মৌরি – Anise

মৌরি আমাদের কাছে সুপরিচিত একটি নাম যা মূলত বিভিন্ন রকমের রন্ধন প্রণালীতে ব্যবহৃত হয় । তবে শুধু রন্ধন প্রণালীর উপকরণ হিসাবে নয় মৌরির বিভিন্ন ঔষধিক গুন রয়েছে যা মানুষের শরীরের বিভিন্ন ব্যাধিতে পথ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় । পৌরাণিক যুগে গ্রীস এবং রোমান সাম্রাজ্যের সময় মৌরি এতটাই মূল্যবান ছিল যে মৌরি অনেক সময় কর হিসাবে প্রদান করা হতো ।

মৌরি গাছ সাধারণত দেখা যায় মধ্য পূর্ব বিশ্বে এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে, তবে ইজিপ্টের নীল নদ অববাহিকার উর্বর সমভূমিতে এর প্রারম্ভ. মৌরির বিজ্ঞানসম্মত নাম পিম্পিনেল্লা আনিসুম। মৌরি গাছ সাধারণত আকারে ২ ফুট থেকে 3 ফুট হয় । জুলাই মাসে মৌরি গাছের চাষ শুরু হয়, ফুলটি দেখতে হয় অনেকটা ছাতার মতো । ফুল থেকে নিঃসৃত বীজ যা মৌরি নামে প্রচলিত তা পাওয়া যায় সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ । ঝাড়াই বাছাইয়ের মাধ্যমে ফুল থেকে বীজ আলাদা করা হয় । Anise flower

মৌরি বিভিন্ন রকমের কার্যকরী উপাদান দ্বারা সমৃদ্ধ যেমন প্রানীজ উপাদান(প্রোটিন) যা থাকে ১৮ শতাংশের মতো,  স্নেহ জাতীয় তেল থাকে ৮ থেকে ২৩ শতাংশ, শ্বেতসার ৫ শতাংশ, অশোধিত তন্তু ১২ থেকে ২৫ শতাংশ এবং ১৩ শতাংশের মতো জলীয় পদার্থ । মৌরির মধ্যে বিভিন্ন রকমের খনিজ পদার্থ (মিনারেলস) থাকে যেমন লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিঙ্ক, পটাসিয়াম এবং তামা যা মনুষের শরীরের বিভিন্ন অংশের যেমন হৃদয়, অস্থি এবং রক্ত সুস্থ রাখতে সহায়তা করে । মৌরির মধ্যে ভিটামিন বি জাতীয় উপাদান থাকে যেমন রিবোফ্লাভিন, প্যারিডক্সিন, নিয়াসিন, এবং থিয়ামিন ।

মৌরি তৈরির প্রণালী

মৌরি গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করার পর তা বিভিন্ন পাত্রে রেখে শুকানো হয় এবং তা চূর্ণ করে গুঁড়ো প্রস্তুত করে বায়ু নিরোধক পাত্রে সঞ্চয় করা হয় । শুকনো মৌরি সাধারণত আমরা অনেক সময় আস্বাদন করে থাকি মুখশুদ্ধির জন্য । মৌরি গুঁড়ো গরম জলে ফুটিয়ে তা থেকে প্রস্তুত চা পান করা যায় ।Anise Seed Powder

মৌরির শারীরিক উপকারিতা

১)  মৌরিগুঁড়ো বা মৌরিবীজ নিঃসৃত তেল মানুষের শরীরের বিভিন্ন সমস্যায় সাহায্য করে যেমন মাংসপেশি বা অস্থিসন্ধিতে টান বা খিঁচুনি, সর্দিকাশি, ব্যাথা যন্ত্রনা এবং স্নায়ুতন্ত্রজনিত সমস্যা ।

২)  মৌরিতে যে খনিজ পদার্থগুলি থাকে (লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি) তা আমাদের শরীরের রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন ঠিক রাখতে সাহায্য করে ।

৩)  মৌরিবীজে উল্লিখিত খনিজ পদার্থগুলির মধ্যে তামার পরিমান বেশি থাকে যা পরিপাকে সহায়তা করে এবং মানুষের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে ।

৪)  মৌরিবীজ নিঃসৃত তেলে নিদ্রাকারক এবং বেদনানাশক গুণাবলী আছে যা রক্তচাপ এবং স্নায়ুতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সন্ন্যাস(ক্যানসার) রোগ বা মূর্চ্ছাজনিত  রোগের সময় আমাদের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে ।

৫) মৌরিবীজ থেকে নিঃসৃত তেলের অন্যতম গুণাবলী হল, পচন এবং সংক্রমণ প্রতিরোধী । ব্যাথা বেদনা উপশমেও বেশ উপকার দেয় ।

৬) মৌরি প্রধাণত হজমে সাহায্যর জন্য খাওয়া হয়। ভারী খাবারের পর মৌরি চিবিয়ে খেলে তা আহার পরিপাকে সাহায্য করে ।

৭)  পরজীবী বা ভাইরাস সংক্রমণ এবং মুখের দুর্গন্ধ বা সংক্রমণ প্রতিরোধে মৌরি অদ্বিতীয় ।

৮)  মানসিক উদ্বেগ, স্নায়ুচাপজনিত সমস্যা এবং বিনিদ্রাজনিত সমস্যা কমাতে মৌরি খুব সাহায্য করে ।

আজকালকার দিনে বেশিরভাগ মানুষ বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত, তার মধ্যে হাঁপানি, সর্দিকাশি এবং ব্যাথা যন্ত্রনা আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী । মৌরি থেকে এইসমস্ত অসুখের ঔষধ তৈরি করা হয় । তাছাড়া মৌরিবীজ থেকে যে তেল তৈরী করা হয় তা মাতৃদুগ্ধ প্রস্তুতে সাহায্য করে, নবজাতক শিশুর একমাত্র আহাৰ্য্য । এছাড়াও বিভিন্ন রন্ধন প্রণালীতে সুগন্ধি মসলা হিসাবে মৌরির ব্যবহার অনস্বীকার্য । এই সুস্বাদু মসলাটি সূপ, সস, কেক, বিস্কুট, পাউরুটি এবং বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্ন তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ।

মৌরিতে যে পুষ্টিকর উপাদানগুলি থাকে তার একটি তালিকা নিচে প্রকাশ করা হলো 100 গ্রাম মৌরিকে একক হিসাবে ধরে ।

পুস্তিকারক উপাদান                                সমষ্টি

আমিষ উপাদান                                        ১৮ গ্রাম

জল                                                             ৯.৫ গ্রাম

শ্বেতসার ও শর্করা                                       ১৪৫ গ্রাম

পথ্য সম্বন্ধীয় তন্তু                                         ১৫ গ্রাম

স্নেহ বা চর্বি                                                    ১৬ গ্রাম

ভিটামিন এ                                           ৩১১ মিলিগ্রাম

ভিটামিন সি                                            ২১ মিলিগ্রাম

ভিটামিন বি 6                                       ৬৫০ মিলিগ্রাম

ক্যালসিয়াম                                          ৬৪৬ মিলিগ্রাম

লোহা                                                       ৩৭ মিলিগ্রাম

ম্যাগনেসিয়াম                                      ১৭০ মিলিগ্রাম

ফসফরাস                                            ৪৪০মিলিগ্রাম

পটাসিয়াম                                                    ১.৪ গ্রাম

সোডিয়াম                                                ১৬ মিলিগ্রাম

জিংক                                                     ৫.৩ মিলিগ্রাম

তামা                                                       ৯১০ মিলিগ্রাম

ম্যাঙ্গানিজ                                            ২.৩  মিলিগ্রাম

সেলেনিয়াম                                            ৫ মিলিগ্রাম

মৌরি ঠিকমতো বায়ুনিরোধক পাত্রে রেখে মুখবন্ধ করে সূর্যালোক থেকে দূরে রাখলে তা ১২ মাস ব্যবহার করা যায়, তবে সংগ্রহ করার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবহার করলে এর উপকারিতা পুরো মাত্রায় পাওয়া যায় ।

ভারতবর্ষের মতো এতো বিশাল দেশের যে রাজ্যগুলিতে মৌরি উৎপাদিত হয় সেই রাজ্যগুলি হলো যথাক্রমে পাঞ্জাব, উত্তরাখন্ড, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, মেঘালয় আর আসাম ।

মৌরি চাষের উপযোগী পরিবেশ

মৌরিবীজ থেকে মৌরি গাছের জন্ম. বীজগুলি মাটির এক চতুর্থাংশ গভীরে রোপন করা হয় এবং হালকা ভাবে মাটি দিয়ে বীজের উপরিভাগ ঢেকে দেওয়া হয়. মৌরিবীজগুলি রোপন করার সময় খেয়াল রাখতে হয় যাতে একটি চারা থেকে আর একটি চারার ন্যূনতম দূরত্ব থাকে ১৮ ইঞ্চি। মৌরি চাষ হয় ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে । উর্বর জমি এবং হালকা শুষ্ক জমিতে যেখানে জল নিকাশি ব্যবস্থা ভালো এবং যেখানে সূর্যের আলো ঠিকঠাক পৌঁছয়, সেরকম জমিতে মৌরির বীজ রোপন করা হয় । সপ্তাহে ২ বার জল দিতে হয় আর একবার পর্যাপ্ত সার দিলেই যথেষ্ট । ১০ থেকে ১৪ দিনের মাথায় প্রথম অঙ্কুরোদ্গম হয় বীজ থেকে, আর ৬০ দিনের মাথায় গাছ তার পূর্ণতা লাভ করে । গাছে যে ফুলগুলি আসে সেগুলি শুকিয়ে গেলে সেখান থেকে মৌরিবীজ সংগ্রহ করা হয় ।

 

~ তীর্থঙ্কর

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *