হারিয়ে যাওয়া মানচিত্র

লেখিকা : প্রিয়াঙ্কা গুহ  অশকগাথা প্রকাশন  প্রচ্ছদ : রাতুল চন্দ্র রায় মুল্য : ৫০ টাকা
লেখিকা : প্রিয়াঙ্কা গুহ
অশকগাথা প্রকাশন
প্রচ্ছদ : রাতুল চন্দ্র রায়
মুল্য : ৫০ টাকা

অনেকদিন পর এমন একটা বই পড়া গেল  যেখানে নারী মনের বাস্তব অনুভূতি কল্পিত হয়েছে । সহজ ভাবে বলা যায় নারীজীবনের উত্থান-পতন , ভালোবাসা , হারিয়ে যাওয়ার কিছু বয়স , মুহুর্তে খুঁজে পাওয়া যায় । লেখিকা যেভাবে তাঁর গদ্যগুলো উপস্থাপনা করেছেন সেখানে এটি একটি উপন্যাসের ছোটরূপ বলা যেতে পারে । কারণ গদ্যের চরিত্রদের নাম একই রয়েছে ; কোথাও কোথাও যদি তিনি তাদের নামের পরিবর্তন করতেন তবে হয়তো সম্পূর্ণ আলাদা গদ্য হিসেবে বিবেচনা করা যেত । গদ্যগুলো সাজানোর ভঙ্গী অসাধারণ হয়েছে । প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে যেন কৌতূহল জাগায় তারপরে … তারপরে … । অন্য গদ্যে প্রবেশ করলে মনে হচ্ছে এবার পূর্বের গল্পের পূর্ণতা পাচ্ছে । এইভাবেই প্রতিটি গদ্য সত্যিই অনবদ্য হয়ে উঠেছে ।

     প্রথম গদ্য ‘ হারিয়ে যাওয়া মানচিত্র ‘ ; এই শুরুটা যেমন অদ্ভুত , গদ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়টিও তেমনি জোরালো – তবু কখনো কখনো গায়ে কাটা দেয় , বুক মুচড়ে ওঠে কিছু খুচরো মুহূর্তের জন্য । যা কিছু এই গদ্যে সহজ অথচ গভীর তাৎপর্যের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন লেখিকা ; ” আমার বাবাও তো ফিরতে চেয়েছিল তার একটু একটু করে তৈরী বাড়ি , আমার মায়ের যত্ন ঘরে । দইওয়ালা হঠাৎ কি করে যেন হারিয়ে গেল । আর তারপর থেকে সব রাস্তা আমাকে চিনে নেয় ।” –  কেমন আনমনা করে দেয় এমন আবেগপূর্ণ কথা । আবার এমন নিঃস্তব্ধ রাস্তা পেরিয়ে কিছু জন্মকথা একাকার করে দেয় ক্যানেল রোড । বাস্তব জীবনে অনেক স্বপ্ন নিয়ে কিছু জন্ম এভাবেই মিলিয়ে যায় – ” সেই কথাগুলো বয়ে কয়েক পা এগিয়ে রাজীব বলেছিল পাশের নোংরা নালাটায় আমাদের জন্মকথা ফেলে দিতে ।”

     দ্বিতীয় গদ্য ‘ তাস-ঘর ‘ ; গদ্যের ভিতরে বিস্তারিত পথে লেখিকার কলম ঝড়ের মত বয়ে গেছে যেখানে তিনি লিখেছেন নারী জীবনের এক অসাধারণ অনুভূতি , কিছু যন্ত্রণা , এলোমেলো দিনযাপনের কথা । জীবনে অনেক মানুষের উপস্থিতি, – এমন উপস্থিতি যখন মানুষগুলো অচেনা হয়ে ওঠে , একাকীত্ব জাপটে ধরে – তখন একটি নির্ভরতা কাঁধ পেলেই মাথা নুইয়ে আসে । লহরীর জীবনে এমন অনেক দূর্বলতা এসেছিল রাজীব , সূর্যজয় , নীলাব্জ , –  অতিক্রম করে সে এগিয়ে গেছে শেষমেশে আর্য-র দিকে । সমস্ত দূর্বলতার শেষেও ভেঙ্গে পড়ার শব্দ তবু এই গদ্যের অন্তিমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । হঠাৎ সব মিলিয়ে যায় । হঠাৎ কঠিন বরফ যেন গলতে গলতে একসময় সমতলে মিশে যায় ।

তৃতীয় গদ্য ‘ ভুলে যাওয়ার খেলা ‘ ; আমাদের জীবনের দীর্ঘ মেমোরিকার্ড-এ এমন অনেক কিছু মুছে যেতে যেতে মিলিয়ে যায় জীবনের কাছ থেকে , কাছের মানুষের থেকে পাওয়া আঘাত সেই  মেমোরিকার্ড ধ্বংস করে দেয় । রূপসার একাকীত্বের জীবনে শৌনকের মতো পুরনো ভাঙা অতীত এসে জোটে । এরপরও তাকে ভুলে যাওয়ার জন্য কীভাবে যেন জট পাকিয়ে ওঠে রূপসার জীবন , রূপসার বেঁচে থাকা । একই সঙ্গে বলে নেওয়া যাক চতুর্থ রচনা ‘ একটি রেখা পেরলেই ‘ – র কথা । গদ্যটি জীবনের শেষের কিছুটা পথ তুলে ধরে । প্রাপ্তবয়স্কা নারীর জীবনে হঠাৎ বর্তমান উঁকি দিয়ে যাওয়ার মত ঘটনা, আবার নিজের মেয়ের মত নতুন জীবন সঞ্চালনা করা , তার অন্তীম ভালবাসার অপেক্ষা সবটাই যেন একটা শুকনো দিনের মতো কেটেছে গদ্যের পাতায় । এক বৃদ্ধা জীবন গড়েছেন লেখিকা তাঁর গদ্যে ।

সবশেষে বলা যায় গদ্যগুলি নারীজীবনের সঙ্গে জড়িত । নারীমনে অদ্ভুত মিশ্রণ লেখিকার গদ্যে ফুটে উঠেছে । তবে গদ্যগুলির সাপেক্ষে প্রচ্ছদটি আরও অন্যরকম হলে হয়তো বেশি ভালো হত ।

~ বর্ষা কর্মকার

 

2 thoughts on “হারিয়ে যাওয়া মানচিত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *