পুরুষ রূপে আবির্ভূত – প্রিয়াঙ্কা বি

পুরুষ রূপে আবির্ভূত

পুরুষ রূপে আবির্ভূত

প্রিয়াঙ্কা বি

লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক যত আলোচনা, লেখালেখি সাহিত্য হাতড়ে পাওয়া যাবে সবই মূলতঃ নারী কেন্দ্রীক। পুরুষ যখন আলোচনার কেন্দ্রে, তখন হয় সে প্রতিষ্ঠিত কোন ব্যক্তিত্ব অথবা, অপরাধী।  ঠিক নয়? বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরুষের অবদান যে হারে ঋণাত্মক গতিতে বেড়ে চলেছে, তাতে মনে হল এবার পুরুষকে নিয়ে বিশ্লেষনের প্রয়োজন আছে।

আদিম আদম আদিম ইভ

এমন একটি বিষয় আলোচনায় রাখবো ঠিক করে, ভাবতে বসেছি কোথা থেকে শুরু করবো। ভাবছি কেননা, শুরু করতে চেয়েছিলাম নারী-বর্জিত কথা দিয়ে। ভারি মুশকিল হল, পুরুষের জন্মই তো নারী-শরীর থেকে। তাই নারীকে বাদ দিয়ে আলোচনা শুরু করতে গেলে লিঙ্গ নিরপেক্ষ আলোচনা দিয়ে শুরু করতে হয়।

যদি শুরু করি মনুষ্য জীবন প্রাপ্তি দিয়ে, তাহলে বেদ শাস্ত্র তথা ভগবত গীতা অনুসারে, আট কোটি চল্লিশ  লক্ষ জীবন ধারণের পর একটি আত্মার মনুষ্য জীবন প্রাপ্তি ঘটে। সেই অর্থে আত্মা অমর, দেহ নশ্বর। সে অনেক তর্কবিতর্ক,  গবেষণার বিষয়, যা হয়ে চলেছে। এ এই শিরনামে অন্তর্ভুক্ত করে আর বিষয়কে বড় করে তুলছি না। তবে প্রাসঙ্গিক কারণে উল্লেখ করব,  পরবর্তী কালে গবেষণায়, পৃথিবীতে আট কোটি চল্লিশ লক্ষ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। অর্থাৎ দ্বাপর যুগ বা তার আগের যে প্রাচীন যুগেই পৃথিবীতে উপস্থিত প্রজাতি নিয়ে গবেষণা হয়ে থাকুক না কেন, তা খুবই উন্নত মানের গবেষণা। আর সেই হিসেবে যিনি এই গবেষণার উপর ভিত্তি করে এমন একটি ধারণা বা তথ্য প্রচলন করেছিলেন, তাঁর বক্তব্য নিশ্চয়ই সন্মানীয়। বুঝতে অসুবিধা হয় না মানুষ-জীবনের গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বা সেই সব জ্ঞানী-গুণীজন এমন বক্তব্য বা গবেষণার প্রকাশ করেছিলেন। এরপর যুগেযুগে মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য – বিধেয় নিয়েও অনেক আলোচনা, সমালোচনা, শাস্ত্র-সাহিত্য, দর্শন লেখা লেখি, গবেষণা হয়ে আসছে।

লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক যত আলোচনা, লেখালেখি সাহিত্য হাতড়ে পাওয়া যাবে সবই মূলতঃ নারী কেন্দ্রীক। পুরুষ যখন আলোচনার কেন্দ্রে, তখন হয় সে প্রতিষ্ঠিত কোন ব্যক্তিত্ব অথবা, অপরাধী।  ঠিক নয়? বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরুষের অবদান যে হারে ঋণাত্মক গতিতে বেড়ে চলেছে, তাতে মনে হল এবার পুরুষকে নিয়ে বিশ্লেষনের প্রয়োজন আছে।

পুরুষের সামাজিক অবস্থান বোঝাতে কি একেবারে আদম-ইভ থেকে শুরু করব? যখন ভাবা হচ্ছে, পৃথিবীতে প্রথম আদমের আবির্ভাব, তারপর এল ইভ – আদমের একাকিত্ম দূর করতে, তারপর এল আপেল, আদমের বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনে। তা ডিম আগে না মুরগী তা নয় বিজ্ঞান ভাববে। আমি ভাবছি ইভের কবে থেকে গৃহিনী হওয়ার প্রয়োজন পড়লো! যখন ইভ ঋতুমতী, যখন ইভ গর্ভবতী? ঠিকই তো, এই সময়গুলোতে ইভ আর স্বাবলম্বী নয়। দৌড়-ঝাঁপ করে শিকার ধরে খাওয়া, গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়া ইভের শারীরিক বল মসৃণ সহযোগিতা করবে না তো! তাহলে বেঁচে থাকার প্রথম শর্ততেই ইভ নির্ভর করতে বাধ্য হল আদমের উপর। ব্যস! এই তো; যতক্ষণ আদম-ইভ পশুপাখির মত বুদ্ধিদীপ্ত ততক্ষণ আদম কিছু সময় এগিয়ে থাকল নিশ্চয়। কিন্তু আদম-ইভ পশুপাখির বুদ্ধি নিয়ে বেঁচে ছিল, তাও তো নাকি ৬০ লক্ষ বছর আগের কথা; এরপর তো সমুদ্রে অনেক নদী এলো গেল, মানুষ হুঁশ পেল – গবেষণা বলে ২ লক্ষ বছর আগে। হরা ভরা পৃথিবীতে মানুষ সভ্যতা আনল তাও তো হাজার ছয় বছরের বেশী হল। মানুষের হুঁশ তো বিবর্তিত হতে হতে পৃথিবী গোলক ছাড়িয়ে মাহাকাশ জয় করে ফেলেছে এখন। কিন্তু আদম-ইভের মাঝের সম্পর্কে কোন বিবর্তন এলো না। ইভ এখনো গৃহিনী, আদম এখনো গাছে গাছে ফলপাকড় পেড়ে আনে।      

আশ্চর্যের বিষয়, পৃথিবী মহাকাশ হয়ে গেল, মানুষে মানুষে সম্পর্ক প্রাচীন গণ্ডী ছেড়ে বেড়োতে পারলো না এক পাও! কেন বলুন তো? ইভ আজও ঋতুমতী, গর্ভবতী তাই? সে তো মানুষ যখন পশুপাখীর মস্তিষ্ক নিয়ে বনেজঙ্গলে ছিল তখনকার সুবিধা-অসুবিধার কথা। তাহলে যে, বিবর্তনের ইতিহাস বলে, মানুষ আজ মস্তিষ্ক বিচারে মানুষ হয়েছে, তবে তার সুবিধা-অসুবিধা পশুপাখীর মত থাকবে কেন? মানুষ মস্তিষ্ক কি, সম্পর্কের গোল কে মহাকাশ করতে পারছে না, না করতে চাইছে না, কোন এক অসাধু সুবিধা পেতে? https://cdn.thinglink.me/api/image/617489047467589634/1240/10/scaletowidth

মানুষের বুদ্ধি যখন পশুপাখীর বুদ্ধি ছেড়ে জীব শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিতে বিবর্তীত হল, তখনই এল ষড়রিপুর তাড়না। শুরু হল সভ্যতা নামক ক্ষমতা ও ভোগের ইতিহাস। জঙ্গল ও জঙ্গলি জীবনে মানুষ লাগাম লাগালো ঠিকই, কিন্তু জীবনের ধমনীতে গোপন স্রোত তৈরী হল ক্ষমতা আর ষড়যন্ত্রের। এ ষড়যন্ত্র প্রথম ব্যবহার করেছিল মানুষ জংলী পশু বশ করে নিজের সুবিধায় লাগাবে বলে। বুদ্ধি যত পাকতে লাগল ষড়যন্ত্র জংলী পশু ছেড়ে একে অপরের উপর ব্যবহৃত হতে লাগল। ক্ষমতা, ষড়যন্ত্রের ইতিহাসে তো পৃথিবী ভারাক্রান্ত। তবে, আসল কথা হল ক্ষমতা ও ষড়যন্ত্র ইতিহাস-ও হল কই, এ যে যুগের সঙ্গে বহুরূপে গতিময়। এ তন্ত্র গোপনে নীরবে গোল পাকিয়ে চলেছে সম্পর্কের গণ্ডীতে। আদম-ইভের পশুপাখীর বুদ্ধি পেকে মানুষ হয়েছে, আর সে পোক্ত বুদ্ধি ভোগের পথ সুগম করেছে ক্ষমতার জাল ছড়িয়ে। ক্ষমতা যার ভোগের প্রাচুর্য্য তার। এবার ফিরে দেখুন সভ্যতার ক্রুর-বৃত্ত। পৃথিবীতে আদমের জন্ম ভোগের জন্য, এই হল আমাদের তন্ত্রের ধারণা।

সভ্য আদম সভ্য ইভ

এবার বরং বিষয় আলোচনাকে গুটিয়ে আরো সীমাবদ্ধ করে বিংশ শতাব্দীর ঘরে ঘরে চলে আসি। শতাব্দীর আদম-ইভরা তো ঘরে ঘরে জন্মাছে, অরণ্যের দিন তো শেষ। বিবেচনা করার বিষয় মানুষ জন্মে ঠিক কখন, কোন পরিবেশে পুরুষ হয়ে উঠছে। কথা প্রসঙ্গে যখনই ‘আদম’ ছেড়ে ‘পুরুষ’-এ এলাম, মনে পড়ল ভারতীয় পুরাণ, মহাসাহিত্যগুলোতে মুণি-ঋষিগণ, মহাজ্ঞানীবৃন্দ, সাহিত্যকরা ‘নারী-পুরুষ’-র ব্যাখ্যা রেখেছেন। শুধু সংসদ বাংলা অভিধান খুঁজলেই ‘পুরুষ’ শব্দের অর্থ পাওয়া যায় ‘নব, মানুষ, পুং জাতীয় প্রাণী, ইশ্বর, পরব্রহ্ম, বংশের এক স্তর, যার দ্বারা আমি তুমি সে এইভাবে ব্যক্তির ভেদ বোঝানো যায়’। আর যদি সাহিত্যের, পুরাণের ভাণ্ডার হাতরাই তাহলে ‘পুরুষ’ মানে ‘বীর, যোদ্ধা’-কে বোঝানো হয়। সময় বিশেষে শব্দগুলোর ব্যাখ্যা বদলে যায়, এ কথা আশা রাখি না উল্লেখ করলেও চলে। যেমন – আমরা জানি ‘মনুসংহিতা’ অনুকরণে যদি ভারতীয় সংবিধান তৈরী হয়, তাহলে সময়পোযুগী করতে সুধীজন ‘মনু’-র সব কথা মেনে নেননি। নিলে হয়তো ভারতীয় সংবিধানে ‘নারী-পুরুষ’ সাম্যের অংশটি অন্তর্ভুক্ত হত না। প্রাচীন সাহিত্য, তত্ত্ব কথা টেনে আনলাম, কেননা ইতিহাস আমাদের পিছু ছাড়েনি কিছুতেই। তাহলে সমস্ত সাহিত্য, দর্শন, অভিধান ঘেটে ঘ করলে দাঁড়ায় যে পুরুষ শুধুই পুং জাতীয় প্রাণী নয়; পুরুষ একটি বিশেষ চরিত্রায়ন, যে চরিত্র মহান, জ্ঞানী, দায়িত্বপরায়ণ, নির্ভীক। শতাব্দী এখন উচ্চ প্রযুক্তির; প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভাণ্ডার উইকিপিডিয়া ‘পুরুষ’-এর মানে যেটুকু নথিভুক্ত করতে পেরেছে, বর্তমান সভ্য আদম সেখানেই এসে থমকে গেছে। উইকিপিডিয়ায় নথীভুক্ত আছে – “পুরুষ বা পুংলিঙ্গ বলতে বোঝানো হয় প্রাণীর সেই লিঙ্গকে যে নিজেদের শরীরে সন্তান ধারণ করে না, বরং স্ত্রীশরীরে যৌন সঙ্গমের দ্বারা শুক্রাণু প্রবেশ করিয়ে সন্তান উত্পাদন করে।” – এই ব্যাখ্যার নেপথ্যে বলা যায়, প্রযুক্তির উন্নতিতে সন্তান ধারনের জন্য এখন স্ত্রীশরীরে যৌন সঙ্গমের দ্বারা শুক্রাণু প্রবেশ করানো একমাত্র উপায় নয়,  শুক্রাণু-ডিম্বাণু গবেষণাগারে মিলন ঘটিয়েই সন্তান উত্পাদন করা যায়। তাহলে কি ‘পুরুষ’ অস্তিত্বে, পরিচয়ে অথবা সংজ্ঞায় সংকট দেখা দিচ্ছে বিজ্ঞানের উন্নতিতে! বোধহয় না। পুরুষ বা নারী শুধুই বিশেষ লিঙ্গ বাহক নয়, সভ্য চেতনা তাই বলে।

যাঁরা ঈশ্বর বিশ্বাসী, মনে করেন সমস্ত বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং ঈশ্বরের অবদানে কোন ভুল হয়না, তাঁরা জানুন আপনি ঠিক জানেন! প্রকৃতি-বস্তুবাদে যাঁরা বিশ্বাসী তাঁরাও জানুন প্রকৃতির অবদানে কোন ভুল নেই; সৃষ্ট বিজ্ঞানে কোন ভুল নেই, ভুল আমাদের ব্যাখ্যায়, ভুল আছে ব্যবহারিক বিজ্ঞানে। প্রকৃতির নিয়মে অনেক বকচ্ছপ প্রাণীও পৃথিবীতে এসেছিল, বিবর্তনের নিয়মে কিছু অবলুপ্ত কিছু আরো উন্নত। মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তনের মাধ্যমে অনবরত উন্নত হয়ে চলেছে কিন্তু আমরা ঈশ্বর বা প্রকৃতির সেই ইঙ্গিত বুঝতে চাইছি না।

আদম নয় পুরুষ

পৃথিবীতে আদমের জন্ম ভোগের জন্য, এ কি তবে ভুল? তবে ব্রহ্মান্ডের এত বৈচিত্র‍্য-রূপ কে ব্যাখ্যা করবে? ভোগই যদি না থাকল! যদি ভোগই বস্তুবাদে সত্য তবে রূপ-বৈচিত্র্য ভোগে দোষ নেই, দোষ লালসায়, দোষ ভোগের বিকৃতিতে। ভারতীয় সমাজে এক সময় প্রথা ছিল মানুষ খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের আগে অন্ন প্রণাম করে নিতেন, তারপর যত্নের সঙ্গে খাবার খেতেন যাতে তা ছড়িয়ে নষ্ট না হয়। অর্থাৎ তিনি ভোগ করছেন প্রয়োজনানুসারে, শ্রদ্ধার সঙ্গে। যতদিন মনে এই ভাব থাকবে ততদিন শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। ততদিন পুরুষাকার শ্রেষ্ঠ থাকবে। নয়তো বীরের দায়িত্ব পালন করতে নারী রণে নামবে। যেমন নেমেছিল দূর্গা, কালি, চন্ডি; তাই না? আমরা তো এই রূপগুলোকেই পূজো করি, নারীর যে রূপ পুরুষ সমান, বধ করছে লালসাকে, চরম ভোগী কে। অভিধান, পুরাণ, মহাসাহিত্যগুলোতে নারীর ব্যাখ্যা যদি কোমল কায়া, গর্ভধারিণীর বাইরে গিয়ে প্রকৃতি হয় তাহলে প্রকৃতির পৌরুষও যে কত বিধ্বংশী, চরম হতে পারে তার জন্য প্রাচীন সাহিত্য ইতিহাস ঘাটার প্রয়োজন হয় না। 

তাহলে পৃথিবীতে আদমের জন্ম ভোগের জন্য এই আদিম ব্যাখ্যা থেকে যুগোপযুগি সভ্য ব্যাখ্যা কি দাঁড়াচ্ছে। মানুষ যখন পুরুষ-নারী নির্বিশেষে দু’জনেই, আর সৃষ্টিও যখন দু’জনকেই সমান চেতনা দিয়ে ক্রমাগত বিবর্তনের মজা রচনা করে চলেছে তখন পার্থিব ভোগের ডালা দুজনকেই স্বসন্মানে ভাগ করে নিতে হবে বৈকি। ভোগ ভাগাভাগির সময় পারস্পরিক বোঝাপড়া কিন্তু সভ্য মানুষ হিসেবে মাথায় রাখাটা বেশ জরুরী, নইলে সেটা আবার বাঘ-হায়নার গল্প হয়ে যাবে। সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছে মানুষের মস্তিষ্ক এমন পর্যায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, আমার মত কাউকে আদম-ইভের ব্যাখ্যা টেনে, উপসংহারে বলতে হচ্ছে, প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে আগে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করা ভালো প্রত্যেকের যে ‘আমি মানুষ, আমি জীব শ্রেষ্ঠ, আমি পশুপাখির মতো করে ভোগ করবো না, আমার ভোগের ইতিহাস হবে মানবিক, সুশৃঙ্খল, শৈল্পিক।’    

পুরুষ তোর মানুষ কোথায়

বিংশ শতক যখন ব্যবহারিক বিজ্ঞান ব্রহ্মান্ডকে মুঠোয় এনে ফেলেছে, প্রযুক্তি ক্রমাগত কষে বাঁধতে চাইছে প্রকৃতিকে, তখন আবার নতুন করে প্রশ্ন উঠছে মানুষের চেতনা নিয়ে; ভোগ, লালসা, ষড়রিপুর তাণ্ডব হাহাকার ফেলে দিয়েছে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে। মানুষ ফিরে গেছে সেই আদিম আদমে। পশুর মত হামলা করছে কোমল কায়াকে। কেন? মস্তিষ্ক তো বিবর্তিত হয়ে ফিরে যায়নি আদিম পৃথিবীতে, তাহলে বিকৃতি কিসে ঘটলো? ভোগের থালা ভাগ করে নিতে কি সমঝোতার অভাব ঘটছে, অসহিষ্ণুতা ঘরের  ভেতর ষড়যন্ত্র করছে, উষ্কে দিচ্ছে ক্ষমতাকে? 

আরও সহজ করে প্রশ্ন করি। আপনার ছেলে যখন হায়নার মত, রাক্ষুসে পিরানহা মাছের মতো ছিঁড়ে-খুঁরে ভোগ করে আসছে একটা কোমল শরীর, আপনি মা এবং বাবা লজ্জিত হচ্ছেন কি, অপরাধবোধে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ছেন কি, নাকি মনে মনে সান্ত্বনা খুঁজচ্ছেন আদিম ধারনাটা থেকে যে, ছেলে আপনার ভোগ করবে বলে জন্মেছে, বলশালী সে। তাহলে জানুন চারিদিকে যদি হৈ হৈ ওঠে আপনার ছেলে ধর্ষক বলে, সেই অভিযোগে আপনিও অলিখিতভাবে অন্তভূর্ক্ত হলেন। আপনার সন্তান ধর্ষক হওয়ার আগে আপনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে তার মনন, গঠনকে ধর্ষণ করেছেন তারপর সমাজে খোলা ষাঁড়ের মত ছেড়ে দিয়েছেন একটি হিংস্র শাপদ, শুধু বোঝেননি ওই শাপদ একদিন জনারন্যে আপনার মুখোশ খুলে দেবে। 

রাগ হচ্ছে? ভাবছেন কি কত বড় অপবাদ দিয়ে দিলাম, আপনি গুরুজন! তাহলে গুরুজন, আবার মনে করে দেখুন তো খবরের কাগজে, ইতিহাসে এখনো কোথাও এমন তথ্য পেয়েছেন কি, যে একজন ধর্ষকের মা-বাবা, পরিবার লজ্জায় আত্মহত্যা করেছে? পড়েননি! উল্টোটা পড়েছেন; একজন ধর্ষিতা, লাঞ্ছিতা লজ্জায়, কলঙ্কের ভয়ে আত্মহত্যা করেছে, কোন ক্ষেত্রে হয়তো তার মা-বাবাও। ভেবেছেন সমাজে কোন তন্ত্র চালু থাকলে অত্যাচারী লজ্জা পায় না, অত্যাচারিত প্রতারিত ব্যাক্তি মানসিক, দৈহিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বলে লজ্জায় আত্মহননের পথ খুঁজে নেয়? সময় এসেছে ভাবার। ‘পাগলা কুত্তা’ যাকে কামড়ায় সে লজ্জায় আত্মহত্যা করে না, ভয়ে চিকিৎসার জন্য ছোটে; পরিবার তাকে সাহায্য করে জলাতঙ্ক বা আর কোন রোগ যাতে তার না হয়। তীক্ষ্ণ নজর রাখে কুকুরটার দিকে, অথবা কুকুরটারও কোন বিশেষ গতি করা হয়। কিন্তু এই একই মানসিকতা ধর্ষক-ধর্ষিতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আমিও সমর্থন করছি, কেন প্রযোজ্য হবে, পাশবীয় ঘটনাটাতো; কিন্তু হল যে মানুষে মানুষে। বুঝতে পারছেন আপনার যত্নে গড়ে তোলা পুরুষটি একটি নরখাদক শাপদ বা পাগলা হিংস্র জন্তুর মত কাজ করেছে। কিন্তু সে বা আপনি লজ্জিত নন। কারণ ভোগ পুরুষের ধর্ম। নারী, শিশু যদি তার খাবার না হতে চায় তবে তাঁদের সাবধানে, সতর্ক হয়ে চলতে হবে। যদি আপনার এই তন্ত্রই সমাজে সত্য হয়, তাহলে চিত্রটা ঠিক এমন হওয়া উচিত। চেনা চিত্র দিয়ে বোঝাই, আপনার ছেলে কলেজে গেছে, পোড়া যুগে আপনার বন্ধু বা প্রতিবেশীর মেয়েও কলেজে যাবে; কিন্তু মেয়েটি আপনার ছেলেকে দেখে কাছ থেকে অভয়ারণ্যের হিংস্র জন্তু দেখার মত সিঁটিয়ে থাকবে, দূরত্ব রাখবে, তাঁর বান্ধবীকেও সাবধান করবে যেন দূরত্ব বজায় রেখে চলে যাতে ছেলে আক্রমণ করার সুযোগ না পায়, কারণ সে যেকোন সময় ধর্ষক হওয়ার পারিবারিক ছাড়পত্র নিয়ে ঘুরছে। http://static4.businessinsider.com/image/5633d74cdd08952d1e8b4601-3025-2269/tag_reuters.com,0000_binary_cbre99i0x5w00-filedimage.jpg  

অবাস্তব কথা দিয়ে পাঠককে আটকে রেখেছি। যাকগে তাহলে নিজেকেই প্রশ্ন করি। আমি মা, আমার মেয়ে সন্তানকে নিত্যদিন শেখাই যে সে মেয়েমানুষ, তাকে রাস্তাঘাটে সচেতন হয়ে চলতে হবে। পোশাক এমন পড়তে হবে যাতে তা … বলুন তো কি? আমি আমার ছেলে কে অলিখিত ছাড়পত্র দিয়ে দিলাম। আমি কিন্তু আমার পুত্র সন্তান কে শেখাইনি যে তাকে সম-অসম, দুর্বল-সবল, অপারগ, বোকা-চালাক সমস্ত মানুষকে সমান সন্মান করতে হবে, সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। আমি আমার ছেলে কে শেখাচ্ছি মেয়েদের মত কাঁদা চলবে না, মেয়েদের মত ভয় পাওয়া চলবে না। নতুন মস্তিষ্কে তথ্য দিয়ে দিলাম মেয়ে মানে কাঁদুনে, ভীতু। এভাবে আরো অনেক তথ্য, মেয়ে মানে দুর্বল, মেয়ে মানে নির্ভরশীল, মেয়ে মানে চরিত্রের সুচিতা, মেয়ে মানে সুশৃঙ্খল, মেয়ে মানে নিয়ম, মেয়ে মানে রাখা-ঢাকা, মেয়ে মানে ঘর-গৃহস্থালি অপর দিকে ছেলে মানে বাঁধন ছাড়া, ছেলে যেমনতেমন, ছেলে মানে সাহসী, দৃঢ়, বলশালী, মজার কথা উনবিংশ শতাব্দীতে ছেলে মানে আবার একটু কিছু নেশার দোষ, আগোছালো, ছন্নছাড়া এসবও ছিল। এই তথ্যগুলো ছোট থেকে সংসারের ভিতর থেকে হারে মজ্জায় চলে মেয়ে নির্বিশেষে দু’জনের কাছেই যাচ্ছে। বড় হওয়া পর্যন্ত মেয়ে কে শিখিয়েই চলেছি ভালো পুরুষ সঙ্গী পেতে হলে সংসারের কি কি কাজ, পুরুষকে সুস্থ-আনন্দে রাখতে কি কি ব্রত-কৌশল শিখতে হবে। ছেলে কে কিন্তু শেখায়নি নারী সঙ্গীর উপযোগী হতে মননের গঠন কেমন হবে, নারী সঙ্গীকে সুস্থ-সবল রাখতে কি কি করতে হবে, শিখিয়েছি শৃঙ্খল তার নয়, কঠিন নিয়ম-ব্রত তার  নয়। এভাবে তালিকা তৈরী করলে ধীরে ধীরে কাপড় কম পড়তে থাকবে লজ্জা আর অপরাধ ঢাকার। তাই তালিকাটি আমার সঙ্গে বাকিরাও এগিয়ে নিয়ে যাবেন অন্ততঃ নিজেকে ফিরে দেখার দায়বদ্ধতা থেকে, এটুকু মানুষ চেতনা আমাদের আছে সে ভরসা রাখা যায় যাঁরা এমন বিশ্লেষনের লেখক এবং পাঠক। http://img2.wikia.nocookie.net/__cb20121108193032/villains/images/c/ce/The_Children_of_Bagul.jpg

আবার তোরা মানুষ হ

আমি বরং দায় নিই আমার সন্তানের, যে সন্তানের শুধু লিঙ্গ আছে, যে সন্তানের শরীরের খিদে বাঁধ মানে না শিশুকে দেখে, নির্বিশেষে যেকোন কায়া দেখে। আমি বরং দায় নিই আমার নিজের মননের কেননা, আমার সন্তান যখন দাঁত নখ ফুটিয়ে আসে কোন জীবনে, নিঃশেষ করে আসে কোন জীবন তখন আমি মরমে মরে যাইনা, প্রায়শ্চিত্য করিনা, দৌঁড়ে যাইনা ক্ষমা চাইতে সেই জীবনের কাছে। বরং কোন শুভ বুদ্ধি যদি আমার এমন লিঙ্গ সর্বস্য হিংস্র সন্তানের বিচার বা শুদ্ধির ব্যবস্থা করে আমার বাৎসল্যও হিংস্র হয়ে ওঠে তাঁকে আড়াল করতে। আমি আমার সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে দোষ ত্রুটি ধরি সেই মরে যাওয়া বা মৃতপ্রায় জীবনটির। হাতড়াতে থাকি সেই মুহুর্তের ত্রুটি-বিচ্যুতি খুঁজতে যে মুহুর্তে জীবনটি আমার বলশালী সন্তানের সামনে এসে গেছিলো। আমি কি একবার খুঁজে দেখবো আমার অন্তরাত্মায়, ওই হিংস্র লালায়িত, রিপু সর্বস্য সন্তানটি যখন আমারই তখন তার শরীরের অপদেবতাটি আমারই শরীরে কোথাও গোপনে বাস করছিল না তো; নাকি মানুষের ভাগ আমার শরীরেই কিছু কম পড়েছিল তাই জন্ম দিলাম একটি হিংস্র প্রাণীর যার শরীর বেশ মানুষের মত দেখতে!!  

 

 

 

One thought on “পুরুষ রূপে আবির্ভূত – প্রিয়াঙ্কা বি

  1. Very true for the present socio-economic infrastructure. We have to rethink about the nature of the mankind from a different prospect.

     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *