মস্তিষ্ক কিভাবে সতেজ রাখবেন (Brain Gym) জানাচ্ছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা

মস্তিষ্ক কিভাবে সতেজ রাখবেন (Brain Gym) জানাচ্ছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা

ডাঃ কামাল হোসেন

আমরা সকলে জানি, ব্রেন বা মস্তিষ্কই আমাদের মন ও দেহের বিচিত্র সব কর্মকান্ডর প্রধান চালিকাশক্তি, মন চাঙ্গা থাকলে অনেকখানি সহজ, সুন্দর ও অর্থবহভাবে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন উপভোগ করতে পারি।

ভুবনায়নের ফলে আমাদের জীবনযাত্রায় কতখানি স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটির মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি, অসংখ্য মানুষ ডিপ্রেসনে ভুগছেন, কেউ কেউ চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ গ্রহণ করছেন, প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় নানাভাবে তা টের পাচ্ছি।

একেবারে শৈশব থেকে শুরু। অভিজাত নামী দামি স্কুলে ভর্তির প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পর ধাপে ধাপে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট, ফার্স্ট হওয়ার ইঁদুর-দৌঁড়, বয়োঃসন্ধির রহস্যময় আলোআঁধারিতে কেরিয়ার গড়ার যুদ্ধবিগ্রহের পাশাপাশি নানারকম নেশা, অপরাধের মত নিষিদ্ধ অ্যাডভেঞ্চারে যোগ দেওয়ার জন্য বন্ধুদের আমন্ত্রণ, সমস্ত যৌবন জুড়ে জীবিকা প্রতিষ্ঠার লড়াই, দাম্পত্য, সন্তানের প্রতি দ্বায়িত্ব পালন, ছুটতে ছুটতে কখনও ডিপ্রেসনের চোরাবালিতে কেউ ডুবে যাই, কখনও বা প্যানিক আংজাইটির ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিপাকে দিশেহারা হই। ইদানিং চিকিৎসাশাস্ত্রের কৃপায় মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, ফলে ডিমেনসিয়া অ্যালঝাইমার্সের মত ভুলে যাওয়ার অসুখও দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। ‘জার্নাল অব আমেরিকান জেরিয়াট্রিক্‌স টু ডে’ পত্রিকার এক সমীক্ষা অনুযায়ী ২০৫০ সালে ১৩৫ মিলিয়ন মানুষ ডিমনেসিয়াতে আক্রান্ত হবেন।

 http://www.homeroam.info/brain_gym/
dementia

মস্তিষ্কের ব্যায়াম

পৃথিবী জুড়েই মনের অসুখ নিয়ে নানারকম অগ্রিম সাবধানতা প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা তাঁদের মতামত জানাচ্ছেন। যেহেতু মনের মাধ্যমে আমাদের অনুভূতির জগৎ বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, মনই আমাদের আমিত্ব বা অস্তিত্বের স্বরূপ, তাই মস্তিষ্কেরও ব্যায়ামের সচেতনতা বাড়ছে।

ভারতীয় যোগ

ব্যাপারটা কিন্তু নতুন কিছু নয়। আমাদের দেশে বহুকাল আগে বৈদিক মুনিঋষিরা যোগ ব্যায়ামের বিভিন্ন আসন ও কলাকৌশলের শিক্ষা দিয়েছেন। মেডিটেশন বা ধ্যানের মাধ্যমে মনকে আরও সজাগ ও শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া তাঁরা জানতেন। সৌভাগ্যের কথা, এখন সমস্ত পৃথিবী জুড়েই মন ও শরীরের যোগের অসাধারণ প্রভাবের প্রতি সচেতনতা বাড়ছে। অসংখ্য যোগ সেন্টার শুরু হয়েছে।

চীনে ‘তাই চি‘ ব্যায়ামের মধ্যেও ওরা মানসিক রিল্যাকশেসন করেন।

http://www.homeroam.info/brain_gym/ ‎
Tai Chi Concentration

 

ব্রেন জিম

স্নায়ু মনোরোগ বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, ব্রেনকে সুস্থ রাখার মতো যথাযথ লাইফ স্টাইল এবং খুব পরিকল্পনা মাফিক নিয়মিত ব্রেনের ব্যায়াম করলে আমাদের ব্রেন অধিত জ্ঞান, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও বোধের যে সঞ্চয়, যা আমাদের নিজস্ব সত্বার পরিচয় বহন করে, সেগুলির ক্ষয়কে অনেকখানি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

কি রকম হতে পারে মস্তিষ্কের ব্যায়াম

মনে রাখতে হবে, আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় – দর্শন, ঘ্রাণ, স্পর্শ, স্বাদ ও শ্রবণের সঙ্গে ব্রেনের বিভিন্ন অংশের যোগাযোগ রয়েছে। ফলে এদের কার্যকলাপের নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সৃষ্টির ফলে স্বাভাবিক ব্রেন নিউট্রিয়েন্ট উৎপন্ন হবে, যা স্মৃতিশক্তিকে মজবুত করতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি ব্রেনের বিভিন্ন কোষকেও শক্তিশালী করবে।

  • যেমন – সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজার সময় ‘অনভ্যস্ত’ হাতটি ব্যবহার করে ব্রাশ করুন। ব্রেন কোষগুলি এতে সজাগ হবে।
  • স্নান করার সময় চোখ বন্ধ রাখুন। স্পর্শের দ্বারা সবান মাখুন, গায়ে জল ঢালুন, স্নান শেষ হলে তোয়ালে দিয়ে গা মুছুন।

চোখে না দেখেও কিছু কাজ স্পর্শের সাহায্যে করার অভ্যেস করলে ব্রেনে কটিকাল এলাকায় তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ধরুন পকেটে অনেকগুলো খুচরো পয়সা আছে। পকেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে স্পর্শের মাধ্যমে পয়সাগুলির আয়তন অনুভব করে গুনতে চেষ্টা করুন।

মস্তিষ্কের ব্যবহার বাড়ান


ডাঃ দেবাঞ্জন পান

মানসিক-চর্চা বা সাধারনভাবে যাকে আমরা মস্তিষ্কচর্চা বলছি তার সাফল্য দাঁড়িয়ে আছে ব্রেনের কিছু বিশেষ বৈশিষ্টের ওপর, যেমন –

নিউরোপ্লাস্টিসিটি

সোজাভাবে বললে, মস্তিষ্কের কিছু অংশের অভ্যন্তরীণ স্নায়ুকোষ (নিউরোন) এর আমৃত্যু বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা থাকে। শুধু তাই নয়, স্নায়ুকোষগুলির মধ্যে সংযোগও অপরিবর্তনীয় নয়। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলে এই স্নায়ুকোষগুলি দিয়ে তৈরি জোটবন্ধনের ভিত্তিতে। মস্তিষ্কের যাবতীয় কাজকর্ম আর তার ফলে আমাদের ব্যবহার, আচার-আচরণ, চরিত্র, বৈশিষ্ট্য সবই মূলত নির্ভর করে থাকে এই বিভিন্ন জোটবন্ধনের উপর। এক একটি স্নায়ুকোষ অন্তত ১০ হাজার অন্য স্নায়ুকোষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার ক্ষমতা ধরে। মোটামুটি যদি ধরে নেওয়া যায়, একটা পরিণত মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সংখ্যা প্রায় একশো বিলিয়ন, তাহলে চোখ বন্ধ করে একটু ভাবার চেষ্টা করুন, কী অবিশ্বাস্য স্নায়ু-জোটবন্ধনে বাঁধা থাকে আমাদের ব্রেন।

মজার ব্যাপার হল নিউরোনদের মধ্যে এই সংযোগ-সড়ক কিন্তু প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা বোঝা যাবে। ধরুন, পার্কসার্কাস থেকে চিংড়িঘাটা যাওয়ার জন্য রয়েছে একটাই উড়ালপুল। অন্য কোনও উড়ালপুল দিয়ে যাওয়া যাবে না। ব্রেনের মধ্যে থাকা স্নায়ুকোষগুলোর কিন্তু এইরকম কোনও বাধ্যবাধকতা নেই. অভিজ্ঞতা, পরিবেশ, অনুশীলনের প্রভাবে অন্যান্য স্নায়ুপথ তৈরি হতে কোনও বাধা নেই। অন্তর্নিহিত এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য-টিরিই নাম নিউরোপ্লাস্টিসিটি। অর্থাৎ ব্রেন পরিবর্তনশীল, বেশ কিছুটা স্থিতিস্থাপক। অনড়, অটল এক অচলায়তন মোটেই নয়।

https://i.makeagif.com/media/1-14-2014/YC_mGz.gif

“ব্যবহার না করলেই নষ্ট”

সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠের ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটলে, আপনাআপনিই একটা পায়ে চলা সরু রাস্তা তৈরি হয়। তারপর হঠাৎ করে ওই রাস্তায় মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেলে দেখা যায়, রাস্তাটা ঘাসে ঢেকে গেছে। যেন ওই মাঠের ওপর দিয়ে কেউ কোনোদিন হাঁটেনি। তেমনই আমরা যখন নতুন পথ ধরে এগিয়ে চলি, তখন নিউরোনগুলির মধ্যেও এক একটা নতুন সড়কপথ তৈরি হয়। তৈরি হয় স্নায়ুজোট। অথচ এই সড়কটি যে স্থায়ী হবেই, এমন গ্যারান্টি কিন্তু নেই। মোদ্দা ব্যাপারটা হল, স্থায়ী করতে হলে বারবার ওই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে। একইভাবে দাঁত মাজা, স্নান করার মতো কোনো ভালো অভ্যেস মানুষের একদিনে করায়ত্ত হয় না। দরকার পরে নিয়মিত নির্দিষ্ট পরিচর্যা ও অনুশীলনের। এইজন্যই তো বলে অনুশীলনের বিকল্প নেই। এভাবেই তো স্নায়ুর মধ্যে কোনও একটা নতুন তৈরি হওয়া স্নায়ুজোট স্থায়িত্ব পায়। তা না হলে অনভ্যাসে তার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটতে মোটেই সময় লাগে না।

“ঐক্যবদ্ধ কাজে আসে স্থায়িত্ব”

 কোনো একটা কাজের জন্য নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষগুলো একসঙ্গে যদি ক্রিয়াশীল হয়, তবেই সেই জোটবন্ধন সম্ভব, নয়তো নয়। সেটার জন্য কোনও কাজ করার সময় আপনাকেও একবগ্গা হতে হবে। আপনি চোখবন্ধ করে ধ্যান করছেন। আবার পাশাপাশি আড়চোখে মোবাইলে “হোয়াটসআপে” কোন কোন মেসেজ এলো তা খেয়াল রাখছেন বা মাঝেমধ্যে মেসেজ করে আবার ধ্যানে ফিরছেন – এমন করলে চলবে না। ধ্যান আর হোয়াটসআপ সম্পূর্ণ দুটো আলাদা কাজ। ফলে, তাদের আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট স্নায়ুপথ দুটো বিপরীতধর্মী কাজ একসঙ্গে করার চেষ্টা করছে। ফলে কোনো কাজটাই সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না। ফলে নতুন কোনো স্নায়ুপথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।

এবার প্রশ্ন, মস্তিষ্ক ব্যায়াম-এর ফলে আমাদের কি কি বিষয়ে উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে? উত্তর হলো –

  ১) স্মৃতিশক্তি,

  ২) যুক্তিবোধ,

  ৩) সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা,

  ৪) গাণিতিক উৎকর্ষ,

  ৫) মনোযোগ,

  ৬) মানসিক অস্থিরতার উপশম,

  ৭) মানসিক অবসাদ থেকে উত্তরণ

ছোট থেকেই মস্তিষ্কের এমন চর্চা করলে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিশেষ করে কৈশোরে বা পড়াশুনার সময় বেশ কিছু সমস্যার সমাধান হয়ে যায় –

  ১) এ ডি এইচ ডি : অতিরিক্ত মানসিক চাঞ্চল্যের সমস্যা,

  ২) বিভিন্ন ডিস্লেক্সিয়া ও লার্নিং ডিসঅর্ডার,

  ৩) পরীক্ষাভীতি,

  ৪) স্মৃতিশক্তির সমস্যা,

  ৫) রাগ, জেদ ইত্যাদি

 বড়দের ক্ষেত্রে :

১) টেনশনের সমস্যায়,

২) মানসিক অবসাদ,

৩) মাদকাসক্তি,

৪) রাগ প্রশমন – ইত্যাদি।

 বয়স্কদের ক্ষেত্রে :

১) অবশ্যই স্মৃতিপূণরুদ্ধার,

২) হতাশা- উদ্বেগ- অবসাদের অবসানে।

এখন দেখতে হবে মস্তিস্কচর্চার জন্য কোন কোন পদ্ধতির কথা আমরা ভাবতে পারি।

 স্মৃতিশক্তি বাড়াতে :

 স্মৃতির মূলত তিনটি অংশ –

মনোযোগ,

স্মৃতি গচ্ছিত রাখা,

স্মৃতি পুনরুদ্ধার।

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে হলে মনোযোগ বাড়াতে হবে। মনোযোগ বাড়ানোর উপায়

 ১) মন দিয়ে যা শুনছেন বা পড়ছেন, একবার জোরে জোরে আউড়ে নিন।

 ২) নিয়মিত শব্দজব্দ, সুদোকু খেলুন।

 ৩) ধাঁধার সমাধান করুন।

 ৪) রোজ খবরের কাগজ পড়ুন. সম্ভব হলে একটা নয়, একাধিক।

 ৫) সকালের পড়া খবরের মধ্যে থেকে অন্তত তিনটে শিরোনাম সন্ধেবেলায় ডায়েরিতে লিখুন।

 ৬) নিয়মিত বইপড়ার অভ্যেস করুন। অন্তত বইয়ের একটা প্যারাগ্রাফও।

 ৭) দাবা খেলুন।

 ৮) সেইসমস্ত ভিডিও গেমস খেলতে পারেন যেগুলোতে মাথা খাটাতে হচ্ছে।

 ৯) নানাভাবে মস্তিস্ককে সতর্ক করার চেষ্টা করুন।

এগুলোর সঙ্গে নানাভাবে পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে সজাগ করুন।

গন্ধ এবং স্বাদ

চেনাছকের বাইরে গিয়ে মাঝে মধ্যে নতুন নতুন রান্নার পদ চেখে দেখুন ও রান্নার ঘ্রান নিন। তাতে অর্ধভোজন হবে কিনা জানি না, কিন্তু স্বাদকোরক ও ঘ্রান-ইন্দ্রিয় সজাগ হবার ফলে আপনার মনোযোগ বাড়ার সম্ভাবনা যথেষ্টই। কিংবা অচেনা সুগন্ধির ঘ্রান পরখ করুন।

দৃশ্য

দর্শনেন্দ্রিয়কে কিছু নতুনত্ব দিতে সিনেমা দেখুন। নতুন বেড়ানোর জায়গা খুঁজে নিয়ে “দেখার” স্বাদবদল করুন। পুরোনো ফটো আলবাম খুলে স্মৃতিরোমন্থন করুন।

শব্দ

প্রতিদিন গান-বাজনা শোনার অভ্যেস করুন। রোজ কিছুক্ষন করে বাড়ির বাগানে বা ছাদে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে প্রকৃতির শব্দ শুনুন।

মাটিতে বা চেয়ার -এ পিঠ সোজা করে বসুন, চোখ বন্ধ করে শরীরের অনুভূতির দিকে মন দিন। মনকে বিভিন্ন ধরণের চিন্তা থেকে সরিয়ে আনুন।

এরপর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপরে মনোনিবেশ করুন এবং সেই অঙ্গে ঘটে যাওয়া অনুভূতির দিকে মন দিন।

প্রথমে বাঁ পায়ের আঙ্গুল দিয়ে শুরু করে ডান পায়ের আঙ্গুল, তারপর বাঁ পায়ের চেটো, তারপর ডান পায়ের চেটো।

এইভাবে হাঁটু, কোমর,বুকের ছাতি, ডান হাতের আঙ্গুল, বাঁ হাতের আঙ্গুল, চোয়াল, কপাল ও মাথার ব্রহ্মতালুর ধ্যান করুন। এইভাবে মাইন্ডফুলনেস থেরাপির বিভিন্ন এক্সারসাইজ নিয়মিত ভাবে অভ্যাস করলে মনকে দুঃশ্চিন্তা মুক্ত রাখা যায়।

যোগ

মনোনিবেশের ক্ষমতায় ব্রেনএর ভূমিকা কী ?

আধুনিক গবেষণার সূত্র ধরে আমরা জানতে পেরেছি, মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল লোবের বেশ কিছুটা জায়গা ঠিকমতো কাজ না করলে মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। সুতরাং প্রিফ্রন্টাল লোবকে উন্নত করার লক্ষ্য সামনে রেখে বেশ কিছু সাধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করলে মনোযোগ বাড়ানো দুরূহ কোনো ব্যাপার নয়।

যেমন –

১) একটা চেয়ার-এ চুপ করে বসে থাকা অভ্যেস করুন। খুব সহজ ভাবছেন, তাই তো ? কিন্তু যতটা অনায়াস ভাবছেন, আদতে কিন্তু তা নয়। শরীরের কোনো মাংসপেশিকে ( শুধু শ্বাস প্রশ্বাস ছাড়া) না নাড়িয়ে সম্পূর্ণ চুপচাপ এক জায়গায় বসে থাকা বেশ কষ্টকর। সেটাই করার চেষ্টা করুন। প্রথমে মিনিট পাঁচেক, তারপর আস্তে আস্তে বাড়িয়ে অন্তত ১৫ মিনিট।

২) চেয়ার-এ শান্তভাবে বসে ডান হাত সম্পূর্ণ প্রসারিত করে কাঁধের উচ্চতা অবধি এনে আঙুলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকুন এক মিনিট। এবার একই ভাবে বাঁদিকে।

৩) ডান হাত দিয়ে ছোট্ট জলভর্তি গ্লাস ধরে সোজা নাক বরাবর প্রসারিত করুন আর স্থির হয়ে মিনিট খানেক এক দৃষ্টিতে গ্লাসটার দিকে চোখ রাখুন। এবার বাঁ হাত বাড়িয়েও একই ব্যায়াম।

৪) চেয়ারটাকে সামনে টেনে নিয়ে একটা টেবিল-র কাছে আনুন ও দুটো হাতের কনুই ঠেকিয়ে রাখুন। এবার পর্যায়ক্রমে ডান ও বাঁ হাতের আঙ্গুলগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকুন। হাতের আঙ্গুলগুলো মুঠো করুন ও খুব আস্তে আস্তে খুলুন। সমস্ত মনোযোগ এই কাজটাতেই কেন্দ্রীভূত করুন যেন পৃথিবীতে সেই মুহূর্তে এটাই একমাত্র কাজ আপনার। দুই হাতের মুঠো খোলা ও বন্ধ করা, পালা করে, প্রথমে পাঁচবার,পরে বাড়িয়ে দশবার।

৫) যে কোনো বাগানে বা পার্কে আধঘন্টা হাঁটুন আর অনুভব করার চেষ্টা করুন কত বিভিন্ন ধরণের গন্ধ আপনার নাকে আসছে। এবার কোনো একটা বিশেষ গন্ধকে ফোকাস করুন, চেষ্টা করুন অন্যান্য গন্ধের উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করতে।

৬) শুয়ে পড়ুন আর সমস্ত মাংসপেশিকে শিথিল করে দিন। এবার শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসের দিকে ফোকাস করুন। কিভাবে প্রতিবার শ্বাসপ্রস্বাসের সঙ্গে বুক ও পেট ওঠানামা করে, নজর দিন সেই দিকে। এবার ফোকাস করুন হৃদস্পন্দনের উপর। মনে মনে কল্পনা করতে থাকুন, যেন একটা বিরাট জলাধার থেকে পাইপ বেয়ে সমস্ত দূরবর্তী অঞ্চলে জল পৌঁছনোর মতো, কিভাবে হৃদপিন্ড থেকে রক্ত নির্গত হয়ে ধমনী বেয়ে অনায়াসে পৌঁছে যাচ্ছে মাথা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে শরীরের অন্যান্য অংশ হয়ে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত। শুধু ভাবনা নয়, মনের চোখ দিয়ে সেই দৃশ্য যেন দেখতে থাকুন নিবিড় ঔৎসুক্যে।

http://images.medicaldaily.com/sites/medicaldaily.com/files/styles/headline/public/2015/04/26/yoga-benefits-relaxation.jpg

ব্রেনের আরো একটি অংশ আছে, যার নাম সেরিবেলাম। এই অংশটি শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে। কেউ কেউ বলছেন মনোযোগের সার্কিটেও সেরিবেলামের অলক্ষ্য উপস্থিতি কাজ করে। তাই শুধু ফ্রন্টাল বা প্রি-ফ্রন্টাল নয়, এই অংশটির কার্যক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে বেশ কিছু ব্যায়াম করে। এর জন্য দু’হাতে দুটো কলম বা পেন্সিল নিন। এবার দুদিকে দুটো বোর্ডের ক্লিপে আটকানো কাগজের উপর একইসঙ্গে দুদিকে দুটো বৃত্ত আঁকুন। ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজও আঁকতে পারেন। এইরকম করার পর, এবার মিলিয়ে মিশিয়ে করার চেষ্টা করুন। মানে, ডান হাত দিয়ে “গোল” করছেন তো বাঁ হাত দিয়ে ত্রিভুজ বাঁ চতুর্ভুজ- এইরকম। স্বভাবগত ভাবে আপনার ডান হাত সক্রিয় বলে হয়তো এই আঁকিবুঁকি বাঁ হাতে মোটেই জুতসই হবে না। তা হোক। দিনে কিছুক্ষন, ধরুন ১৫ মিনিট, টানা এই ব্যায়ামটা করলে, মনোযোগ, ভারসাম্য, মন, দৃষ্টি, হাত – এদের সমন্বয় সবই বাড়তে বাধ্য। শুধু বড় বয়সে নয়, ছোটদের ক্ষেত্রেও বেশ কার্যকরী হতে পারে এইধরণের ব্যায়াম।

https://s3-us-west-1.amazonaws.com/stanford.ucomm.newsms.media/wp-content/uploads/2017/03/15145109/cerebellum_feature.jpg

হাসুন

গোমড়ামুখো রামগরুড়ের ছানারা সাবধান। হাসির মতো অনন্য সাধারণ একটা সম্পদ থেকে তারা বঞ্চিত। আশ্চর্য লাগলেও সত্যি, হাসি খুব কার্যকরী একটা ব্রেনচর্চা, যার নিয়মিত ব্যবহারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। শুধু তাই নয়, হাসির ফলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে প্রবাহিত হয় এন্ডোর্ফিন। এই যৌগটি স্ট্রেস রোধ করতে দুর্দান্ত ভূমিকা নেয়। মুশকিল হল, স্বতঃস্ফূর্ত হাসির আবহ না পেলে আপনি কি করবেন? সেক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ, চোখ-কান খোলা রাখুন, আপনার চারপাশে নিত্যদিনই কিন্তু ঘটে চলেছে হরেক রকমের মজাদার ঘটনা। হয়তো খুব নজর করে খেয়াল করেননি এতদিন। এবার দেখুন, কাজ সেরে বাড়ি ফিরে সেগুলো ভাবুন, অন্যদের বলুন বা অভিনয় করে দেখান। কখন যে আপনার অজান্তে আপনার ব্রেন জবরদস্ত “জিমখানা” পেয়ে গেলো, বুঝতেই পারবেন না। মাইন্ডফুলনেস শুধু নয়, যেকোনো মেডিটেশনই মনের জন্য অনবদ্য ব্যায়াম। এ হলো সেই আতসকাঁচ যার তলায় রেখে দেখে নেওয়া যায় মনের আনাচ-কানাচ। খুঁজে বের করা যায় মস্তিষ্কের ভিতর লুকিয়ে থাকা পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো। বুঝে নেওয়া যায় সেই অংশে জন্ম নেওয়া লোভ-হিংসা-নীচতা-ক্রুরতা-দৈনতার ভার আর তার থেকে তৈরি হওয়া অস্থিরতা-অশান্তির হাত থেকে উত্তরণের পথ।

“মেডিটেশন” আবার বিজ্ঞান নাকি?

এই সংশয়ী নিন্দুকদের কাছে বিজ্ঞানের উত্তর, অবশ্যই। কেননা আমাদের অনেকগুলো ব্রেনওয়েভ বা তরঙ্গ থাকে। এগুলো মাপা হয় ইইজি করে। দেখা গিয়েছে আল্ফ়া তরঙ্গের কম্পাঙ্ক হল মনের সবচাইতে শান্ত স্তর। বিজ্ঞানসমস্ত মেডিটেশনের মাধ্যমে যে কেউ পৌঁছে যেতে পারে মনের সবচেয়ে প্রশান্ত, স্থিতধী অথচ সতর্ক অবস্থা “আল্ফ়া ব্রেনওয়েভ“-এ।


কেন করবো মনের অনুশীলন?

কারণ, এছাড়া আমাদের গতি নেই। আমরা কেমন থাকবো, তার দায় অনেকটাই, বাইরের পৃথিবীর বা আমাদের আশেপাশের পরিবেশের। আমরা অনেকটাই প্রভাবিত করতে পারি “আমার আমিকে”। এমনকি জন্মসূত্রে পাওয়া জেনেটিক গুণাবলী বা দোষ থাকা সত্ত্বেও নিজের মতো থাকা যায়। ভালো থাকার অনলস পরিচর্যায় এই “আমার আমি” পরিণত হতে পারে আরো অনেক পরিণত, ঋদ্ধ, স্থিতধী, প্রাজ্ঞ, ধীমান। জীবনশৈলী বদলের সেই কঠিন পথে মন – অনুশীলন বা স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় “ব্রেন এক্সারসাইজ ” একটা বড় পদক্ষেপ মাত্র। তার জন্য যেমন জরুরি সঠিক বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনা, উপলব্ধি, প্রত্যয় আর আশাবাদী হওয়া, তেমনিই জরুরি সেগুলির নিবিড় অনুশীলন। কাজটা কঠিন, সন্দেহ নেই, কিন্তু ভালো অভ্যেস তৈরির পথটা কবেই বা খুব সহজ ছিল? 

স্পর্শ 

চোখ বন্ধ করে মাঝে মধ্যে স্পর্শ করুন আপনার মোবাইল ফোন, ঘড়ি, চিরুনি, জলের বোতল। স্পর্শ দিয়েই বুঝতে চেষ্টা করুন কার কেমন মাপ, কেমন আকার। দুজন মিলেও একটা মজার খেলা করা যায়। একজনের চোখ বন্ধ থাকবে। অন্যজনকে পাঁচটা আলাদা জিনিস নিয়ে চোখবন্ধ করা বন্ধুর সামনে রাখতে হবে। তাকে শুধু স্পর্শ করে বলতে হবে কোনটা কি জিনিস। স্মৃতি মজবুত করতে আরো একটা কাজ করা যায়। যেমন কোনো জানা তথ্যকে মজাদার রূপে উপস্থাপন করা। এটা করা যেতে পারে –

১) ছড়া বেঁধে,

২) অনেকগুলো নাম অথবা সূত্র মনে রাখতে পারেন।

আদ্যাক্ষর নিয়ে আক্রোনিম বা মিনেমোনিক্স তৈরি করাও যেতে পারে। যেমন ধরুন, রামধনুর সাতটা রং মনে রাখতে আমরা স্মরণে রাখি ভিবজিওর শব্দটি। কোনো কিছু মনে রাখতে সেই তথ্য, পাত্র-পাত্রী বা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কোনো কিছুকে সংযোগ করানো আর সেটা মাঝে মাঝেই মনে করা –

ধারা যাক সুতপাকে আমি মনে রাখতে চাই। অতএব সুতপা, মানে ওই কোঁকড়া চুলের ওই বাচ্চা মেয়েটা। আর সেই দৃশ্য বা অবয়বের মন ছবিটা বারবার মনে করা।

সুতরাং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা একধরণের মস্তিষ্কের ব্যায়াম। শুনতে সহজ, মনে হতে পারে, এ আর এমন কি, সবাই তো পারে। নিশ্চই, পারেই তো, কিন্তু করে কে? শুধু তাই নয়, মাথায় রাখতে হবে, এই নিতান্ত সাধারণ, সহজ ব্যায়ামগুলো মর্জি-মাফিক এক-আধদিন করলে বিশেষ লাভ হবার কথাও নয়।

কি ভাবে বিভিন্ন ইন্দ্রিয়কে আরোও সজাগ করে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার উৎকর্ষ বাড়ানো যায়

শোনা

কোনও একটা ব্যস্ত রাস্তায় ফুটপাথে দাঁড়িয়ে মোবাইলের ভয়েস রেকর্ডার অন করে চারপাশের শব্দগুলো রেকর্ড করুন। পরে কোনো একটা অবসরে সেই রেকর্ড শুনে আলাদা করার চেষ্টা করুন কোনটা কিসের শব্দ। অন্য কোনোদিন অন্য কোনো একটা জায়গায়, যেমন – পার্কে বা অফিস ক্যান্টিনে একই জিনিস করুন ও সময়মতো বিভিন্ন শব্দের উৎস সন্ধান করুন।

গন্ধ

সকাল মানেই ধোঁয়া ওঠা চা আর তার নির্দিষ্ট গন্ধ। আপনি হয়তো নিজেও জানেন না, কবে থেকে আপনার ব্রেন এই অভ্যেসের পুনরাবৃত্তিতে এই গন্ধকে সকালের ওই বিশেষ সময়টির সঙ্গে একটা ডিফল্ট-মোডে গাঁটছড়া বেঁধে ফেলেছে. আর যাই হোক, চেনা গন্ধ সংবেদনবাহী স্নায়ুপথ ধরে মস্তিষ্কের নাড়াচড়া হওয়া মুশকিল, কেননা ওতে কোনো নতুনত্ত্ব নেই। কাজেই মস্তিষ্কের এই বিশেষ অংশটিতে স্নায়ুপ্রবাহ বাড়াতে হলে ব্রেনের কাছে অন্য কোনো অচেনা গন্ধ মেলে ধরুন। হালকা কিছু সুগন্ধি, লেমন বা ল্যাভেণ্ডার কিনে তার ছিপি খুলে নাকের সামনে ধরুন, আর প্রাণভরে শুঁকুন বেশকিছুক্ষন, সপ্তাহখানেক একই গন্ধ অভ্যেসের পর, অভ্যেস বদলে ফেলুন অন্য কোনো সুগন্ধিতে। ভাবছেন বোকা বোকা, কিন্তু অবাক হলেও সত্যি এটাও আপনার ব্রেনের কাছে নতুন একটা ব্যায়াম।

স্পর্শ

চোখ বন্ধ করে হাতের আঙ্গুল দিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে কয়েনগুলো বুঝতে চেষ্টা করুন, কোনটা কি কিংবা একইভাবে জামাকাপড়ের ওয়ার্ডরোব ঘেটে খুঁজে নিন পছন্দের জামাটি অথবা ধরুন, না তাকিয়ে মুখে খাবার নিয়ে ঠোঁট বা জিভ দিয়ে স্পর্শ করে অনূভব করা কোনটা কি খাবার, তার মধ্যে কি কি উপাদান আছে।

এবার এমন একটা ব্যায়াম যা দিয়ে খুঁজে নিতে পারবেন আপনার ভিতরের লুকোনো সৃষ্টিশীল সত্তাটিকে। পুরোনো কোনো বেড়ানোর ছবি বা ফ্যামিলি অ্যালবাম থেকে বের করে অন্য কোনো গ্রুপ ফটো উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখুন দেওয়ালে ক্যালেন্ডারের উপর, কিংবা আপনার রেফ্রিজারেটরের দরজায়, এবার ভাবুন ছবিটা কবেকার, কোথাকার আর ঘটনাটাই বা কি ছিল। সোজা করে রাখা ফটো চোখের সামনে এলে, অবধারিতভাবে আপনার মস্তিষ্কের বাম দিকের অংশ সক্রিয় হয়ে উঠবে আর আপনি ভাববেন ওই তো অমুক অমুক আছে ওটাতে। কেননা ব্রেনের বাঁ দিকের অংশ বেশ কেজো, যুক্তিবাদী তার এতো তলিয়ে ভাবনা চিন্তার সময় নেই। যথাযথ তথ্য সরবরাহ করেই সে খালাস, আবেগের রং মিশিয়ে কিছু ভাবতে গেলে, ছবির প্রেক্ষাপট, তার চরিত্রদের সঙ্গে মিলিয়ে যে পুরোনো ছবির গল্প, সেটা কিন্তু ব্রেনের ডান দিকের অংশের কাজ। ফটোটা উল্টে রেখে দেখা বা চেনার অভ্যেস করলে তবেই সেই আড়ালে থাকা ডান দিকের মস্তিস্ককে কাজে লাগানো সম্ভব। কে বলতে পারে, আপনার মধ্যের লুকানো শিল্পীসত্তা এইরকম কিছু “অভ্যেসের” হাত ধরে বেরিয়ে আসবে। ভাবছেন, এগুলো আবার ব্যায়াম নাকি, উঁহু, অবিশ্বাস্য লাগলেও সত্যি, এগুলো একধরণের মস্তিস্কচর্চা, লেখাপড়া, অঙ্ক কষা, পাজল সলভ করার মতোই। কেউ কেউ এগুলোকে বলেন নিউরোবিক্স। কেননা, বারংবার অনুশীলনে এই সব সাধারণ, সহজ খেলাগুলোই তৈরি করে দিতে পারে ভালো অভ্যেসের নতুন নতুন স্নায়ুপথ, নিউরোপ্লাস্টিসিটির শক্তিতে ভর করেই অনেক কম্পিউটার নির্ভর ব্রেন এক্সারসাইজ বিদেশের বাজারে বিকোচ্ছে দেদার। কিন্তু এতো দূর ভাবারই বা দরকার কি, হাতের কাছে যখন সহজলভ্য এমনই অনায়াসে করা যায় বেশ কিছু ব্যায়াম।

টেনশন এবং উত্তেজনা কমাতে মাইন্ডফুলনেস ব্যায়াম

এই ব্যায়ামগুলোর ব্যাপারে তো বলবো। কিন্তু তার আগে আমাদের ব্রেনের কোন অংশ কিভাবে কাজ করে তা বুঝে নেওয়া দরকার। সেটা বুঝতে পারলেই ব্যায়ামগুলো কিভাবে কাজ করবে তা বোঝা আরও সহজ হয়ে যাবে।

১) মস্তিষ্কের পিছনের অংশ : এই অংশটিতে জন্ম নেয় বিভিন্ন সহজাত প্রবৃত্তি.

২) মস্তিষ্কের মাঝামাঝি অংশ : এই অংশটি হলো আবেগের আঁতুরঘর।

৩) মস্তিষ্কের সামনের অংশ : যা আমাদের যুক্তি এবং বোধ সরবরাহ করে। এই অংশটির কারণেই মানুষ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের থেকে আলাদা।

মাইন্ডফুলনেসের চর্চা আদতে এই কর্টেক্স বা যুক্তিবাদী ব্রেনকে আরও উন্নত, সম্পদশালী করার ব্যায়াম। কেননা ব্রেনস্টেমে তৈরি হওয়া প্রবৃত্তিগুলি বা মিড্ ব্রেনে জন্ম নেওয়া আবেগ – কোনোটাই পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ সঠিক নাও হতে পারে। কাজেই অনিয়ন্ত্রিত আবেগ বা অপরিণামদর্শী প্রবৃত্তি আমাদের টেনে নিয়ে যেতে পারে সর্বনাশের চোরাবালিতে। সেই হাতছানিকে উপেক্ষা করে যুক্তিগ্রাহ্য, বোধসমৃদ্ধ, পরিণত ব্যবহার বা আচার-আচরণের জন্য আমাদের উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় সেই কর্টেক্সের দিকে। মননচর্চার অধিকাংশ ব্যায়ামের লক্ষ্য সেই কর্টেক্সের স্নায়ুসংবেদন বাড়ানো।

এই ব্যাপারে আজকাল মাইন্ডফুলনেসের সফল প্রয়োগ সম্পর্কে মনোবিদরা জানাচ্ছেন –

এই থেরাপির মাধ্যমে শেখানো হয় কিভাবে আমাদের মনকে কঠিন সময়ে শান্ত করা যায় ও নির্দিষ্ট কাজে ফোকাস ধরে রাখা যায়। এতে নিমগ্ন হয়ে কাজটা সময়ে শেষ করার পথ কণ্টকমুক্ত হয়ে পড়ে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে খুব সহজেই মানসিক চাপ এড়ানো যায় ও জীবনকে আনন্দময় করে তোলা যায়।


শশী ক্ষেত্রী

ব্রেনজিম এমনই এক পদ্ধতি যা সমস্ত বয়সের মানুষের শিক্ষণ দূর করে সাফল্য এনে দেয়, নিয়মিত কিছু বিশেষ অঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমে। আমেরিকার ডাঃ পল ডেনিসন ১৯৬০ সাল থেকে এমন এক শিক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা করেছিলেন যা মানুষের বিভিন্ন অক্ষমতাকে দূর করে জীবনে সাফল্য এনে দেবে। এই উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় সাফল্য পেতে তাঁর স্ত্রী গেইল ডেনিসন ওঁকে অত্যন্ত সাহায্য করেন। ১৯৮০ সালে ডাঃ ডেনিসন প্রথম ‘ব্রেনজিম আকাদেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ওই সাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্রেনজিম-এর কার্যকলাপ প্রসারিত হয়। ‘সিপ আকাদেমি‘-এর প্রতিষ্ঠাতা মি কেলভিন থ্যাম, ডাঃ ডেনিসন-এর প্রতিষ্ঠান ‘এডুকেশনাল কিনসোলজি‘-এর একজন বিশ্বস্ত ধারক। তার সুবাদেই বেনজিমকে সিপ আকাদেমিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মি কেলভিন থ্যাম-এর প্রচেষ্টাতেই আজ অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী উপকৃত হচ্ছে।

অ্যাবাকাস

অ্যাবাকাস হল বহু পুঁতিযুক্ত প্লাস্টিকের একটি যন্ত্র যা দিয়ে যে কোন গণনা করা যায়। প্রাচীন চীনে আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর আগে এর আগমন। ভারতে ২০০৩ সাল থেকে এবং কলকাতায় ২০০৫ সাল থেকে মূলত এসআইপি (সোসিএবল ইন্টেলেকচুয়াল প্রোগ্রেসিভ) আকাদেমির প্রচেষ্টায় ৫ থেকে ১২ বছর বয়সের শিক্ষার্থীদের বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটানোর এক অভিনব শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রায় ৯,৫০০ জন খুদে পড়ুয়া লাভবান হয়েছে।

https://tshop.r10s.jp/kodawari-zakka-h/cabinet/main001/227105700-r1.jpg?fitin=330:330

পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের স্টেট হেড জানকী ভেঙ্কটরমানি-র কথায় – মনোবিদ্যা ও ডাক্তারি শাস্ত্রের অদ্ভুত মিশেলে তৈরী AMAL (এক্সেলারেটেড মেন্টাল লার্নিং) পাঠ্যক্রম ৫-৭ বছর বয়সের জন্য এবং খেলাচ্ছলে জটিল রাশিবিদ্যার সরল সংস্করণ হল ‘সিপ অ্যাবাকাস ও ব্রেনজিম’ – ৭-১২ বছর বয়সের জন্য।

দুটি শিক্ষা প্রণালীই শৈশব থেকে কিশোর অবস্থায় যাওয়ার পথে ডান ও বাম মস্তিষ্কের সামঞ্জস্য সাধন করে। সাধারণভাবে আমরা যারা ডানহাতি, তারা বাম মস্তিষ্ক ব্যবহার করি এবং বাঁ-হাতিদের ক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত।

অ্যাবাকাস ব্যবহার আমাদের সৃজনশীল মস্তিষ্ককে সচল করে, তাই সংখ্যাকে ছবি রূপে কল্পনা করে বহু কঠিন অঙ্কের সহজ সমাধান পায় শিশুরা। অ্যাবাকাস কোর্সের সম্পূর্ণ সময়কালে মোট ২৬টি বেনজিম শেখানো হয়। যার মধ্যে কিছু শ্রবণক্ষমতা বৃদ্ধি, মনঃসংযোগ বৃদ্ধি, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। 

থিঙ্কিং ক্যাপ

থিঙ্কিং ক্যাপ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্রেনজিম যা বাচ্চাদের শ্রবণ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিতে কান ধরে টানতে হয় ফলে কানের পর্দা বৃদ্ধি পায়। শ্রবণক্ষমতার সঙ্গে মনঃসংযোগ সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। সুতরাং শ্রবণক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেই মনঃসংযোগ ক্ষমতা পারস্পরিকভাবে বৃদ্ধি পায়।

https://eltcation.files.wordpress.com/2015/08/230px-thinking-cap-clip-art-68869.gif?w=205&h=300

লেজি ৮

ব্রেনজিম-এর মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি হল ‘লেজি ৮‘, যা একাগ্রতা বৃদ্ধি করে এবং অনান্য শিক্ষণ অক্ষমতাও দূর করতে অত্যন্ত সাহায্য করে। এই পদ্ধতিতে বুড়ো আঙুলকে চোখের সামনা সামনি রেখে একটি মধ্যরেখা কল্পনা করতে হয়। তারপর সেই কাল্পনিক রেখার ডানদিক ও বামদিকে হাত ঘুড়িয়ে ইংরেজীর ‘৮’ বা  বাংলা ‘৪’-এর আকৃতি তৈরী করতে হয়। ফলে প্রত্যেকবার আঙুলটি কাল্পনিক মধ্যরেখাটি স্পর্শ করে যায়।

https://encrypted-tbn0.gstatic.com/images?q=tbn:ANd9GcTx8eSev_sye4GyO2YFDL_XNtwsWUav3Omu_jIKM4Ij71YHpGA1HQ


  • ডাঃ কামাল হোসেন (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) – যোগাযোগ – ৯৮৩০০২৮২৩৬
  • ডাঃ দেবাঞ্জন পান (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) – যোগাযোগ – ৯৮৩০৫৪৪৪৭০
  • অনুভব মৈত্র (মনোবিদ)
  • শশী ক্ষেত্রী (মাস্টার ট্রেনার ও সেন্টার হেড সিপ অ্যাবাকাস) – যোগাযোগ – ৯৮৩০৭৮০৮৬৬

রচনাটি অংশ বিশেষে সাপ্তাহিক বর্তমান, ৮ এপ্রিল ২০১৭ সংখ্যা থেকে সংগৃহীত। হোমরোম এই পত্রিকার অনুরাগী পাঠক। পাঠকের অ্যান্ড্রেড মুঠিতে পৌঁছে দেওয়াই হোমরোম-এর উদ্যেশ্য। 

 

2 thoughts on “মস্তিষ্ক কিভাবে সতেজ রাখবেন (Brain Gym) জানাচ্ছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *