‘রোমান্সোকর’ – গদ্য ধারার তৃতীয় গল্প – প্রেম – কৌশিক মজুমদার, অলংকরণে বিল্টু দে

প্রেম

প্রেম (১)

প্রচ্ছদ চিত্রণে – বিল্টু দে

প্রেমিকদের মোবাইল ধরার একটা কায়দা আছে। প্রায় কমন। মোবাইলের সাইজ একটু ছোট মত, ডান দিকের ঘাড়টা বকের মত উঁচিয়ে আছে, অদ্ভুত এক ব্যালেন্সে মোবাইল অ্যাডজাস্ট করা, দুই হাতে একটা সুতো পাকাচ্ছেন, অথবা পেন দিয়ে কাটাকুটি কচ্ছেন। মুখের ভাব অত্যন্ত সিরিয়াস। যেন স্বয়ং আইনস্টাইন থিয়োরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে এডিংটনের সঙ্গে আলোচনায় মগ্ন।

কৌশিক মজুমদার

তখন সদ্য সদ্য মোবাইল এসেছে বাজারে। হোস্টেলে এক বন্ধুকে দেখতাম দিনরাত কানে মোবাইল গুঁজে ফিসফিস করছে। আর এই ফিসি ব্যাপারের একটাই মানে উলটো দিকে তাঁর প্রেমিকা রয়েছেন। প্রেমিকদের মোবাইল ধরার একটা কায়দা আছে। প্রায় কমন। মোবাইলের সাইজ একটু ছোট মত, ডান দিকের ঘাড়টা বকের মত উঁচিয়ে আছে, অদ্ভুত এক ব্যালেন্সে মোবাইল অ্যাডজাস্ট করা, দুই হাতে একটা সুতো পাকাচ্ছেন, অথবা পেন দিয়ে কাটাকুটি কচ্ছেন। মুখের ভাব অত্যন্ত সিরিয়াস। যেন স্বয়ং আইনস্টাইন থিয়োরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে এডিংটনের সঙ্গে আলোচনায় মগ্ন।

প্রেমিকদের সর্বদাই একটা স্টেট অব আর্জেন্সি থাকে। আর সেটা শেয়ার করার জন্য বেচারা নন প্রেমিকরা ছাড়া গতি নেই (বাকি প্রেমিকরা তো তখন প্রবল ফিসফিসানিতে ব্যাস্ত)। জানি না কোন অজ্ঞাত কারণে প্রেমিকদের পরবর্তী পদক্ষেপের পরামর্শ দেবার গুরুদায়িত্ব এই নন প্রেমিকদেরই। প্রথমে তো প্রোপোজ করার আগে প্রেমিকের ব্রীড়া দেখার মত। ছেলেকে দেখলেই বোঝা যায় প্রেমে পড়েছে। সাতদিনে চান করত না যে ছেলে, মুখে বাঘা গন্ধ, সেও টেম্পটেশান ডিও মাখছে আর ক্লোরমিন্ট চুষছে। মুখে একটা বোকা বোকা হাসি হাসি ভাব।

প্রেম
অলংকরণ – বিল্টু দে

সে অপেক্ষা করবে কখন আপনি বলবেন “কি রে, টুম্পির কি খবর?” সাথে সাথে গাল ভরা হাসি। সুচিত্রা সেনিয় গদগদ গলায় “সেটা আমি কি করে জানব?”- বলে এড়িয়ে যাবে। কিন্তু যাবে না। অপেক্ষা করবে আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের। যদি আপনি আর ব্যাপারটা না আলটান তবে “এই শোন না, এই শোন না…” বলে হ য ব র ল-র ন্যাড়ার মত আপনাকে টুম্পির সাতকাহন শোনাবেই…” জানিস তো ও না অন্য মেয়েদের মত না…একেবারে আলাদা…” আপনাকে বলতেই হবে “জানি তো। ওকে দেখেই বোঝা যায়…”

প্রোপোজের দিন গোটা হোস্টেল টের পাবে আজকে একটা কিছু হতে চলেছে। বেশ একটা সাজসাজ রব। নন প্রেমিকরা তাঁদের শেষ মূহুর্তের টিপস দিতে ব্যাস্ত। নব্য প্রেমিক ঘাড় গুঁজে সব শুনছেন আর ঘনঘন মাথা ঝাঁকাচ্ছেন। ফুল হাতা শার্ট, বন্ধুর থেকে নেওয়া নতুন জিন্সের প্যান্ট (লম্বায় বড়, তাই তলা গোটানো), আর এক বন্ধুর ডিও মেখে বাবু তো রওনা হলেন। যেন যুদ্ধে যাচ্ছেন। দু এক জন অতি উৎসাহী বেশ দূরে কিছুই বুঝি না ভাব করে তাঁকে ফলো করে চলল। নির্দিষ্ট জায়গায় বেশ কিছু ফাজিল বান্ধবী সহ (নব্য প্রেমিক এই উপাধি দিয়েছেন এদের) রাজহংসীর মত নায়িকার প্রবেশ। রাস্তার ধারে প্রেমিকের উসখুস। দু একবার গলা খাঁকরে কমল মিত্রের ভয়েসে “টুম্পি, একটু কথা ছিল” বলতে গিয়ে কাঞ্চন মল্লিকের গলা বেরোয়। টুম্পির বন্ধুরা, ফাজিল বলেই হয়তো ফিক ফিক করে হেসে এগিয়ে গেল। টুম্পি বইখাতা হাতে দাঁড়ায়। প্রেমিকের ঘাড়ের উপর দিয়ে বকুল গাছের ডালের কাকটিকে দেখতে দেখতে বলে” কিছু বলবি?” এই সময়টাই সব থেকে ক্রুসিয়াল। নন প্রেমিকরা আগেই শিখিয়েছে। এস্পার নয় ওস্পার। প্রেমিক গলাটা খুব নরম করে বলে

– ” আমার না…মানে..তোকে খুব…”

-“কিন্তু আমি তো এনগেজড…”

-“ওহ! সরি! কিন্তু আমরা কি বন্ধু হয়ে থাকতে পারি?”

-“আমরা তো বন্ধুই…”

– “ও! হ্যাঁ!! থ্যাংকস”

টুম্পি চলে যায়…বান্ধবীদের সাথে। দূরে দাঁড়ানো বন্ধুরা ঘিরে ধরে প্রেমিককে। তাঁরা বুঝেছে কি ভয়ানক ব্যাথায় দীর্ণ হচ্ছে প্রেমিকের হৃদয়। আপনি তারই মধ্যে বলে উঠবেন “আমি আগেই জানতাম। ফালতু মেয়ে। এরম হাজার হাজার পাবি। চল আজ সন্ধ্যায় মোহাব্বতে দেখতে যাব।”

প্রেম (২)
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *