ভোজবাজির রূপকথা – শ্রাবণ বোস

ভোজবাজির রূপকথা

একমাসের মধ্যে, একটা লোক পুরো শহর টাকে নিজের মায়াজালে জড়িয়ে নিলো। একটা প্রজন্ম আটকে গেল, সেই মায়াজালে। খবরের কাগজ কেটে স্কুলের খাতা ভরছে জাদুকরের বিভিন্ন রূপে। খেলা ম্যাগাজিনে জীবনের রূপকথার  গল্প, এঁদো গলির ঘিঞ্জি পরিবেশের সাথে মিলে যাওয়া কৈশোরের মনে সাফল্যের স্বপ্ন বোনা শুরু করে দিয়েছে। স্বপ্নের  ফেরিওয়ালা অকাতরে  বিক্রি করছে জেদ, বেপরোয়া, রঙিন বোহেমিয়ান জীবনের নেশাকে।

ভোজবাজির রূপকথা

শ্রাবণ বোস

 

   একটা অদ্ভুত শূন্যতা। নাহ্, আমার রোজকার জীবনে কোনো রকম পরিবর্তন আসবে না। এই বছর তো শুধু চলে যাবার বছর। আশে পাশে বেশ কিছু কাছের মানুষকে হারিয়েছি, চোখের জল ও ফেলেছি, কিন্তু এই রকম ফাঁকা ফাঁকা লেগেছে বলে মনে হয় না। এই রকম বোকা বোকা ইমোশনাল হবার কোনো কারণ আছে কি?

সেই কত বছর আগের কথা। ১৯৮৬।  ঠিক বিশ্বকাপের আগে। টেনে টুনে চলা সংসারে, বাবা কি ভাবে মাকে পটিয়ে , ব্যাঙ্কের শেষ টাকা দিয়ে টিভি কিনে এনেছিল, সেটা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। বাংলাদেশ সরকারি চ্যানেলে আটটা ম্যাচ মাত্র দেখাবে আর দূরদর্শন মাত্র চারটে। মাত্র ওই কটা ম্যাচের জন্যে এই রকম পাগলামো! বাড়িতে নতুন টিভি আসছে, চিত্রহার, চিত্রমালা, শনি – রবির সিনেমা দেখতে যাবার জন্য আর পাড়ার বাপ্পাদা’ দের বাড়ি যেতে হবে না – আমার আর দিদির আনন্দ আর দেখে কে!

হটাৎ করে খুশির খবর। দূরদর্শনে পুরো বিশ্বকাপ দেখা যাবে। বাবাকে ওই রকম খুশি হতে জীবনে আর কোনদিন দেখি নি। বাবার সাথে রাত জেগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঠে ইন্ডিয়ার খেলার কমেন্ট্রি শুনেছি এর আগে, কিন্তু রাত জেগে বিশ্বকাপ! শৈশব পার করে কৈশোরে পা দেওয়া জীবনে রোমাঞ্চ কে ছুঁয়ে দেখার প্রথম অনুভূতি। গরমকালে ফুটবল আর শীতকালে ক্রিকেট খেলে বড় হওয়া বাঙালি কৈশোরে , একজন জাদুকর এসে তাঁর ভোজবাজি তে সব কিছু কি রকম উলোট পালোট করে দিল।

খেলা নিয়ে কোনো হেলদোল না থাকা রান্নাঘরেও একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এক ঝাঁকা কোকড়ানো চুলের বেঁটে খাটো গাট্টা গোট্টা একটা জাদুকর, আমার মা কেও আমার আর বাবার সাথে রাত জাগতে বাধ্য করছে। শুধুমাত্র যেদিন জাদুকর মাঠে নামে, সেদিন মায়ের মতন সাড়া পাড়া রাত জাগে। অচেনা, অজানা এক বিদেশি কলকাতার সাধারণ জীবনের সাথে মিলে মিশে গেল।

নিজের দেশ কে ছাড়াও অন্য একটা দেশ কে এই রকম ভাবে সাপোর্ট করা যায়  না কি? একমাসের মধ্যে, একটা লোক পুরো শহর টাকে নিজের মায়াজালে জড়িয়ে নিলো। একটা প্রজন্ম আটকে গেল, সেই মায়াজালে। খবরের কাগজ কেটে স্কুলের খাতা ভরছে জাদুকরের বিভিন্ন রূপে। খেলা ম্যাগাজিনে জীবনের রূপকথার  গল্প, এঁদো গলির ঘিঞ্জি পরিবেশের সাথে মিলে যাওয়া কৈশোরের মনে সাফল্যের স্বপ্ন বোনা শুরু করে দিয়েছে। স্বপ্নের  ফেরিওয়ালা অকাতরে  বিক্রি করছে জেদ, বেপরোয়া, রঙিন বোহেমিয়ান জীবনের নেশাকে। দু পায়ের ফুটবল খেলাকে হেলায় এক পায়ে শাসন করার রাজকীয় ঔদ্ধত্য , লাগামহীন নেশার সাথে সহবাস আর সাথে রবিনহুড ইমেজ – সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে যাওয়া প্রথম ভালোবাসার কোলাজ । রক্তে মাংসে গড়া একটা মানুষের কাছে নিজের ভালোবাসাকে সঁপে দেওয়ার প্রথম অনুভূতি।

প্রথম ভালোবাসার মানুষ চলে গেলে এই শূন্যতা তাহলে স্বাভাবিক। একটু ভুল বললাম মনে হচ্ছে।
ভালোবাসার প্রথম অনুভূতির মতন, ভালোবাসার মানুষ ও কোনো দিন হারিয়ে যেতে পারে না। তুমিও কোনো দিন হারিয়ে যেতে পারো না, কারণ তাহলে একটা প্রজন্মের ইতিহাসও হারিয়ে যাবে।

টিভিতে বলছিল, ফুটবল সমাজ আজ শোকগ্রস্ত। কানে খটকা লাগলো। বাড়িতে দিদি কে বললাম, জানিস মারাদোনা আর নেই। তিরিশ বছর ফুটবল সম্বন্ধে কোনো খবর না রাখা দিদি কথা টা শোনার পর কি রকম গুম মেরে গেল। ভোজবাজির মায়া অনেক অনেক দূর অব্দি ছড়ানো।

তোমাকে ভালোবেসেও,তোমার মতন করে জীবনকে উপভোগ করার পাগলামো টা করতে পারলাম না , তোমার মতন রাজা সাজতে পারলাম না। তোমার পথে না চলেও, তোমাকে ভুলতে পারলাম না – তোমার দেখানো স্বপ্ন গুলো এখনো তো তোমার মতন অমর!

ভালো থেকো। তোমাকে চির ঘুমের দেশে ঘুমোতে বলবো না । চেটেপুটে জীবন টা উপভোগ করতে হবে, বাউন্ডুলে খেলার ছলে। ঘুমোলে কি করে হবে !

Diego Maradona
Diego Maradona

A Tribute to Diego Maradona

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *