বসন্ত উৎসব ফিরে দেখা শৈশব – প্রিয়াঙ্কা বি

বসন্ত উৎসব ফিরে দেখা শৈশব

বসন্ত উৎসব ফিরে দেখা শৈশব

প্রিয়াঙ্কা বি

আর যারা জানেনইনি কখনো যে ভারতীয় উৎসবগুলো ভারতবর্ষের সংস্কৃতির মেরুদন্ড, যারা জানেনইনি কখনো যে ভারতবর্ষের উৎসবগুলো ভারতবর্ষের ঐক্যতানের মূল রসায়ন, তাদের ইশ্বর(মনে মনে বলুন রাক্ষস) সহায় হন।

১৬ই ফাল্গুন, ১৪২৪। ইশ্‌! রামমোহন-এর কোন রচনা আরম্ভ হল মনে হচ্ছে, না! বেশ! তাহলে চেনা ভাষায় শুরু করি। ২০১৮ সাল ১লা মার্চ, বাংরেজী যুগের সেলুলয়েড বসন্ত উৎসব। একটি শিশু এক বালতি জল বেলুন বানিয়ে সবাইকে ডেকে যাচ্ছে, ‘ও দিদি! বাইরে এস না একটু রং খেলি!’ তার চারপাশে কেউ নেই। ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে মাঝে মাঝে নিজের মনে নিজের গায়ে, গালে দু’হাত বুলিয়ে রং মাখছে। বেলুন গুলো কারো গায়ে ছোটা ছুটি করে ছুড়ে ফাটাবে, সে আশা ছাড়েনি। মা বাবা অফিস গেছে, তাঁদের বসন্ত মনের কোন ছেড়ে বিগত অথবা তাঁদের বসন্তে আর আবীরের রং নেই। শৈশব যে বড় বালাই, বসন্তের আবীর রং তার মনকে স্থির থাকতে দেবে কেন? প্রকৃতিও তো যুগের তাড়না বোঝে কই; অশোক, পলাশ, আমের মঞ্জরী দিয়ে বেহায়াপনা সেজেগুজে গা ভড়তি ফাগুণ নিয়ে হাজির। বসন্ত বাতাস কান পেতে আছে, – কোকিলের কুহু আওয়াজের মাঝখানে মাঝখানে, শিশুটির খিল খিল হাসিও বাতাসে ঢেউ তুলুক। কেউ কোথাও নেই যে শিশুটিকে জাপটে ধরে আদর করে আবীর-রং মাখিয়ে দেবে। এইটুকু তো আবদার শিশুটির আর তার চারপাশের বসন্ত বাতাসের। সময়ের পর সময় গেল, বাধা নিয়মে শিশুর এবার দৈনন্দিন জীবনগতে ফেরার পালা। জল বেলুনগুলো সে একবুক ভারী নিশ্বাসের সঙ্গে টিপ করে ছুড়ে মারল রাস্তার ম্যানহোলে। কোন প্রত্যুতর পেলোনা ঠিকই, কিন্তু টিপটা সে এগিয়ে এসে করায় বেড়ে হয়েছে। এটুকুই তার সান্তনা। বিড়বিড় করে কিছু বলল সে, মন খারাপ হয়ে গেল বোধহয় কোকিল-টিরও যার গায়ে বসন্ত মেখেছিল। চারিদিক নিস্তব্ধ, শিশুটি শুধু বিড়বিড় করে কিছু বলছে আর একটি করে জল ভরা বেলুন প্রবল আক্রোশে ম্যানহোল লক্ষ্য করে ছুড়ে যাচ্ছে। বেশ অনেকটা সময় লাগলো বেলুন গুলো ফাটাতে, অনেকগুলো বেলুন ছিল যে তার বালতিতে। বোধহয় সকালে মা বা বাবা তার বালতি ভরতি করে দিয়ে গেছে অফিস বেরোনোর আগে। শিশু ভেবেছিল, আজ একাই মজা করে বাবা-মাকে উচিত জবাব দেবে। হায়রে নিষ্ঠুর সময়, শিশুকেও গিলতে ছাড়লি না। শিশুটির একটি শৈশব যে এই বসন্তেই হারিয়ে গেল, নিঃশব্দ অভিজ্ঞতায়। কে জানে তার মনে কোন আক্রোশ ইনিয়ে বিনিয়ে জায়গা করে নিল শৈশবের নির্মলতা-টুকুকে একটু সরিয়ে। আর এমনো তো নয় যে এ বসন্তের তিক্ততা সরিয়ে দেবে আর কোন নির্মল বসন্ত। বরং যুগের দাবী দখল নেবে হাজার প্রখর কুটিল রূপে, শিশুর স্বভাবগত সরলতা বুঝিবা এ যুগের পছন্দ হল না। তাহলে আর কি, প্রস্তুত হও ভবিষ্যত – এই শিশু খুব শীঘ্রই আসছে কুটিলতা, জটিলতা নিয়ে।

ছবিঃ তুহিনা পাল
ছবিঃ তুহিনা পাল                                                                                                                                                                                             মডেলঃ মৌলী

তবে বসন্ত এখনো আশা ছাড়েনি। অশোক ফুলের হাওয়া হালকা আদলে মাখিয়ে দিল শিশুটির গায়ে। তাতেই তার শৈশব শেষ বারের মত ফিরে এল। শিশুটি এবার বালতি মাথায় দিয়ে চোখ মুখ ঢেকে হাটা লাগালো অন্দরের দিকে। বসন্তের পালা এবারের মত শেষ তার।

ছবিঃ শুভঙ্কর দাস

আমি ছিলাম দূরের উঁচু বারান্দায়। একটি শিশুর একটি বসন্ত বিদায় দেখছিলাম। এ ‘অমল ও দইওয়ালা’ – র গল্পে আমি সেই হতভাগ্য দইওয়ালা, যার কিছু করার নেই অমলের অসহায়তা নিয়ে, শুধু নিজের শৈশব ভাগ করে নেওয়া ছাড়া। শিশুটি টলটল করতে করতে বালতি মাথায় অন্দরে গেলে আমি ভাবতে বসলাম আমার শৈশব নিয়ে। আমার মনে পড়ে, ওর মত বয়সে আমার মা-বাবা, পাড়া প্রতিবেশী সবাই বসন্ত উৎসবের আগের দিন নেড়াপোড়া করতো, সামনের কোন সবুজ মাঠে। এই নেড়াপোড়া বা বুড়িরঘর পোড়ানো প্রথার আসল কারণ আজও সঠিক জানা নেই। শুধু এটুকু দেখেছি বেশ কিছু আবর্জনা, শীতের পাতা ঝরা, বসন্তের আগমনীতে পুড়িয়ে ফেলে যেন স্বাগত জানানো হয় রঙিন, আনন্দের বাতাসকে। পাতাঝরা, খড়কুটো পোড়ানোর সঙ্গে কিছু আলুও পোড়ানো হত। ব্যাপারটা এমন, আনন্দের আগুনে বাঙালির পেট কেন খালি যাবে! আবর্জনা পোড়ানোর ধকলও তো নেহাত কম নয়।    

বাকি রাতটুকু শুধু অপেক্ষা, কখন সকাল হবে। বড়রা কিছু ফেলে দেবে এমন কাপড় চোপড়ে, কখনো কিছু মজার সাজে সেজেগুজে গলায় ঢোল ঝুলিয়ে হইহই করতে করতে দোলের দিন সকালে ছোটদের সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পড়তো পাড়া পরিক্রমায়। জল মিষ্টি ছিল আবিরের সঙ্গী। এই দলে কোন রাধা-কৃষ্ণর জুটি থাকতো কিনা সে বয়সে বোঝার ক্ষমতা ছিলনা। শৈশবে নির্মল আনন্দ থেকে যে বঞ্চিত হইনি এটাই সে সব বসন্তের কৃপা। তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ কুড়ি-পঁচিশ বছর পর সে সব শৈশব পর্যালোচনা করে স্পষ্টই বোঝা যায় যে তখন পাড়ায় পাড়ায় প্রতিবেশী প্রতিবেশীতে সেই সদ্ভাবটুকু ছিল বলেই অমন দল বেঁধে বসন্ত উৎসব পালন করতে বেড়োতে পারতো। ঘোর কলি আসতে তখন হয়তো ঢেড় দেরী ছিল; তাই কোন শিশুকে গলা শুকিয়ে ডাকতে হতোনা, ‘ও দিদি! নেমে এস না, একটু রং খেলি।’ আর দিদিরাও তখন মনে এত দ্বিধা রাখত না যে প্রতিবেশী শিশুটির ডাকে সাড়া দেওয়াটা উচিত হবে কিনা। অনেকদিন পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় আবীর পড়ে থাকবে, হাতে গালে রং লেগে থাকবে, এটাই ছিল বসন্ত উৎসব। বিংশ শতাব্দী ভদ্রতার পরাকাষ্ঠা; অনুরোধের আসরে কেউ সাড়া দিলে তবে তার কপালে এক চিমটে আবির লাগানো যাবে, যা ঝেড়ে ফেললে কোন স্মৃতি দাগ রেখে যাবে না। কারণ এ স্মৃতি অপেশাদারির লক্ষণ, এমন স্মৃতিভার পেশাদারি জায়গায় বয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। পেশা যে আমাদের কখন পিশে দিচ্ছে নিজেরাও আর খেয়াল রাখতে পারিনা। আমরা পিঁপড়ের মত সার বেঁধে কোন অজানা অমৃতের সন্ধানে চলেছি, যে অমৃতের স্বাদ শুধু সারির প্রথম কয়েকজন পিঁপড়েই পেয়েছে, বাকিরা চোখ বন্ধ করে অনুসরণ করে চলেছে। পেছন থেকে, মাঝখান থেকে কোন বড় পিঁপড়ে, ক্ষমতাশালী পিঁপড়ে যদি কোন একটি দু’টি পিঁপড়েকে সাবাড় করে দেয় তার পিছনের পিঁপড়েরা সামান্য পাশ কাটিয়ে আবার মূল সারিতে যোগ দেয়, লাইন ছাড়ার প্রশ্ন নেই। ওই লাইনের বাইরে আর কোন রাস্তা তাঁদের জানাও নেই। মানুষও কি তবে আর সব নিকৃষ্ট প্রাণী থেকে উর্দ্ধে উঠতে পারেনি!      

আমার মনে পরে গেল স্কুল-কলেজ জীবনের কথাও। মাত্র দশ-বারো বছর আগের কথা। যখন চুটিয়ে মেয়েবেলা, ছেলেবেলা উপভোগ করেছি আমরা। বসন্ত উৎসবে একইরকম মনে কোন দ্বিধা না রেখে দলকে বল করে পাড়া পরিক্রমায় বেড়িয়ে গেছি। হ্যাঁ! কলির হাওয়া লাগতে শুরু করেছিল মানতে হবে, তাই বিভিন্ন দল ছিল, কিন্তু বসন্তের ঝাঁপি তাতে অপূর্ণ থাকেনি। বসন্ত ভরা আনন্দে বিদায় নিয়েছে। তাইতো স্মৃতি এত বসন্ত পেরিয়েও এত উজ্জ্বল। তবে এতগুলো বসন্তের পর এই বসন্তে ব্র্যান্ডেড আবীর কিনলাম। যুগের হাওয়া এত দিনে কানের কাছে গান শুনিয়ে দিয়েছে ‘ত্বকের যত্ন নিন’। আর এই যত্ন নেওয়া যত না যাতনার তার চেয়েও বেশি ধরনধারণের, বাংরেজিতে বললে ফ্যাশনের। সেই ফ্যাশনে বসন্তই অস্ত গেল। কেউ আর গালে রং তোলে না। আর অবিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতাতো নিজেরাই যত্ন নিয়ে তৈরী করছি। তাই গাল বাড়িয়ে রং নিতে গিয়ে ভাবি, যা মাখাচ্ছে সে আবীর, আবীর নয়, ত্বক-ঘাতক কিছু  নিশ্চয়। তার পরেও কি গাল বাড়িয়ে এই বিংশ শতাব্দীর উন্নাসিক যুগে আবীর মাখছি না? মাখছি, নিজেই নিজের গালে দু’আঙ্গুল দিয়ে তুলির টান দিচ্ছি; ‘সেলিফিশ’ ভগ্নাংশ ‘সেলফি’-র জন্য। এ মহা-ভারতের সব প্রথা উৎসব, গাঁথা এখন ঐ ‘সেলফিশ’ ভগ্নাংশে বন্দী। সামাজিক অন্তর্জাল – কঠিন হয়ে গেল, মানে সোসাল নেটয়ার্ক-এর স্টেটাস-এ স্বর্ণাক্ষরে গাথা থাকে উৎসব পালনের অভিজ্ঞতা, কিছুটা রং চড়িয়ে, অনেকটা প্লাস্টিক জড়িয়ে। তবে তাতে আমরা মোটেই দুঃখিত নই। কারণ আমাদের সুখ এখন হাতের মুঠোয় – পাঁচ ইঞ্চি থেকে বড় জোর আট ইঞ্চি লম্বা-চওড়া অ্যলুমিনিয়াম, সিলিকন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক গঠনে। বুঝলেন না? আপনার হাতের মোবাইল ফোনের কথা বলছি। আত্মীয়-স্বজন-সংসার ছেড়ে কাটিয়ে দেবেন দিনের পর দিন। মোবাইল ফোনটি ছাড়া ক’দিন থাকতে পারবেন, বুকে হাত দিয়ে ভাবুন। যাকগে সে প্রসঙ্গ।

ছবিঃ শুভঙ্কর দাস

ফিরে আসি সেই শিশুর কথায়। যে আজ হারালো বাংলা তথা উত্তরভারতের একটি অন্যতম উৎসবের আনন্দ। যে সব উৎসব ভারতের ঐতিহ্য, যার আকর্ষণে দেশ-বিদেশের লোক ছুটে আসে, যে সব উৎসব ভারতবর্ষের মেরুদন্ড। তাকে কি তার পরিবার ফেরত দিতে পারবে আজকের বসন্ত উৎসব? অবশ্য ফেরত দিতে চায় কি? আমরা জানি কি যে, এই সমস্ত উৎসবই তাঁদের ভারতবাসী করে তুলবে, ভারতীয় সংস্কৃতির মানুষ করে তুলবে? জানি কি এই সংস্কৃতির বাইরে যে সংস্কৃতি উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে দুয়ার সাজিয়ে বসে আছে তা পাশ্চাত্য সংস্কৃতি? আর যদি জানি যে আমার শিশু পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে, এটাই আমার চাহিদা, তাহলে তাকে সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য মহলে সরিয়ে নেওয়াটাই আমার মতে বুদ্ধিমত্তার কাজ। নয়তো সে বকচ্ছপ প্রাণী তৈরী হতে পারে, তার সম্ভাবনা শতকরা ৮০ ভাগ, আর তখন তাকে দেখে আমরা বলব ‘বাছা আমার উচ্ছনে গেল’, সে সম্ভাবনা শতকরা ১০০ ভাগ। আর যারা জানেনইনি কখনো যে ভারতীয় উৎসবগুলো ভারতবর্ষের সংস্কৃতির মেরুদন্ড, যারা জানেনইনি কখনো যে ভারতবর্ষের উৎসবগুলো ভারতবর্ষের ঐক্যতানের মূল রসায়ন, তাদের ইশ্বর(মনে মনে বলুন রাক্ষস) সহায় হন। হয়তো এই অজ্ঞ মানুষরা সংখ্যায় আমরা এত বেশী যে, যে দেশের মহিমা একদিন স্বামী বিবেকানন্দ বুক ফুলিয়ে পৃথিবীর দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই মহিমা দেশের আমরা আর ধরে রাখতে পারিনি। ভারতবর্ষে যে ক্ষয় ধরেছে তাকি আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি না? পারছি নিশ্চয়। এত দিক থেকে বিপুল ক্ষয় আরম্ভ হয়েছে যে, আমরা মূল কারণটাই আর খুঁজে পাচ্ছি না। আর এখনো পর্যন্ত যে ভারতবাসীর চোখে ক্ষয়টুকুই চোখে পড়েনি তিনি বরং অপেক্ষা করুন যেদিন আবার ভারতের সংবিধান আর কোন রাষ্ট্রের দ্বারা পরিচালিত হবে।        

 

 

One thought on “বসন্ত উৎসব ফিরে দেখা শৈশব – প্রিয়াঙ্কা বি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *