মন অভিযান – আন্দামান

মাথার উপর এক আকাশ নীল, পায়ের নীচে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ চলে বেড়াচ্ছে, তার নীচে এক সমুদ্র নীল, মাঝে আমি উড়ে চলেছি দ্বীপান্তরে ।from flight আগামী ২ ঘণ্টায় পৌঁছে যাব আন্দামান । প্রচুর খরচ, এই নয় – সেই নয় করে প্রায় দু’বছরের আন্দামান যাওয়ার চেষ্টা আজ ১১ই সেপ্টেম্বর ২০১৬ তে সফল করে ফেললাম । আমার সঙ্গে বুড়ো-বুড়ি, বাচ্চা জোয়ান মিলে ৮ জন, আমারই পরিবার শাখা । যতক্ষণে আন্দামান পৌঁছাব ততক্ষণে জেট এয়ার ওয়েজ-এর একটু নিঃস্বার্থ প্রশংসা করেনি । আমার মন মেজাজ যা ফুরফুরে এখন, যে কোন ছোট্ট ভালো আমার কাছে আজ অনেক ভালো , খারাপ ক্ষমা যোগ্য ।

ভোরের ফ্লাইট , সময় ৫.২৫ মিঃ । ৬ জন আমরা আগে যাব, বাকি ৩ জন আসবে ১১.৩০-র ফ্লাইটে । আমি ছাড়া বাকি সকলের প্রথম অভিগ্যতা ফ্লাইট জার্নির । মানে উত্তেজনার পারদ চরমে । ভোর ৩.৩০ – ৪ টে নাগাদ এয়ারপোর্টে পোঁছালেই চলে, আমরা উত্তেজনার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে রাত ২ টোয় পৌঁছে গেলাম । ১০ই সেপ্টেম্বর কারো চোখে ঘুম নেই । রাত ১২টায় খেয়েদেয়ে হুজুগে, ক্ষেপাটে হাফডজন বাঙালী রেডি – আন্দামান যাবে ।

Netaji Subhas Chandra Bose International Airport
Netaji Subhas Chandra Bose International Airport

কাকভোর কি জিনিস জানা হয়নি কখনো, ভোর ২ টো না রাত ২ টো এ বিষয়ে ঠাট্টা  করতে করতে জেগে কাটিয়ে দিলাম দিব্বি, এদিকে আমি মনে মনে ভাবছি ফ্লাইটে উঠে এক ঘুমে আন্দামান চলে যাব । ও বাবা সেখানেও যে আনন্দ – ফ্লাইটে ব্রেকফাস্ট পরিবেশন শুরু হয়েছে । আমি তো অফার প্রাইসের টিকিট কেটেছি, কাজে অকাজে যতোবার মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর গেছি কোন কোম্পানীর ফ্লাইটই এমন দয়া দেখাইনি, এই জেট এয়ার ওয়েজ ও নয় । আমার সঙ্গীরা কনফিউসড । সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে , আমি কনফার্ম হতে এয়ারহোস্ট ও হোস্টেসদের উদ্দ্যেশে জিগ্যেস করলাম, এই ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারী কিনা; তারা হাসিমুখে নিশ্চিত করতে সবাই ডগোমগো চিত্তে জেট এয়ার ওয়েজ-এর সেবা গ্রহন করলাম । ৭.৩৫-এ আন্দামান ল্যান্ড করবো, বোধহয় আড়াই ঘন্টার প্রায় দুই ঘন্টাই আমরা বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে চলেছি । আর ৩০ মিঃ বাকি পৌঁছাতে, সমুদ্রের ঢেউয়ের আকার আয়তনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে । আমরা চা , কফি , ব্রেকফাস্ট খেয়ে পোর্টব্লেয়ার নেমেই ছোটাছুটি করতে প্রস্তুত ।

আমরা ল্যান্ড করতে চলেছি , চরম উত্তেজনা । আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কিছুমিছু ফ্লাইটের জানালা দিয়ে দেখতে পেয়েছি অনেক্ষণ হলো । উত্তাল নীলের মাঝে টুকরো টুকরো সবুজ ।

আমরা কোন ট্র্যভেল এজেন্সীর সঙ্গে আসেনি । কলকাতায় বসে ওভার ফোনে খোঁজ খবর ক’রে নিজেরাই চলে এসেছি ৭ দিনে নিজের মতো করে আন্দামান দু’চোখ ভরে দেখবো বলে । ফোনে বুক করা এক সাউথ ইন্ডিয়ান কার সার্ভিসম্যান আমরা ল্যান্ড করতেই ফোন করে নিলেন আমাকে, জানিয়ে দিলেন যে আমি ওঁকে কি করে খুঁজে নেব । ওঁনার দেওয়া ড্রাইভার আমাদের রিসিভ করতে আমার নামের প্ল্যকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এয়ারপোর্টের বাইরে । আমি আবারো মুগ্ধ আন্দামানবাসীদের তৎপরতায় ।

পোর্টব্লেয়ার

‘এলেম নতুন দেশে’, প্রথম গন্তব্য হোটেল – ব্যাগেজ রেখে সামান্য ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে পড়বো পোর্টব্লেয়ার দেখতে । হিসেব কষে আসা; ১৮ই সেপ্টেম্বর ফিরে যাব। মানে হাতে ঠিক সাত দিন । টাইম নষ্ট করা যাবে না । সকাল ৯ টায় পোর্টব্লেয়ারের মিউজিয়ামগুলো খুলতে থাকে । আমরা হাজির হয়ে গেলাম ঠিক সময়ে অ্যানথ্রপোলজিকাল মিউজিয়ামের সামনে ।Anthropological Museum at PortBlairযারা আন্দামান নিকবর দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাস – ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করতে চান তাঁরা এখানে সময় দিলে অনেক তথ্য পাবেন নিঃসন্দেহে । আর যদি আমার কথা বলি, তবে বলতে হয় আন্দামান এসেছি মানে আমার ছোটবেলার স্বপ্নপূরণ হ’ল । যবে স্কুলের ভূগোল বইয়ের পাতায় আন্দামানকে পেয়েছি, আর সেই সঙ্গে ভূগোল দিদিমণির কাছে গ্লাস বোটের গল্প শুনে নিয়েছি নিজের মতো করে আন্দামানকে সাজিয়ে রেখেছি । বেশিরভাগ সময় আমরা কল্পনার সঙ্গে বাস্তবকে না মিলাতে পেরে হতাশ হই, আমি কিন্তু হতাশ হইনি; বরং এখানে এসে সমুদ্রকে প্রথম ভালোবাসলাম ।

আমি জন্মাবার পর অবচেতন শিশু থেকে চেতনা জ্ঞান পেয়েছি পাহাড়কে সাক্ষী রেখে । তাই পাহাড় আমার কাছে অনেক বেশি আপন । পাহাড়কে আমি বুঝতে পারি, ভরসা করতে পারি । উত্তরবঙ্গে আমার শিশুবেলা থেকে মেয়েবেলার শুরুটা করে এসে এখন আমি কলকাতাবাসী । অনেকটা কষ্ট পেয়েছি কলকাতার ধূলো-ধোঁয়া-যান্ত্রিক আওয়াজে । কাউকে বোঝাতে পারিনি আমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি ভেতর থেকে এই যান্ত্রিক সভ্যতায়, মানুষ জঙ্গলের অজানা অসভ্যতায় । কতবার মনে মনে ছুটে পালিয়ে গেছি মূর্তি নদীর পাড়ে, যেখানে স্বচ্ছ জলে পা ডুবিয়ে নীল পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর পরিকল্পনা করতাম নদীর পার ধরে যদি পাহাড়কে চোখে রেখে এগিয়ে যাই তাহলে নদীর উৎসতে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে । কারণ বাবা বলেছে নদীটা ঐ নীল পাহাড়টা থেকে নেমে এসেছে বরফ গলে । পরিকল্পনা করতে করতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে বাবা তারা দিত আমাদের কাঠের বাংলোয় ফিরে যাওয়ার জন্য, – বাবা ছিলেন রাজ্য বনদফতর অফিসার; সে জায়গায় সন্ধ্যা মানে হাতি বেড়োনোর সম্ভাবনা । তখন আমার ৬-৭ বছর বয়স ; ঐ পাহাড়ী তেজী নদীর গর্জন শুনে ঘুমাতে যেতাম, আবার ঘুম থেকে জেগেও সেই গর্জন, যার আওয়াজ বর্ষাকালে বেড়ে দ্বিগুন হত ।

সেই আমি যে সবুজ, নদী , পাহাড় কে সঙ্গে নিয়ে ‘চাঁদের পাহাড়’ পড়তে শিখলাম, খাবি খেতেখেতে কাটিয়ে দিলাম কলকাতার কংক্রীটের জঙ্গলে ২১ বছর । মনের চাপে, মানুষের চাপে আমি এখন এক ‘বকোচ্ছপ’ প্রাণী । এই বিবর্তিত রূপ থেকে আমি আবার কখনো পূর্ণ মানুষ হব সে আশা আর রাখিনা , তবে আন্দামান ঘুরে লোভ হ’ল যদি এখানে সময়কে সঙ্গী করে কাটিয়ে দিতে পারি জীবনের শেষ দিনগুলো, হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার কিছু পূর্ণ মানুষ রূপ ফেরত পেলেও পেতে পারি ।

পোর্টব্লেয়ার পরিষ্কার সাজানো শহর ।

Priyanka B
PortBlair

নিরিবিলি পলিউশন ফ্রি রাস্তায় আমাদের গাড়ী ৬জন কে নিয়ে আনন্দের সঙ্গে ঘুরছে এ মিউজিয়াম থেকে ঐ মিউজিয়াম । ফিশারিজ মিউজিয়াম, সমুদ্রিকা ন্যভাল মিউজিয়াম – এত রকম মাছ এত রকম কোরাল ! সারাদিন কাটিয়ে দেওয়া যায় মাছ আর কোরাল চিনতে ।

করবাইনস কোভ

এবার আমরা ছটফট করছি – আর এমন মানুষের সাজানো নয়, আন্দামানের নিজের সাজানো আন্দামান দেখবো । ঘুরতে ঘুরতে ১২টা বেজে গেলো । পেটের দাবী মেনে গাড়ী এসে দাঁড়ালো ভাতের হোটেলের সামনে; বাঙালী ভাতের হোটেল – কলকাতা হলে কখনোই ঢুকতাম না, কংক্রীট জগতে – চাকরী জীবনে সেলুলয়েড লাইফ লিড করে আমার নাক বেয়ারা রকম উঁচু হয়ে উঠেছে । আমার এই লজ্জাজনক ‘বকোচ্ছপ’ পরিচয় আমার আত্মীয়সজনের সামনে চেপে গেলাম । মনের পিঠে বাবা বাছা বলে হাত বুলিয়ে বসে গেলাম ফাঁকা ভাতের হোটেলে । বেশ আপন করে নেওয়া যায় এমন আতীথেয়তায় তৃপ্তি করে ভাত, ডাল, ডিমের তরকারী খেয়ে নতুন উদ্যোগে চললাম একটুকরো সমুদ্রকে ছুঁতে । রামকৃষ্ণমিশনের সামনে দিয়ে আমরা যেখানে পৌঁছালাম, মনে হল কেরালা বুঝি; নারকেল গাছের সারি পেরিয়ে সাদা বালির বীচ , সামনে আসমানী নীল জল । একমূহুর্ত লাগলো না তরল মন আমার পাহাড় থেকে নোনা জল হয়ে উঠতে ।Corbean Beach

বিচের নাম করবাইনস কোভ । নীল, সবুজ, সোনালী রং-মিলান্তির এমন সুন্দর পরিবেশে দিলখুশ দীর্ঘ শ্বাস নিতে গিয়ে শ্বাসরোধ করে নিতে ইচ্ছে হয়, যখন নারকেল গাছের সারির নীচে কোথাও বিচের ইতিহাস লেখা থাকে, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরাজীর ১৯৪২ সালের ২৩শে মার্চ জাপান এই দ্বীপটির দখল নেয় ও বিচের কাছে অসংখ্য বাঙ্কার তৈরী করে বিরোধী যুদ্ধে দূর্গ হিসেবে’। মানুষের মনের জটিলতা, লোভের সামনে প্রকৃতি হার মেনে যায় । নইলে এমন সুন্দর জায়গায় এসে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হওয়া যায়, ভালোবেসে সৃষ্টির মোহে আত্মহারা হওয়া যায়, ধ্বংস-ঘৃণা করা যায় কি ? এত নীল, সোনালী বাহারে রক্ত লাল বড় বেশি বৈষম্য আনে । সমস্ত আন্দামান জুড়ে এরপর ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির সৌন্দর্য, সঙ্গে নির্মম ইতিহাস ।   

ক্ষমা করো আন্দামান

সেলুলার জেল

প্রিপ্ল্যান অনুযায়ী দুপুর ২টোয় চলে এলাম সেলুলার জেলের সামনে । যেখানে জ্ঞানী , জেদী দেশপ্রেমিকরা ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার দাবী পেশ করার অপরাধে নির্বাসিত হয়েছিলেন , সেই ইতিহাসের সামনে আমরা কালের মন্দিরা কলকলিয়ে উঠছি । জেলের বাইরে সাজানো বাগানেও লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিপ্লবী অথবা দেশভক্ত অপরাধীরা ; কালো তেজী মূর্তী, জেল খাটা আসামীর পোশাক-পরিচ্ছদ । আমরা নগণ্য জীব বসে গেলাম তাঁদের ছায়ায় ডাবের জল হাতে ।

জেলের বাইরে

আমাদের বাকি ৩জন সঙ্গীকে নিয়ে বিপ্লবী ইতিহাসে ঢুকে যাব । টিকিট কাটা হচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে, ১০/- মূল্য ।

মাসতুতো দাদা বৌদি ও খুদে ভাইঝি ১১.৩০টার ফ্লাইটে আসার ছিলো । তারা যথাসময় পোর্টব্লেয়ার ল্যান্ড করে নাগরাজন-জীর মসৃণ সার্ভিসিং-এ পৌঁছে গেল আমাদের ৬জনের কাছে । নাগরাজনজী সেই অমায়িক ভদ্রলোক যিনি আমাদের কার সার্ভিস দিচ্ছেন, আন্দামান সফরের দ্বায়িত্ব নিয়েছেন । পদে পদে প্রমান পাচ্ছিলাম আন্দামান ট্যুরিজম নিয়ে কতটা সচেতন । একটা গাড়ী চলে গেল আমার দাদা-বৌদির লাগেজ নিয়ে, হোটেলে ডাম্প করে দেবে । নাগরাজনজী আরেকটা গাড়ী নিয়ে থেকে গেলেন আমাদের কার সার্ভিস দিতে । সব কিছু এরা এত তৎপরতার সঙ্গে করছে যে আমি কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ বা নতুন জায়গায় এসে কোন বিষয়ে চিন্তিত হওয়ার সময়টুকুও পাচ্ছি না । 

সেলুলার জেলের রেপ্লিকা

শহিদদের ছায়ায় বসে আমাদের সবার  মনের গতিবিধি কমবেশী নমনীয় ।  টিকিট দেখিয়ে প্রথমেই যে ঘরটিতে ঢুকলাম সেটা মিউজিয়ম বলা যেতে পারে । ঘরের মাঝে সেলুলার জেলের রেপ্লিকা । ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে জেলের ইতিহাস লিখে ফ্রেম করা আছে। জেলের কন্সট্রাকশন শুরু হয় ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে । কাজ চলে টানা ১০ বছর । সাতটি উইংস নিয়ে তৈরী এই বিপুল নির্মান কারাবাসের যন্ত্রনা নিশ্চিত করতে সুপরিকল্পিত । অবাক হলাম দেখে , যে মানুষ সাম্রাজ্যের লোভে কতটা বিকারগ্রস্ত হলে তবে জল , পাহাড়, অরন্যের কঠিন বাধা-বিপত্তি , সৌন্দর্য্য উপেক্ষা করে এমন নিদর্শন গড়ে তোলে । যে দেশের মানুষকে বন্দী করবে সেই দেশের মানুষকে, সেই দেশের সম্পত্তি কাজে লাগিয়ে তৈরী হয় সেলুলার জেল । এই জেলের ১৩.৫ ফুট লম্বা, ৭ ফুট চওড়া ও ১০ফুট উঁচু একেকটি সেলে রাখা হয়েছিল তরুণ বিপ্লবীদের । মেঝে থেকে ৩মিটার উঁচুতে ঘুলঘুলি জানালা । ঐ টুকুই আকাশ সুজলা সুফলা ভারতবাসীর আজীবন কারাদন্ডে ।

সেল সংখ্যা ছিল ৬৯৮ টি । ৩ তলা ইমারতের সমস্ত টুকু পর্যবেক্ষণে রাখা হত মাঝের উঁচু টাওয়ারটি থেকে ।

চারদিকে বিস্তীর্ণ বঙ্গপোসাগর, নির্জন এই দ্বীপ ছেড়ে পালানোর তো কোন উপায় নেই একমাত্র জাহাজ ছাড়া । এরপরও ছোট ছোট কুঠুরি বানিয়ে তাতে কৌশলী তালা চাবির ব্যাবস্থা  স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবন কিভাবে দূর্বিষহ ক’রে তুলেছিল ব্রিটিশ শাসন তার বিবরণ জানানো হয় সন্ধ্যের লাইট এন্ড সাউন্ড প্রোগ্রামে । জেলের ফাঁসি ঘরের পাশে বসে, ওয়াচ টাওয়ারকে সামনে রেখে লাইট এন্ড সাউন্ডে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নির্বাসিত জীবন ফিরে ফিরে আসে প্রতি সন্ধ্যায় । ফাঁসি ঘর জীবন্ত হয়ে ওঠে নির্ভিক হাসি ও কথোপকথনে । করুণা হয় সেই সব ব্রিটিশ সেনাদের বাহুবল আন্দাজ করে যখন দেখি, নিরস্ত্র সাধারণ ঘরের ছাত্র অথবা খেটে খাওয়া তরুণদের আটকে রাখত সুচারু গরাদের পেছনে ।

Cell

লজ্জা হল এযুগের সেলফি প্রেমী তরুণদের দেখে যারা দিব্বি সেই কারাগারে ঢুকে নিজের ছবি তুলে নিলো । শিঊরে উঠলাম, সেলফীপ্রেমী তরুণ কি ছুঁয়ে এলো বীর সাভারকর, গণেশ সাভারকর, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ সহ ২৪০ জন বঙ্গবাসীকে ঐ সেলে ঢুকে । আমি মুখ লুকিয়ে পালিয়ে চলে আসি ফাঁসি ঘরের সামনে । সেখানে এসে মনে হল “হে ধরণী তুমি দ্বিধা হও, আমি তোমাতে প্রবেশ করি” । একদল ভারতবাসী সেলফী নিতে ভীড় করেছে ছোট্ট ফাঁসি ঘরের সামনে , যেখানে তিনটে ফাঁসীর দড়ি রেপ্লিকা হিসেবে ঝোলানো আছে । মনে মনে সমস্ত মন প্রাণ নতজানু করে ক্ষমা চেয়ে নিলাম সেই সব মায়েদের কাছে, যে সব মায়েদের সমস্ত হৃদয় আত্মা হয়তো দেহ ছেড়ে ছুটে আসত এই ফাঁসি ঘরের সামনে তাঁর বীর ছেলের ফাঁসী আটকাবে বলে । আমি ফাঁসি মঞ্চের নিচে চলে আসি । শহিদের দেহ যেখানে অপমানের বোঝা নিয়ে নেমে আসত সেই অন্ধকার লাশঘরে দাঁড়িয়ে যখন ছুঁতে চাইছি শহিদের আত্মাকে, তখন উপরে আধুনিক ভারতবর্ষের ভিড়ে কোন মা তার ছেলেকে দেশীবিদেশী ভাষা মিক্স করে জানাচ্ছে এখানে ‘আসামীদের’ ফাঁসি দেওয়া হত ।


হ্যাবলক

রাধানগর বীচ

১২ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ – ভোরের ক্রুজ ধরলাম, হ্যাবলক যাব ।

https://www.tripadvisor.in/Attraction_Review-g297584-d8670724-Reviews-Phoenix_Bay_Jetty-Port_Blair_South_Andaman_Island_Andaman_and_Nicobar_Islands.html
Phoenix Bay Jetty

ঝলমলে দিন, সমুদ্র নীল, আসমানী আনন্দ । তিন সাড়ে তিন ঘণ্টার সমুদ্র যাত্রা আন্দামান ট্যুরিজম সংস্থাগুলি নিরাপদ ও আনন্দময় করে রেখেছে ।

https://www.tripadvisor.in/Attraction_Review-g297584-d8670724-Reviews-Phoenix_Bay_Jetty-Port_Blair_South_Andaman_Island_Andaman_and_Nicobar_Islands.html
ক্রুজের ভেতর

৯৭৫/- ডাইরেক্টরেট অফ শিপিং সারভিসেস যাত্রীদের দায়িত্ব নিয়ে নিরাপদে এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিদিন । ক্রুজ জেটি ছেড়ে মাঝ সমুদ্রে এসে যাত্রা যে নিরাপদ তা নিশ্চিত করলে যাত্রীদের নিজের নিজের সীট ছেড়ে ডেকে যাওয়ার অনুমতি মিলছে ।

ক্রুজের ডেক
ক্রুজের ডেক

ডেকে চা , কফি সহযোগে টা-এর ব্যবস্থাপনা আছে । তার জন্য ন্যায্য মূল্য অবশ্যই দিতে হবে; তাতে কি উত্তাল সমুদ্রের মাঝখানে নীলে মাখামাখি হয়ে আনন্দের ঢেউ টুকু তো ফ্রি । ঢেউ যাতে কোনরকম বিরাম্বনার কারণ না হয়ে ওঠে, মিউজিক সিস্টেমের আয়োজন ও আছে । তরুণদের অনুরোধে অথবা চাহিদা বুঝে বলিউড মিউজিকের সঙ্গে উত্তাল নাচ সমুদ্রের মাঝখানে ভালই কন্ট্রাস্ট তৈরী করল, প্রতিদিন করে বুঝলাম।

আমরা হ্যাবলকে পা রাখলাম সকাল ১০টা নাগাদ । আমাদের জন্য নাগরাজনজী এখানে আলাদা গাড়ীর ব্যাবস্থা করেই রেখেছিলেন । সময় নষ্ট হল না । ৩০মিঃ – এ পৌঁছে গেলাম রাধানগর বীচ। ২০০৪ সালের টাইমস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুসারে এশিয়ার সেরা সমুদ্র সৈকত এর শিরোপা পেয়েছে এই সৈকত। এশিয়ার সমস্ত সৈকত আমার দেখা নেই,  দেখে বিবেচনা করার মত ভৌগলিক জ্ঞান ও আমার হবে না । কিন্তু আন্দামানের সমস্ত সৈকতই আমার কাছে এখন অবধি সেরা । আমি বার বার ফিরে আসতে পারি এমন সৈকতের টানে ।

http://www.go2andaman.com/see/radhanagar-beach-beach-no-7/
রাধানগর বীচ

এমন রূপালী মখমল বালি সৈকতের স্বচ্ছ নীলের প্রকৃতির মদিরা নেশা ধরাবেই । অস্বীকার করি কি করে । ভালোবেসে ফেললাম সমুদ্রকে , সাক্ষী পাহাড় । পাহাড় এখানে নিজেই সমুদ্রের পসরা নিয়ে বসেছে । মহাসাগরের মহাকারবারকে আড়াল করে পাহাড় আন্দামানের সৈকতগুলোকে নিরাপদ করেছে । পর্যটককে সাদা স্বচ্ছ ঢেই সুরে হাতছানি দেয় “আয় তবে সহচরী…” । আমিও আর পাহাড়ের আশ্বাসকে অস্বিকার না করে ভালবাসার হাত বাড়িয়ে দিলাম সমুদ্রের দিকে । ভুলে যাই আমি সাঁতার জানিনা , সমুদ্র এখানে এতই আপন ।

রাধানগর বীচ
রাধানগর বীচ

আমরা তরুণ তরুণী পরিবার নীল নোনা জলের হাতছানি উপেক্ষা না করতে পারলেও পরিবারে বয়সে থিতু পাবলিকরা কিন্তু ফুরফুরে সমুদ্রের হাওয়া গায়ে মেখে বীচে বসে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিল । পারফেক্ট রিটায়ার্ড লাইফ যাকে বলে আর কি । আমরা তরুণ তরুণী পরিবার নীল নোনা জলের হাতছানি উপেক্ষা না করতে পারলেও পরিবারে বয়সে থিতু পাবলিকরা কিন্তু ফুরফুরে সমুদ্রের হাওয়া গায়ে মেখে বীচে বসে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিল । পারফেক্ট রিটায়ার্ড লাইফ যাকে বলে আর কি ।

রাধানগর বীচ, হ্যাভলক
রাধানগর বীচ, হ্যাভলক
রাধানগর বীচ, হ্যাভলক
রাধানগর বীচ, হ্যাভলক

রাধানগর বীচের পর সব পর্যটকই এলিফেন্ট বীচ(হাতিটাপু) যান । বীচটি খরচ সাপেক্ষ, নোনা জলের সঙ্গে বিভিন্ন আদর আবদারের বেস্ট আয়োজন সেখানে । আমরা সেইসব খরচ সাপেক্ষ আবদারগুলো মনের কোনে জমা রাখলাম, কারণ আমাদের পরিকল্পনা অন্য । আমরা জনারন্য কলকাতা ছেড়ে উড়ে এসেছি নীল নির্জনে বুক ভরা নিঃশ্বাস নেব বলে ।

~ প্রিয়াঙ্কা বি

 

9 thoughts on “মন অভিযান – আন্দামান

  1. “Ar eto sabkichir modhye ami amar chena manus take ajo khuji….tar kono naam nei….tar buk ta chena….Jekhane diner alo hok ba rater andhokar….ghum chole asto emni….eto sab kichur modhye ….ami jor kore bhule thakte chai….karon ami decided kore niyechi…khusi thakbo….
    But samudro kache pele…ami jani kunti r mato bhasiye debo toke…..
    Yes, ami jani Amar bhalobasa…..karno r theke kam noi. Sudhu karno r asar apekhkha.” A

     
  2. Tomar lekhata pore ek muhurte Kotkata theke mon ta sudur Andamaner neel somudrer buke bhese beralo…sotti anobadyo lekhoni…ei rokom aaro anek lekha porar apekhay roilam

     
  3. Just an incredible trip and awesome description. after seeing these pictures it seems that the mind is there,only the soul is here. want to know more……….

     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *