‘রোমান্সোকর’ – গদ্য ধারার সপ্তম গল্প – প্রেম (৫) – কৌশিক মজুমদার

প্রেম (৫) কৌশিক মজুমদার

প্রেম (৫)

কৌশিক মজুমদার

ছাতের কোণে একলা বসে কাক সোনা, আজ তবে এইটুকু থাক। আতাগাছে তোতাপাখি ডালিম গাছে টিয়ে তোমার আমার দেখা হবে লাইব্রেরীতে গিয়ে।

আমাদের হোস্টেলে শুরুর দিকে মোবাইলের অত বারবারন্ত ছিল না। ফলে প্রেমপত্রের একটা বিশাল ভূমিকা ছিল। সবার পক্ষে সৃষ্টিশীল হওয়া সম্ভব না। ফলে এই প্রেমপত্র লেখকদের প্রায়ই আউটসোর্স করা হত। প্রতি বছরই কিছু আঁতেল ছেলে আসে। তাঁরাই বর্ধিত দায়িত্ব নিয়ে এই কাজ করত। সুনীলের নীরা আর জয়ের কবিতা ছিল সবার আগে। কোন অজানা কারণে রবি ঠাকুর সম্পূর্ণ ব্রাত্য জন ছিলেন। কে যেন একবার দাদার কীর্তি দেখে প্রেমপত্রে “চরণ ধরিতে দিও গো আমারে” লিখে ব্যাপক প্যাঁক খেয়ে ” ওমা তাপস পাল আবার রবীন্দ্রসংগীত গায় নাকি? আমি তো ভেবেছি আধুনিক গান” বলে ম্যানেজ করেছিল।

প্রথম প্রথম সব কিছুতেই উৎসাহ থাকে। এই চিঠি লেখকরা প্রথমে খুব আগ্রহ দেখাত। শেষে চিঠির সংখ্যার বিপুল বৃদ্ধি ও প্রায় শূণ্য সাফল্যের হার তাদের হতোদ্যম করে। আরও একটা ব্যাপার ছিল। প্রতিটি চিঠির সাথে সাফল্যে “পেট ভরে খাওয়াব” র প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিফলে কি হবে বলা থাকত না। হত যেটা, নব্য প্রেমিকের সেলফ কনফিডেন্স এতটাই বেশি থাকত, যে বিফল হওয়া মাত্র তাঁর মনে হত তাঁর জন্য না, অন্য কোন কারণে তাঁকে বর্জন করা হয়েছে। কেন জানি না, প্রথমেই তার সব রাগ গিয়ে পড়ত সেই চিঠি লেখকের উপর। বাছা বাছা গালাগাল বর্ষিত হত সেই বেচারার উপর। তখন তাঁর প্রতি কেউ সহানুভূতিও দেখাত না। ব্যর্থ প্রেমিকের বন্ধুরাও সেই সুযোগে তাকে চারটি গালি মেরে যেত। ফলে বছরখানেক বাদে শত প্রলোভনেও তাঁরা চিঠি লিখতে রাজি হত না। সমস্যা শুরু হল তখন। অদ্ভুত সব চিঠি লেখা আরম্ভ হল তারপর থেকে। লিখত প্রেমিকরা নিজেই।

প্রেমপত্রে কবিতা মাস্ট। তাই ব্যাপারটা এমন হল

-“ছাতের কোণে একলা বসে কাক সোনা, আজ তবে এইটুকু থাক। আতাগাছে তোতাপাখি ডালিম গাছে টিয়ে তোমার আমার দেখা হবে লাইব্রেরীতে গিয়ে।”

অনেকে আবার প্রেমপত্রের মাস প্রোডাকশন শুরু করল। একজন একটা প্রেমপত্র লিখে সফল হয়েছে। তার মেড ইজি অর্থাৎ একই চিঠি, শুধু “প্রিয়তমা——” আর “তোমার, শুধু তোমারই—–” বদলে বাকিটা হুবহু কপি করা হতে লাগল। ব্যাপারটা একবারই গুরুচরণ হয়েছিল। একটি মেয়ে বাবা মা-কে জানাল তাঁকে নাকি এক অশ্লীল প্রেমপত্র দেওয়া হয়েছে। যে লিখেছে সে নিতান্ত ভালমানুষ। এমন কাজ করতেই পারে না। সভা বসল। চিঠি পাঠ শুরু হল সবার সামনে। আবেগে গদগদ কিন্তু অশ্লীলতা কই? বোঝা গেল শেষ লাইনে। তাতে লেখা ছিল-

“আমার সব অঙ্গ যদি খসেও পড়তে থাকে, তবে শেষ যে অঙ্গটি রয়ে যাবে সেটাও তোমাকে দিলাম।” 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *