‘রোমান্সোকর’ – গদ্য ধারার অষ্টম গল্প – প্রেম (৬) – কৌশিক মজুমদার

প্রেম (৬) কৌশিক মজুমদার

প্রেম (৬)

কৌশিক মজুমদার

“তবে কাল তোমার কবিতার খাতাটা নিয়ে এস। পড়া শেষে তোমার লেখা একটা কবিতা শুনব আমরা সবাই।” ছেলেটি কবিতা বিশেষ বুঝত না। ধারও ধারত না। সবাই তাঁকে বোঝাল মেয়েটি এত কষ্ট করে কবিতা পাঠ করবে, আমাদের সব্বার উচিত কবির কবিতা শেষ হওয়ার পর একত্রে হাততালি দেওয়া।

এবারের ঘটনাকাল একটু পিছিয়ে। মানে ইস্কুল যুগে। “আমরা যখন রাজা ছিলাম বালককালে”। আমাদের ইস্কুলের পাশেই ছিল বিশাল বড় এক পুকুর, আর তার ওপাশে ভয়ানক রহস্যে ঘেরা মেয়েদের ইস্কুল। কেউ জানে না সেখানে কি হয়, আমাদের সকল আগ্রহ হারিয়ে যেত বিশাল উঁচু পাঁচিলের এধারে। সুন্দর সুন্দর মেয়েরা কেমন কলকলিয়ে ইস্কুলে ঢুকে যেত। আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। বড় রাস্তার উপর ছিল এক বন্ধুর বাড়ি। ইস্কুলের গলির ঠিক মুখটায়। ছুটি হতেই তাঁদের বাড়ি গিয়ে জল খাবার ধুম পড়ত। এই সুযোগে, যদি প্রিয়ার দর্শনটুকু মেলে… ইলেভেনে ওঠামাত্র প্রাইভেট টিউশনের ফলে মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার একটা সুযোগ এল। বয়সটাও খারাপ। বাতাসে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা… আর যায় কোথায় টপাটপ বন্ধুরা প্রেমে পড়তে লাগল।

আমাদের এক বান্ধবীর বাড়ি রসায়ন পড়ানো হত। বেশ বড় ব্যাচ। এক বেচারী সেই ব্যাচে গিয়ে পরদিনই প্রেমে পড়ে গেল। ছেলেটি নিতান্ত গোবেচারা। মেয়েটি দুর্দান্ত। ছোট থেকেই কবিতা বলা, লেখা, নাটক করা, টেনিস খেলা সবেতে পারদর্শী। ছেলেটি মুখচোরা। মেয়েটি বলিয়ে কইয়ে। এমনতর মেয়েকে ইম্প্রেস করা যায় কিভাবে? ছেলেটি অনেকভেবে একটা উপায় বার করল। অদ্ভুত উপায়। টিউশনে গিয়েই , “কাকিমা জল খাব” (মাসিমা, মালপোয়া খামু স্টাইলে) বলে একজগ জল চাইত; আর বিশাল স্টিলের জগের জল একা ঢকঢক করে খেয়ে নিত। সবাই বিস্মিত। ছেলেটি খুশিখুশি। এমনিধারা কিছুদিন চলার পর কে যেন ছেলেটিকে খবর দিল সেই মেয়েটি গোপনে তাঁকে “জলহস্তী” বলে ডাকে। শুধু জল পান নয় ছেলেটির চেহারার প্রতি যে “স্থুল” ইঙ্গিত ছিল, তা ছেলেটিকে মর্মাহত করলেও সে কিন্তু আশা ত্যাগ করল না। বন্ধুরা বহুদিন ধরেই বুঝতে পারছিল গোলমাল কিছু একটা হচ্ছে। ফলে তাঁরাও উদ্যোগী হল ছেলেটির উপকার করার। যাতে মেয়েটির নেকনজর ছেলেটির উপর পড়ে।

একদিন সুযোগ এল। মেয়েটি ব্যাচে এসেই ঘোষণা করেছিল সে একজন কবি এবং কবিতাই তাঁর জীবনের সাধনার ধন। ফলে মাস্টারমশাই একদিন বললেন “তবে কাল তোমার কবিতার খাতাটা নিয়ে এস। পড়া শেষে তোমার লেখা একটা কবিতা শুনব আমরা সবাই।” ছেলেটি কবিতা বিশেষ বুঝত না। ধারও ধারত না। সবাই তাঁকে বোঝাল মেয়েটি এত কষ্ট করে কবিতা পাঠ করবে, আমাদের সব্বার উচিত কবির কবিতা শেষ হওয়ার পর একত্রে হাততালি দেওয়া। পরদিন পড়াশুনো শেষে কবিতা পাঠ শুরু। চারিদিকে নারীদের ওপর যে অত্যাচার অবিচার চলছে, তা নিয়ে এক মর্মান্তিক কাব্য। যেমন কবিতা, তেমনি গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে তার পাঠ।দীর্ঘ কবিতা। ছেলেটি উসখুস করছে। কবিতা শেষের ঠিক আগে “সন্তানহারা জননী আজ তাই বলছে” ব’লে শেষ লাইনের অভিঘাত আরও তীব্র করতে কবি একটু “পজ” নিলেন, আর ঠিক তক্ষুনি.. “বাঃ বাঃ, খুব সুন্দর, খুব সুন্দর। হেভি হয়েছে” বলে দুই হাত বাড়িয়ে চটাস চটাস করে হাততালি দিয়ে উঠল ছেলেটি….

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *