প্লাস্টিক জীবন – ( Plastic Life ) – সীমান্ত গুহঠাকুরতা

প্লাস্টিক জীবন

বেকার যুবক যেমন ছেলেবেলায় ঠিকঠাক পড়াশুনা না করার জন্য আফশোস করে, ভাবে – আর একবার সুযোগ পেলে সে নিশ্চয় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত, সেই রকমই কিছু অনর্থক অনুশোচনা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম পথে পথে…। ‘জ্ঞান’ আর ‘তথ্য’ (মানে নলেজ আর ইনফরমেশন), ‘তথ্য আর ‘স্মৃতি’ (মানে ডেটা আর মেমরি), ‘তথ্য’ আর ‘সংরক্ষণ’ (ডেটা আর ব্যাক-আপ) – শব্দগুলো আর প্রয়োগভেদে তাদের অর্থের বদল ভাবাচ্ছিল খুব।

প্লাস্টিক জীবন

~ সীমান্ত গুহঠাকুরতা~

প্রধানমন্ত্রীর নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের মতই দুম করে, একেবারে বিনা নোটিশে সেদিন হঠাৎ ব্যক্তিগত কম্পিউটার-টা অচল হয়ে গেল। নিয়ে ছুটলুম সার্ভিস সেন্টারে। ছোকরা ইঞ্জিনিয়ার অকেজো বাকসোটাকে খানিক নেড়েঘেঁটে জানাল, কিচ্ছু করার নেই, হার্ড ডিস্ক ‘রিপ্লেস’ করতে হবে। এবং কম্পিউটারে থাকা কোনো ‘ডেটা’-ই আর উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

‘সর্বনাশ’ – নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কাছেই প্রায় আর্তনাদের মত শোনাল। ওখানে যে আমার যাবতীয় পাণ্ডুলিপি, সারা জীবনের তোলা সমস্ত ছবি, বিয়ের ভিডিও, সন্তানের জন্ম থেকে এই দেড় বছর পর্যন্ত বাড়বৃদ্ধির যাবতীয় স্থিরচিত্র এবং অফিসের অনেক জরুরি নথিপত্র…। ইঞ্জিনিয়ার মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বললেন, ‘ব্যাক আপ রাখেন না কেন ফাইলগুলোর?’

স্মৃতিলুপ্ত এক যন্ত্রগণকের মস্তিষ্ক বদলের বরাত দিয়ে খালি হাতে বেরিয়ে এলুম সার্ভিস সেন্টার থেকে। নিজেকেও কেমন লুপ্তস্মৃতি এক মানুষের মত লাগছিল। পুরনো দিনের সিনেমায় যেমনটা হামেশাই দেখা যেত। তফাৎ শুধু এই যে, পুনরায় কোনো আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনাতে আমার এ হারানো স্মৃতি ফেরত আসার নয়। যা গেছে, তা চিরতরেই গেছে। তবু, ইঞ্জিনিয়ারের শেষ তিরস্কারটুকু আফশোসের মত ঘুরে ঘুরে বাজছিল মনের ভিতর। কেন ব্যাক আপ রাখিনি ফাইলগুলোর? সত্যিই কি সম্ভব ছিল স্মৃতির সেই বিপুল ভাণ্ডারের বিকল্প সঞ্চয়? কটা ডিভিডি, পেন ড্রাইভ লাগত তার জন্য? নাকি এভাবে প্রতিনিয়ত জমতে থাকা তথ্যের নিয়মিত ব্যাক-আপ তৈরি করে যাওয়া আদৌ সম্ভব? শুনেছি আজকাল গুগলের মত কয়েকটি সংস্থা আর্ন্তজালেও এই জাতীয় তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখে। প্রযুক্তি-ভীত এক মানুষ আমি। নিজেকে এইসব নিত্যনতুন ব্যবস্থার সঙ্গে ‘আপডেট’ করা সম্ভব হয় না। কাজ চালনোর মত বিদ্যে দিয়ে প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে এসেছি এতদিন। বেকার যুবক যেমন ছেলেবেলায় ঠিকঠাক পড়াশুনা না করার জন্য আফশোস করে, ভাবে – আর একবার সুযোগ পেলে সে নিশ্চয় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত, সেই রকমই কিছু অনর্থক অনুশোচনা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম পথে পথে…। ‘জ্ঞান’ আর ‘তথ্য’ (মানে নলেজ আর ইনফরমেশন), ‘তথ্য আর ‘স্মৃতি’ (মানে ডেটা আর মেমরি), ‘তথ্য’ আর ‘সংরক্ষণ’ (ডেটা আর ব্যাক-আপ) – শব্দগুলো আর প্রয়োগভেদে তাদের অর্থের বদল ভাবাচ্ছিল খুব।

যেমন অনেকদিন হল, ফটোগ্রাফ আমাদের কাছে স্মৃতির সমার্থক হয়ে গেছে। ‘ফটোগ্রাফিক মেমরি’ কথাটা প্রশংসার্থেই ব্যবহৃত হয়। এই রকম স্মৃতিধর মানুষদের কাছে অতীত কোনো কল্পনার অবকাশ রাখে না। যেমন রাখে না বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সঞ্চিত ফটোগ্রাফগুলো। চিরকাল তা ঝকঝকে, যেন এই-তো-খানিক-আগে-তোলা। একটা সময় পর্যন্ত ছবি তুলে তার প্রিন্ট নিয়ে অ্যালবাম বানিয়ে রাখার রেওয়াজ ছিল। কোনো কোনো শীতের দুপুরে ট্রাঙ্কবন্দী সেই অ্যালবাম খুলে রোদে পিঠ দিয়ে বসে পাতা উলটে উলটে দেখা হত সেইসব ছবি। তার কিছু সাদাকালো, কিছু বা রঙিন। কিছু ঝাপসা, পোকায় খাওয়া, বিবর্ণ। কিছু বা অনেকাংশে উজ্জ্বল। হৃদয়ে সঞ্চিত স্মৃতির মতই চরিত্র তাদের। সাল-তারিখ মনে পড়ে না, অনেক চরিত্র আর ঘটনাই ফিকে হয়ে এসেছে। ‘ওটা কে? মেজমাইমা না? ওর পিছনে দাঁড়ানো লোকটা কে বলো তো? চেনা চেনা লাগছে খুব…’। অ্যালবাম অবশ্য এখনো হয়। বিয়ের বা ওই জাতীয় কোনো অনুষ্ঠানের দিন নিযুক্ত পেশাদার ফটোগ্রাফার প্রচুর জাঁকজমক-অলঙ্করণ সহ ডিজিট্যাল ফটোগ্রাফির এবং ফটোশপের দক্ষতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এক রকমের দেখন-সর্বস্ব অ্যালবাম তৈরি করে দেয়। এবং সঙ্গে দেয় ডিজিট্যাল ব্যাক-আপ সহ একটি সিডি। স্মৃতি অতএব ডিজিট্যাল হইল। এবার তাকে যতগুলি খুশি কৃত্রিম মগজে যতবার খুশি সংরক্ষণ এবং পুনঃ-সংরক্ষণ করা সম্ভব। 

একইভাবে ‘জ্ঞান’-ও এখন শুষ্ক ‘তথ্য’ মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। নাহলে শিক্ষকতার চাকরি  পেতে যে পরীক্ষা, তার যোগ্যতা বিচারের মাপকাঠি হয় পঞ্চাশটা মাত্র ‘মাল্টিপল চয়েস’!! সম্প্রতি মাধ্যমিক আর উচ্চ-মাধ্যমিকের সিলেবাসেও সেই একই প্যাটার্ন চলে এসেছে। অর্থাৎ এখন থেকে আর বিচার-বিশ্লেষণের কোনো অবকাশ নেই, কল্পনার পাখা মেলার মত আকাশ নেই। মগজ এখন যেন এক-একটা ষোলো অথবা বত্রিশ জিবি মেমরি কার্ড – এক-একটা সিলেবাসের ‘ডেটা’ (অথবা ‘তথ্য’ অথবা নিছক ‘ইনফরমেশন’) সেখানে ‘স্টোর’ করো, পরীক্ষার হলে নিদির্ষ্ট ‘সার্চ অপশন’ দিয়ে প্রয়োজনমত সেগুলো বার করে এনে খাতায় উগড়ে দাও আর পরীক্ষান্তে সব তথ্য যত দ্রুত সম্ভব ‘ইরেজ’ করে নতুন তথ্য ভরার জন্য তাকে প্রস্তুত করে ফেলো। মানুষ একদিন কম্পিউটার বানিয়েছিল। আজ সেই কম্পিউটারই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মত গিলে ফেলেতে চাইছে মানুষের স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যতকে। মানুষের মস্তিষ্ক তাই এখন কম্পিউটারের প্রতিরূপ হতে পেরে গর্বিত।

অতএব স্বাগত নতুন যুগ। জ্ঞান এখন অর্জিত হবে বা, শুধু আহৃত হবে, সঞ্জিত হবে এবং অচিরেই অপ্রয়োজনীয় আবর্জনায় পরিণত হবে। স্মৃতি এখন আর কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের মত মায়াময় হবে না। কবিকেও আর ‘কথা কও কথা কও অনাদি অতীত’ বলে প্রার্থনা জানাতে হবে না মহাকালের কাছে। মহাকাল এখন মুঠো-বন্দী — ডিজিটালি রেস্টরোর্ড, কালার্ড এবং এইচ ডি কোয়ালিটি। অবিকল ‘মুঘল-এ-আজম’-এর মত। ঠিক যেমন ছাত্রছাত্রীরা আর কোনোদিন পরীক্ষার খাতায় ‘একটি ছেঁড়া টাকার আত্মকথা’ লিখবে না। টাকা তো এখন বায়বীয় বস্তু। আন্তর্জালের মাধ্যমে এক ডিজিটাল ওয়ালেট আরেক ডিজিটাল ওয়ালেটে নিঃশব্দে স্থানান্তরিত হয় সে। সবজি-বাজারের সরগরম দরাদরি বুঝি নীরব হল চিরকালের জন্য। অর্থ মৃত, অর্থনীতি দীর্ঘজীবি হোক।

বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমার জন্য যাচ্ছিলাম গাড়োয়াল হিমালয়ের আউলিতে। পাহাড়ি পথে টানা আটঘন্টার সফর সইতে না পেরে নব-বিবাহিতা স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে নিয়ে নেমে পড়তে হল ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ চামোলীতে। ছোট্ট একটা হোটেলে এক রাতের আশ্রয় নিতে হল। সেদিন স্ত্রী খানিক সুস্থ হবার পর দুজনে খানিক হাঁটতে বেরুলাম। একেবারেই অজানা অচেনা পাহাড়ি পথ ধরে চলতে চলতে পৌঁছলাম একটা পাথরে বাঁধানো নদীঘাটে। সামনে ঝরঝর শব্দে বয়ে চলেছে খরস্রোতা অলকানন্দা । দূরে বরফ ঢাকা পাহাড়ের চূড়োয় অস্তায়মান সূর্য। চারপাশে ঘন অরণ্য। জনমানব-শূন্য সেই পরিমণ্ডলে দুজনে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলুম অনেকক্ষণ। কথা ছিল না দুজনের মুখেই। হাতে হাত ধরা ছিল কি? মনে পড়ে না। এবং কী ভাগ্যিস, সদ্য কেনা ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরাটা সেদিন হোটেলের ঘরেই ফেলে রেখে বেরিয়ে এসেছিলাম।

স্মার্টফোন হোক বা এসএলআর – ক্যামেরা ছাড়াও যে সৌন্দর্যকে উপভোগ করা যায়, কোনো অনুষঙ্গ ছাড়াও যে স্মৃতিকে ধরে রাখা যায়, আনন্দের যে কোনো পার্থিব সংরক্ষণ হয় না এবং জ্ঞান ব্যাপারটা যে মূলত বিমূর্ত – তা বুঝতে তবে কি আমাদের আর একবার ‘শূন্য’ থেকে শুরু করতে হবে? শুনেছি কম্পিউটারও নাকি শূন্য আর এক ছাড়া কোনো ‘ডিজিট’ চেনে না। আর শূন্যের আবিষ্কারও নাকি প্রযুক্তির পীঠস্থান চীন বা অবাধ বাণিজ্যের লীলাভূমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নয়, ভারতবর্ষেই? ভারত তো ‘দর্শন’-এর দেশ। আর ‘দর্শন’ মানে তো কল্পনা, চিন্তার বিস্তার, ভাবনার নিত্য-নতুন দিগন্তের উন্মোচন। পর্যাপ্ত দার্শনিক প্রজ্ঞা ছাড়া বিজ্ঞানও যে অচল, তা তো আমরা ভুলে বসেছি কবেই।

পান্নাকে সবুজ আর চুনিকে লাল করে তুলতে আমার ‘চেতনার রঙ’ বুঝি আর প্রয়োজন হবে না কোনোদিনই? এই ‘ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গণিততত্ত্ব’ লইয়া তবে আমি কী করিব?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *