে বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের যেতে হবে মহাকাব্যিক ও পৌরাণিক কাহিনীর দেবী দুর্গার বর্ণনার স্বরূপ গুলিতে।

রামায়ণ অনুযায়ী উমা হল হিমবাতের কন্যা ও গঙ্গার ভগিনী ।হরিবংশ অনুসারে যদিও সে বিষ্ণু এবং ইন্দ্রের ভগিনী । তৈওেরিয় আরণ্যকের দুর্গা গায়ত্রি-তে প্রথম কিছু দেবীর নাম পাওয়া যায় যারা পরবর্তী কালে শক্তির উপাসানার সাথে যুক্ত হয়েছে – যেমন কাত্যায়নী, কন্যাকুমারী এবং দুর্গা । সুর্যকন্যা ও আগ্নিবর্না দুর্গা বর্ণিত হয়েছে প্রচন্ডশক্তিশালী ও উগ্ররূপে । যজুর্বেদের মৈত্তেরনিয় সংহিতায় আমরা গিরিসূতা গৌরীর উদ্দ্যেশে গায়েত্রী মন্ত্রের উল্লেখ পাই । দুর্গার উগ্র রূপ হিসেবে মুন্ডক উপনিষদে কালি ও করালির নাম পাই যা কিনা সাতটি রূপের দুটি রুপ । পরবর্তী বৈদিক যুগের সাহিত্যে যেমন রয়েছে ভবানি ও ভদ্রকালী তেমনই পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সী-তে কোমারী নামক এক জায়গার নাম পাওয়া যায় যেখানে একজন দেবীর পুজা করা হতো যা কিনা কন্যাকুমারীর সাথে যুক্ত ।

দেবী দুর্গার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা পৌরাণিক ঐতিহ্যের মধ্যেও দেখা যায় – মার্কন্ডেয় পুরাণের দেবী মহত্ময়া অংশে তার ধ্বংস ও মাহাত্মের বর্ণনা রয়েছে । যার বেশীরভাগই দেবী দুর্গা অসুরদের দ্বারা পরাজিত দেবতাদের সাহায্যে সাড়া দিয়ে তাদের রক্ষা করছেন । এরই একটি হল মহিষাসুরমর্দিনী -এই কাহিনির স্হাপত্য নিদর্শনও পাওয়া যাবে মথুরা অঞ্চলের দুর্গামূর্তিগুলীর মধ্যে যেগুলি মোটামুটি খিঃপূঃ ২০০-৩০০খিঃ এর মধ্যে তৈরি।

মহাভারত অনুসারে দুর্গা নারায়ণ ও শিবের পত্নী ; যদিও দুর্গা পরবর্তী কাহিনীতে বিশেষ ভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে শিবের সাথে । শিব হল গিরিষা (পর্বতের দেবতা) এবং দুর্গা হল গিরিজা ; শৈলপুত্রী , উমা , হৈমবতী এবং পরবর্তীতে পার্বতী । শিব হল উমাপতি শক্তিরুপিনী দুর্গা হলেন মহেশ্বরী , ঈশাণী মহাদেবী ,মহাকালী এবং শিবানী । বিভিন্ন নামের মধ্যে দিয়ে বর্ণিত হয়েছে তার চরিত্রের বিভিন্ন দিক যেমন কালি (ধংসাত্মক) , করালি (ভয়ানক) , ভীমা (ভয়াবহ) , চণ্ডী /চণ্ডিকা /চামুণ্ডা (ক্রোধান্বিতা ) , দুর্গার অসুরনিধন এর মধ্যে রয়েছে মহিষাসুর , রক্তবীজ , শম্ভু এবং নিশুম্ভ, চণ্ডা এবং মুন্ডা ।

মহাভারতে যুধিষ্ঠির এবং অর্জুন-কে দুর্গা-স্তোত্র দুটি ভিন্ন পর্বে পাঠ করতে দেখা যায় (ভিরাট পর্ব এবং ভীষ্ম পর্ব) । হরিবংশে বিষ্ণুপর্বে দুর্গার উদ্দ্যেশে যে আর্য স্তব রয়েছে সেখানে দেবীকে-আর্য , নারায়ানি , ত্রিভুবনেশ্বরী , শ্রী , রাত্রি , কাত্যায়নী , কৌশিকি , অপর্না , নাগ-শর্বরী নামে সম্বোধন করা হয়েছে । উল্লেখ্য দেবীর সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে পর্বত (বিশেষত বিন্ধ্য) , নদী , গুহা , অরণ্য , বনানী , এবং পশু (বণ্য ও গৃহপালিত) প্রভৃতির নাম ; একইসাথে শবর , বর্বর , পুলিন্দা্‌র উপজাতিদের মধ্যেও দেবীর আরাধনা এই নাম গুলির মাধ্যম সংযুক্ত হয়েছে । তাঁকে নন্দগোপের কন্যা ও বলদেবের ভগিনী হিসেবেও দেখা যায় । সোমরস , মাংস , এবং বলিদানের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা রীতি যেমন দেখা যায় তেমনই দেবীকে দেখা হয়েছে জগতের রক্ষাকর্তা হিসেবে । কুমারি ও বিবাহিত উভয় নারীর কাছেই তিনি পূজ্য । এভাবেই শক্তি মতবাদের পীঠস্থান পূর্ব ভারত হলেও তা কিন্তু এই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ; জনপ্রিয় যে রূপটিকে আজ আমরা দেবী দুর্গা রুপে আরাধনা করি সেই মহিষাসুর মর্দিনী  দুর্গার একটি প্রাচীন মূর্তি আমরা পাই চিদাম্বরমের বিখ্যাত নটরাজ মন্দিরে ; যেখানে দেবী দুর্গার হাতের সংখ্যা ১৬।

 

Durga with 16 hands

~ অনিমেষ দত্ত বণিক

(চলবে)

 

 

 

 

3 thoughts on “দেবী দুর্গা

  1. পরবর্তী সংখ্যার অপেক্ষায় রইলাম।

     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *