‘রোমান্সোকর’ – গদ্য ধারার পঞ্চম গল্প – প্রেম (৩) – কৌশিক মজুমদার

প্রেম (৩)

ভোরে গাছের তলা দিয়ে যাবার সময় তাঁর রুমমেট এক আকাশবাণী শুনল ” ভাই আমাকে নামা।”

কৌশিক মজুমদার

সবাই যে প্রেমে ব্যর্থ হলেই আকুলি বিকুলি করে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে চাইত তা নয়। তবে হ্যাঁ! একটা প্রবনতা তো ছিলই। একজনই কেবল সত্যি সত্যি ঝাঁপ দিয়েছিল, আর তাঁর ফলাফল দেখে আর কেউ কোনদিন এই বদ ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। ঘটনাটা যা ভাবছেন তা নয়, বরং উলটো। হোস্টেলের ছাদের ধারে একটা পেল্লায় বকুল গাছ ছিল। ঘন ডালপালা। এক আহত প্রেমিক একরাতে এক বোতল মদ্যপান করে একলা ছাদে এসে মারল এক লাফ। তরল অবস্থায় হিসেবে ভুল হতে বাধ্য। সে আটকে গেল বকুল গাছের ডালপালায়। এবং নিজেকে মৃত ভেবেই হোক বা পেটের তরলের জন্যই হোক , সাথে সাথে জ্ঞান হারালো। রাতে অনেক খুঁজেও তাঁকে পাওয়া গেল না। ভোরে গাছের তলা দিয়ে যাবার সময় তাঁর রুমমেট এক আকাশবাণী শুনল ” ভাই আমাকে নামা।” প্রথমে ফল পাড়ার লগা, তারপর মই ইত্যাদি অনেক চেষ্টায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এই কলঙ্ক কোনদিন তাঁর পিছু ছাড়েনি।

আমাদের এক বন্ধু অবশ্য অন্য কান্ড ঘটিয়েছিল। আমরা ভর্তি হবার পরপরই সে নিয়ম মেনে তাঁর এক “বোনের” প্রেমে পড়ে। যথারীতি একতরফা। সেটা আমাদের ইয়ারের প্রথম দিকের কেস। নন প্রেমিকের সংখ্যা অনেক বেশী থাকায় ছেলেটি প্রচুর ফুটেজও পেয়েছিল। কালের নিয়মেই ভ্যালেন্টাইন ডে এল। এবার তোকে কিছু করতেই হবে, নইলে লাখে লাখে নেপোরা দই মারতে উদ্যত এমন কিছু বুঝিয়ে তাঁকে দিয়ে আর্চিসের ৫০ টাকা দামের লাল পান আঁকা কার্ড কেনান হল। ব্যাচের এক আঁতেল ছোকরা ভিতরে সুনীলের নীরা থেকে জব্বর কিছু “কোট” বাতলে দিল। ডেয়ারি মিল্কের চকোলেট সহযোগে সে বস্তু মেয়েটির ব্যাগেও অজান্তে ঢুকে গেল। এবার অপেক্ষা। সবার একটা কি হয় কি হয় ভাব। সেদিন বিকেলে বাবুর ডাক এল লেডিস হোস্টেল থেকে। সেজেগুজে তিনি রওনা হলেন “ভাই দেখিয়ে দিলি তো” জাতীয় প্রচুর শুভেচ্ছা সঙ্গে নিয়ে। যখন ফিরে এল তার মুখ দেখলে গৌতমও গম্ভীর হয়ে যাবেন, জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে, কান লাল। কি ঘটেছে তা আর না বলাই ভাল। মেয়েটি নেহাত বোকা। এই ভাই ব্যাপারটা বড্ড বেশি লিটারেলি নিয়ে ফেলেছে।

ছেলেটি না শুনে অভ্যস্ত নয়। ভর সন্ধেবেলা একঘর লোকের সামনে সে প্রতিজ্ঞা করল ” আমি চললাম। আজ হয় ও থাকবে, নয় আমি।” পুলিস ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে লাভ হল না। সে নাকি তাঁর অনেক দেখা আছে। সাইকেল চেপে অতি দ্রুত সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমরাও চরম উৎকন্ঠায় প্রহর গুনতে লাগলাম।প্রায় ঘন্টাখানেক বাদে তাঁর আগমন। হাসিমুখে। ঘরে ঢুকেই ঘোষণা করল ” দিলাম শেষ করে”। আমরা চমকিত। কাকে প্রশ্ন করতে জানা গেল ফার্মে আমাদের সবার আলাদা আলাদা প্লট দেখাশোনা করতে হত। মরশুমী ফসলের। তাতে মার্কসও থাকত।এই ভদ্রলোক রাতের অন্ধকারে ফার্মে ঢুকে মেয়েটির প্লটের সব গাছ উপরে দিয়েছেন। শুনেই এক বন্ধু ” এই না হলে বাঘের বাচ্চা” বলে পিঠ চাপড়ে দিল তাঁর। আমার কেমন একটা সন্দেহ হচ্ছিল প্রথম থেকেই। অন্ধকারে প্লট চিনল কেমন করে? প্রশ্ন করতেই ” চেনার কি আছে? প্রথম রোয়ের শেষ প্লট” বলতে না বলতে সেই বাঘের বাচ্চা বলা বন্ধু “বরাহ নন্দন” এর প্রাকৃত শব্দটি বলে তাঁকে কিল চড় লাথি মারতে লাগল। অন্ধকারে ঠাহর না পেয়ে ওর প্লটেরই সব গাছ উপড়ে ফেলেছিল বেচারা

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *