মৃত্যু এবং মৃত্যুর ভবিষ্যত – আলোচনা করছেন অনিমেষ দত্ত বণিক

মৃত্যু এবং মৃত্যুর ভবিষ্যত

মৃত্যু এবং মৃত্যুর ভবিষ্যত

অনিমেষ দত্ত বণিক

বিজ্ঞানের মতে জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা। যতক্ষণ আমাদের মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কার্যক্রম থাকে ততক্ষণ আমরা আমাদের অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারি বা অন্য কথায় নিজেদের জীবিত বোধ করি। একজন মানুষের প্রতিটি অঙ্গ সুস্থ থাকলেও যদি তার মস্তিষ্ক ফাংশনাল না হয় তাহলে সে মৃত।

মুম্বাইয়ের ব্যস্ততম রাস্তা গুলির মধ্যে একটি রাস্তা, সকালবেলা দুই বন্ধু একটি মোটরবাইকে চড়ে গন্তব্যে যেতে গিয়ে দুর্ঘটনার মধ্যে পরে এবং একজনকে আশংকাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তাররা বুঝতে পারেন তাকে আইসিইউ-তে কৃত্তিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হলেও স্বাভাবিকভাবে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, সে ‘একরকম মৃত’। ঠিক সেই সময়েই এর থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরে পুনের একটি নার্সিংহোমে একটি মেয়ের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের জরুরি প্রয়োজন হয়—  অনেকের হয়তো চেনা লাগছে— হ্যাঁ একটা দমবন্ধ করা উত্তেজনাপূর্ণ বলিউড সিনেমার প্লট-এর একটা অংশ দিয়েই লেখা শুরু করলাম। সিনেমার নাম ‘Traffic‘(২০১৬)— পরিচালক রাজেশ পিল্লাই।

http://s3.india.com/wp-content/uploads/2016/05/04-11.jpg
Award winner Malayalam film by Rajesh Pillai. Later on, the film has been remade in Hindi language by same-name.

সম্প্রতি এই অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিষয়টি সাধারণ মানুষের নিকট বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গবাসী সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে; কলকাতার সাম্প্রতিক অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সফলতার মিডিয়া প্রচারে। কিন্তু ‘Traffic‘ সিনেমায় দুর্ঘটনাগ্রস্ত ছেলেটির ‘একরকম মৃত্যু’ বলতে কী বোঝায় এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিদ্যার সাথে তার সম্পর্ক কতটা তাই এই লেখার মূলজীব্য। এবার আসা যাক লেখার মূল বিষয়বস্তুতে— একেবারে একাডেমিক স্টাইলে।

বিজ্ঞানের মতে জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা। যতক্ষণ আমাদের মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কার্যক্রম থাকে ততক্ষণ আমরা আমাদের অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারি বা অন্য কথায় নিজেদের জীবিত বোধ করি। একজন মানুষের প্রতিটি অঙ্গ সুস্থ থাকলেও যদি তার মস্তিষ্ক ফাংশনাল না হয় তাহলে সে মৃত। আবার একজন মানুষের সম্পূর্ণ শরীর প্যারালাইজড থাকলেও যদি তার মস্তিষ্ক মোটামুটি ভাবে ক্রিয়াশীল থাকে তাহলে সে তার অস্তিত্ব বুঝতে পারে।

আমরা আত্মা বলতে যে স্পিরিচুয়াল সত্তা বা শক্তির কথা চিন্তা করি বিজ্ঞানে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। দৈহিক কার্যক্রম ও মস্তিষ্কের সমন্বয়ের ফলে আমরা আমাদের অস্তিত্ব অনুভব করি এবং একটি জীবনীশক্তি বোধকরি। এই পুরো ব্যাপারটাই মস্তিষ্কপ্রসূত। আত্মা নামক কোনো পৃথক সত্তা বা শক্তির কোনো অস্তিত্ব এখনো বিজ্ঞান খুঁজে পায়নি। বর্তমানে উত্তর আধুনিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হল— কোনো একটি শব্দের একটিমাত্র অর্থ হতে পারে না বা কোনো একটি সত্যিই চরম সত্যি হতে পারে না। এই বিষয়টিকে ইংরেজিতে বলে discourse যার বাংলা প্রতিশব্দ প্রতর্ক। মিশেল ফুকো, মিশেল ভবেল-এর মত চিন্তাবিদরা বিভিন্ন বিষয়কে এই উত্তরাধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। ‘মৃত্যু’ এই শব্দটির অনেক রকম প্রতর্ক আছে। সম্পূর্ণরূপে চিকিৎসা শাস্ত্রে মৃত্যুর স্বরূপ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর ধারণা প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে ক্রমশ পরিবর্তিত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সামাজিক অবস্থানে, হৃৎপিণ্ড সংক্রান্ত একমাত্র মৃত্যু ধারণা থেকে ক্রমশ নিউরন কে কেন্দ্র করে মৃত্যুর ধারণার দিকে এগিয়েছে। যদিও মৃত্যুর সংজ্ঞা নিয়ে বিভেদ রয়েছে— প্রভাব বিস্তার করেছে ধর্ম ও নৈতিকতার মত বিষয়গুলি। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, প্রাচীন গ্রিস এবং রোমে মনে করা হতো, হৃৎপিণ্ড একটা ভাইটাল স্পিরিট (vital spirit) তৈরি করে এবং সেই দিক থেকে হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়াকেই একরকম মৃত্যু মনে করা হয়। কিন্তু Moses Maimonides (১১৩৫ – ১২০৪ খ্রিঃ) নামে একজন জুজইমারের দার্শনিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী প্রথম মস্তিষ্কের অপরিবর্তনশীল স্থিতাবস্থাকে মৃত্যুর সমতূল্য হিসেবে দেখেন। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে যতদিন না উন্নত প্রযুক্তির ICU (intensive care unit)-এর সূচনা হয়েছে যেখানে হৃৎপিণ্ড শ্বাস-প্রশ্বাস এবং মস্তিষ্কের কাজগুলি একসাথে চালানোর প্রক্রিয়া আবিষ্কার হয়েছে ততদিন হৃদস্পন্দন বন্ধ হলেই মানুষের মৃত্যু অবসম্ভাবী ছিল। কারণ কৃত্রিমভাবে বা বাইরে থেকে শ্বাস-প্রশ্বাস (artificial respiration) চালানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না।https://www.sciencedaily.com/images/2015/04/150407124229_1_900x600.jpg

নিউরন কেন্দ্রিক মৃত্যুর সংজ্ঞা আধুনিক যুগে ইউরোপেই আবিষ্কৃত হয়। ফরাসি স্নায়ুবিশারদ(neurologist) Pierre Mollaret এবং Gaulon ১৯৫৯ সালে প্রথম আলোচনা করেন brain death সম্পর্কে। তাঁরা যে শব্দটি ব্যবহার করেন তা হল ‘Coma de’passe’— এই ফরাসি শব্দের বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, —যে কোমা থেকে কখনো ফিরে আসা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁদের প্রবন্ধটি ফরাসি ভাষায় লেখা হওয়ায় তা দীর্ঘদিন নজর এড়িয়ে যায়। এ প্রসঙ্গটি পুনরায় ওঠে ১৯৬৮ সালে; হাভার্ড মেডিকেল স্কুলের একটি কমিটি  (দশজন ডাক্তার দুজন ধর্মতাত্ত্বিক, একজন উকিল, একজন ঐতিহাসিক) একটি সংকলন প্রকাশ করে যার মূল বিষয় brain death বা এমন এক কোমা (যাকে ডাক্তারের ভাষায়  PVS– permanent vegetative state বলা হয়) যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়। প্রকাশনার সঙ্গে সঙ্গে আইনজ্ঞ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনার সূত্রপাত হয়। Brainstem-এর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে brain death-র মূল লক্ষণ ধরা হয়—  ‘if the brain stem is dead, the brain is dead, and if the brain is dead the person is dead.’।http://slideplayer.com/slide/10530212/36/images/3/Coma+vs.+Brain+Death+Coma+=+sleep-like,+unarousable+unconsciousness+in+a+live+person.+Brain+death+=+ambiguous+term..jpg

অর্থাৎ ব্রেইনস্টেম মৃত্যুর সঙ্গে ব্রেইনের মৃত্যু ঘটছে, আর ব্রেইনের মৃত্যু মানে ব্যক্তির মৃত্যু।

কিন্তু সাধারণ জনমানসে এর ভুলবার্তা যায়— কারণ যতক্ষণ না মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ মৃত্যু হচ্ছে ততক্ষণ একটি মানুষকে মৃত বলা যায় না। Vegetative State বা কোমায় মানুষের মৃত্যু সম্পর্কে right to life এবং right to death আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়। Terri schiave নামে একজন রোগীর কথা বলা যায় যার ব্রেইনস্টেম কাজ করা বন্ধ করে ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০ কিন্তু তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয় ৩১ মার্চ, ২০০৫। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় তার সমাধির উপর লেখা হয়— ‘departed this Earth February 25, 1990.’।https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/b/b5/SchiavoGrave.jpg/800px-SchiavoGrave.jpg

এখন পাঠকদের মধ্যে প্রশ্ন হতে পারে তাহলে কি মৃত্যু দু’প্রকার ব্রেইন ডেথ এবং রেগুলার ডেথ? উত্তর ‘না’—  মৃত্যু একরকম যাকে আমরা দু’ভাবে দেখতে পারি—  (a) Cardieo respiratory-র মাধ্যমে এবং (b) neurological criteria-র মাধ্যমে। ক্রমে যখন ব্রেইন ডেথ জনপ্রিয় হচ্ছিল এবং বিতর্ক ও সংশয় তৈরি হচ্ছিল সেই সময়ে Robert Veatch  গবেষণাগ্রন্থDeath, dying, and the biological revolution(1976)- এ লেখেন ‘Human beings should be declared dead once they had lost the ability of meaningfully interact with the others.’ অর্থাৎ মানুষের মৃত্যু তখনই ঘোষণা করা উচিৎ যখন অর্থপূর্ণভাবে সে অন্যের সঙ্গে আর পারস্পরিক সহযোগিতা করতে পারবে না। -মানুষের কর্টেক্স(Cortex) আমাদের আইডেন্টিটি(identity) তৈরীর ফিজিওলজিকাল বেস (Physiological base)।https://i.pinimg.com/originals/93/d6/bc/93d6bc46663e6c7c24c2cc392dd558e4.jpg

ফিজিওলজিকাল বেস-এর কাজ বন্ধ হওয়া মানেই সেই ব্যক্তি মৃত, কারণ আমরা একটি ব্যক্তি কোন মাংসপিণ্ড নই। ব্রেন ডেথের এই ধারণাই হল neocortical idea of death; যেখানে একজন মানুষ ‘ব্যক্তি’ হিসেবে আর বেঁচে থাকে না। কিন্তু নৈতিকতা ও আইনী পদক্ষেপ এই ব্রেন ডেথের বিষয়টিকে জটিল করে, এই নিয়ে বির্তকের অবসান হয় ১৯৮১-র Uniform Declaration of Death Act-এর মাধ্যমে যেখানে মৃত্যুর সংজ্ঞা নির্ধারণে বলা হয় ‘Permanent cessation of the critical functions of the organism as a whole’ অর্থাৎ ‘জীবদেহের সঙ্কটময় কার্যক্ষমতার সম্পূর্ণরূপে স্থায়ী অবসান’। এর মধ্যে ক্রিটিকাল ফাংশনগুলি হল— স্নায়ুতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, হৃৎপিন্ডের প্রক্রিয়া, সংবহনতন্ত্র ও রেচনতন্ত্র। মৃত্যুকে দেখা হয় এই প্রত্যেকটির অপরিবর্তনশীল স্থিতাবস্থাকে। অর্থাৎ মস্তিষ্ককে কেন্দ্র করে মৃত্যুর দু-টি ধারণা আছে, প্রথমটি ব্রেইনস্টেম-এর দ্বারা যাকে ‘irreversible cessation of the organism as a whole’ বলা হয় এবং অপরটি কর্টেক্সের মাধ্যমে যাকে ‘the irreversible loss of the capacity for consciousness and social interaction’ বলা যেতে পারে।

মস্তিষ্কের মৃত্যুর মতো ধারণা যখন বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে জনপ্রিয় হতে শুরু করে তার সাথে সমান্তরালভাবে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তা হল অঙ্গ প্রতিস্থাপন— কিডনির চোরাকারবার সম্বন্ধে প্রায় সকলেই কম বেশি জানেন। কিন্তু হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সেই পন্থা অচল। এ ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমেই তা সম্ভব। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— দীর্ঘদিনের মৃত কোন ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপনের কাজে ব্যবহার করা যায় না। সুতরাং এর একমাত্র উপায় সদ্যমৃত কিংবা brain death-এর ফলে PVS (permanent vegetative state) স্তরে থাকা কোন মানুষের অঙ্গ ব্যবহার করা। ১৯৯২ সালে পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মেডিকেল টিম মস্তিষ্কে আঘাত প্রাপ্ত রোগীদের NHBD (Non Heart-beating Donor)-র অন্তর্ভুক্ত করে। যদি তাদের অঙ্গ, প্রতিস্থাপন যোগ্য হয় তবে তাদের দু-মিনিটের জন্য সমস্ত প্রযুক্তি থেকে বিচ্যুত করে তাদের মৃত্যুর পর তাদের অঙ্গ-গুলি প্রতিস্থাপনের জন্য বের করে আনা হয়। কিন্তু পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় এই NHBD ধারণাটি জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্ক তৈরি করে। আমেরিকার National Academy of Sciences (NAS) এর বিরুদ্ধাচারণ করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে। একজন রোগীকে হত্যা করে আর একজন রোগীর প্রাণদানের মতো বিষয়ে দেখা দেয় নৈতিক প্রশ্ন। ১৯৯৫ সালে Linda Emmanuel (American Medical Association)— আমেরিকার এক আইনজীবী প্রস্তাব রাখেন প্রযুক্তি বিচ্যুতি ও মৃত্যুর মধ্যে একটা ‘মৃত্যুর জায়গা’ বা ‘dying zone’ তৈরি করা হবে যা এই বিষয়ে একটি আইনি পদক্ষেপ।

মস্তিষ্কের মৃত্যু ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিদ্যার মতো বিষয়ের সাথে সাথে প্রযুক্তি ক্রমোন্নতি, মৃত্যু একটি বিতর্কিত বিষয় করে তুলেছে। ১৯৬০-এর দশক থেকেই— এর সাথে যুক্ত cryonics movement মানুষের সামনে এনে দেয় জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে এমন একটা ধূসর জায়গা যা কিনা একমাত্র পৌরাণিক গাথা ও মানুষের কল্পনাতেই বিরাজ করত। ১৯৬৫ সালে প্রকাশ পায় cryonics আন্দোলনের ম্যানিফেস্টো Robert Ettinger-এর ‘The prospect of Immortality’ তৈরী হয়  ‘Frozen alive’- এর ধারণা যেখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে মানব শরীরকে দীর্ঘদিন অক্ষত অবস্থায় রাখা যাবে— প্রতিরোধ করা যাবে অপ্রতিরোধ্য মৃত্যুকেও। ১৯৭২ সালে আমেরিকার এরিজনা প্রদেশে তৈরি হয় প্রথম Cryonics সংস্থা Alcor—যার বিভিন্ন শাখা আজ ছড়িয়ে পড়েছে উত্তর ইউরোপ সহ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। আড়াইশরও বেশি মানুষকে রাখা হয়েছে ‘Frozen alive’ যারা কিনা জীবন ও মৃত্যুর মাঝে একটি ধূসর জায়গায় অবস্থান করছে। https://i.kinja-img.com/gawker-media/image/upload/s--fXFMUE4l--/c_fill,f_auto,fl_progressive,g_center,h_675,q_80,w_1200/18c6wfrpey00zjpg.jpgমস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা এখানে বেশি হলেও রবার্ট ইটিঞ্জার (Robert Chester Wilson Ettinger) এবং তার অনুগামী cryonicist-দের মতে এরা কেউ মৃত নয়। এদের প্রত্যেকের আইডেন্টিটি রয়েছে। এরা প্রত্যেকেই সম্পত্তির মালিক এবং এরা কর প্রদানকারী। তাঁদের কথায় ‘The Fozen are not dead, but should be seen as living patients, waiting for their treatment’(হিমায়িতরা কেউ মৃত নয়, তাঁদের জীবিত রোগীর মত দেখতে হবে, শুধুমাত্র তাঁরা সঠিক চিকিৎসার অপেক্ষায় আছে)।  ‘Frozen alive’ ধারণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর মাধ্যমে কোনো রোগীকে সাময়িকভাবে frozen করে তাকে উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন হসপিটালে স্থানান্তর করে তার মৃত্যু আটকানো সম্ভব। আমরা জানি প্রযুক্তির অভাবে আজ বিশ্বের বহু মানুষের মৃত্যু ঘটছে। কিন্তু cryonicist- র মতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার মানব শরীরকে একটা সাময়িক স্থিতাবস্থা দান করে যেখান থেকে পুনরায় চিকিৎসার মাধ্যমে ফিরে আসা সম্ভব। Cryonics দের গ্রহণযোগ্যতা মৃত্যুর ভবিষ্যতকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে। যার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধারণা আমরা পাই ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত Eric Drexier-এর Engines of Creation গ্রন্থটি মাধ্যমে— যেখানে তিনি ন্যানোটেকনোলজি কথা বলেন ও দাবি করেন— এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের টিস্যু গুলির ঠিক হয়ে যাওয়া সম্ভব। আমরা জানি আমাদের হৃৎপিণ্ড সহ শ্বাসতন্ত্র তিন মিনিট অক্সিজেন না পেলে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরন গুলির ক্ষতি হয় যা কোন চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব নয়। মাধ্যাকর্ষণ এর উপরে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ড্রেক্সিয়রের মতে ন্যানোটেকনোলজি দ্বারা Frozen alive পদ্ধতিতে মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু-গুলির পুনরুত্থান করা সম্ভব— যা নিয়ে এখনো বিস্তর গবেষণা চলছে। এমনকি বর্তমানে Cryonicist-রা মস্তিষ্ক সংক্রান্ত গবেষণায় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে PVS(persistent vegetative state) থাকা রোগীদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

মৃত্যুর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন বিভিন্ন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়েছে বা আগামী দিনে হবে ঠিক সেইরকমই মানুষের মৃত্যু নিয়ে উল্লেখযোগ্য তিনটি ধারণা সবার সামনে আসে ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৭-এ। এ প্রসঙ্গে right to death বা মৃত্যুর অধিকার নিয়ে কমবেশি সকলেরই জানা। এমন কি বিশ্বে বেশ কিছু দেশে বর্তমানে মৃত্যুর অধিকার একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর স্বীকৃত (যদি সে ব্যক্তি মারণব্যাধিতে আক্রান্ত হন)— প্রায় এরকম ধারণাই তবে একটু অন্যভাবে আমরা পাই The Futurist পত্রিকায় Lane Jennigs-এর লেখা প্রবন্ধ ‘Finding better way to die’ যেখানে Jennigs বয়স্ক এবং মারণব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এমন একটি ধারণা দেন যার নাম ‘statutory death’ অথবা ‘reversible suicide’ যেখানে electrical stimulation বা এমন একটি ওষুধ প্রয়োগ করা হবে যাতে ওই ব্যক্তির হ্যলোসিনেশন হবে তিনি মৃত এবং ওষুধের প্রভাব একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকবে যার মধ্যবর্তী সময় তিনি শারীরিকভাবে জীবন্ত হওয়া সত্বেও মানসিকভাবে মৃত থাকবেন (বা ভাববেন তিনি মৃত) ও সম্পত্তি ও তৎসংক্রান্ত দায়িত্ব সহ নিজের শ্রাদ্ধশান্তি ও পরিজনদের থেকে বিদায় নিতে পারবেন অর্থাৎ তিনি এমন একটি ‘twilife’ যাপন করবেন যার ফলে প্রকৃত পক্ষে শারীরিক মৃত্যু যখন তার হবে তিনি খুব সহজেই মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারবেন। Jennigs-এর এই ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাধ্যমে মৃত্যুকে একটি ‘Pleasure Hospice’ এ পরিণত করে।https://image.isu.pub/170904194254-7477fc7b8df1b487749cf037eb089a48/jpg/page_1.jpgএর ঠিক পরের বছর ২০০৬ সালে The Futurist পত্রিকাতেই William Bainbridge-এর লেখা আরো একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যার নাম ‘Cyberimmortality: Science, Religion, and the Battle to Save Our Souls’— আমাদের মোবাইলে মেমোরি কার্ড বা ডেটা ট্র্যাভেলার(data traveler)-এ যেমন কোন তথ্য ডিজিটাল ফরমেটে নিয়ে রাখি ঠিক সেইরকমই মানুষের স্মৃতি এবং সৃষ্টিশীলতা ও যাবতীয় মানসিক বিষয়গুলিকে একটি ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা হবে এবং যে মানুষটির তথ্য সংগৃহীত হল তার ঠিক সেই শরীরবৃত্তীয় কাঠামোর একটি মানুষ কিংবা একটি রোবট তৈরির মাধ্যমে একটি ‘দ্বিতীয় মানুষ’ তৈরী করা— যার মাধ্যমে পুরনো মানুষের আত্মা (মস্তিষ্কের বৈশিষ্ট্যগুলিকে) আমরা সংরক্ষন করতে পারব— লাভ করবো প্রযুক্তির মাধ্যমে অমরত্ব। পাঠক ভাবছেন— রোবট কিভাবে মানুষ হতে পারে— এটা একটা বিভ্রম (illusion) মাত্র। কিন্তু মহামান্য পাঠক যদি একটু অতীতের পৃষ্ঠা উল্টে দেখেন— আমরা আজ বিজ্ঞানের যা কিছু সুবিধা এবং অসুবিধা ভোগ করি তা কোনো না কোনো সময় একটা অলিককল্পনা(illusion)-ই ছিল— আজ তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে, তাই আমরা বিশ্বাস করছি। এই Illusion to Reality— এই বিষয়েও আমাদের ভাবায় ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া একটি হলিউড সাই-ফাই সিনেমা, যার নাম A.I. Artificial Intelligence স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত এই চলচ্চিত্রের অবলম্বন ১৯৬৯ সালে Brian Aldiss লিখিত ‘Super Toys Last All Summer Long’ গল্পটি। http://t0.gstatic.com/images?q=tbn:ANd9GcQSNJKCkqR1u_lLODs3m7UIgwAh_ruFfMp9TBwtpWjpIbKW96sm

সিনেমার সময় একবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে যখন বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে আমস্টারডাম, নিউইয়র্ক, ভেনিসের মতো শহর মুছে গেছে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে এবং মনুষ্য জাতির সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। এই সময় Mecha নামক এক ধরনের নতুন রোবট তৈরি হয় যারা মানবিক চিন্তা ও আবেগের ধারক ও বাহক হতে পারে।https://cdnb.artstation.com/p/assets/images/images/000/302/167/large/mecha_V1_2_1.jpg?1443928020 পরীক্ষামুলকভাবে ডেভিড ( David ) নামে একটি রোবট তৈরি হয় যে কিনা তার মালিকের প্রতি ভালোবাসা জ্ঞাপন করতে সক্ষম ডেভিড একটি বাচ্চা ছেলে সে যেমন একটা টেডি রোবটের প্রতি স্নেহ ভালোবাসা প্রকাশ করছে তেমনি আমরা দেখি তার ‘মা’-এর ভালোবাসার জন্য কাঁদতে যে আসলে একটি ‘তথাকথিত যন্ত্রমানব’। Haley Joel Osment-এর অভিনয়— ডেভিডের প্রাণবন্ত চরিত্র, বিষয়বস্তুতে অন্য মাত্রা দান করলেও সিনেমা সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকে বিখ্যাত পরিচালক স্ট্যানলি কুব্রিক-এর(Stanley Kubrick) হাত ধরে। কিন্তু স্ট্যানলি কুব্রিক-এর মতো সাহসী পরিচালক ও ১৯৭০-এর দশকে এই সিনেমার গল্পকে খুব বেশী কল্পবিজ্ঞান(illusion) ধরে নিয়েছিলেন তাই ১৯৯৯ সালে তার মৃত্যুর পর এই সিনেমা তৈরি দায়িত্ব বর্তায় বহুল প্রচলিত স্পিলবার্গের উপর যার হাত ধরে ডেভিডের গল্প illusion থেকে রিয়েলিটির রূপ পায়। http://digitalspyuk.cdnds.net/17/24/980x490/landscape-1497349028-haley-edit.jpgHaley Joel Osment

এখন শুধু সময় বলতে পারে David-র সিনেমা illusion থেকে ultimate reality তে ‘সৃষ্টি’ হতে পারে কিনা— যা কিনা মৃত্যুর মৃত্যু ঘটাতে পারে।


HUMAN LIFE – in the eternal religion

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *