Cellphone Manners – belles-letters – by Aninda Chattyopadhya

Cellphone Manners - belles-letters - Aninda Chattyopadhya

মুঠোফোন ও ভদ্রতা

একটি রম্যরচনা

সব কাকেদের এক কাসুন্দি – হাতে রয়েছে সেলফোন। জগৎসংসারে আর কিছুকে এত আপন করে আঁকড়ে ধরেনি বাঙালি কখনও। আর কারওর সঙ্গে এত সময় কাটায়নি। চেয়েও কি দেখেছে এমন করে, যেমন করে সে চেয়েছে তার এলইডি স্ক্রিনে?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়

‘সাত দু’গুণে চোদ্দোর নামে চার, হাতে রইলো পেনসিল।’ কাকেশ্বরকে এখন অবশ্য বলাই যায় – ‘হয়নি হয়নি ফেল।’ এখন কার যাতে আর পেনসিল থাকে ভাই, দাঁড়কাক, পাতিকাক, কুলীনবংশীয় বায়স – সব কাকেদের এক কাসুন্দি – হাতে রয়েছে সেলফোন। জগৎসংসারে আর কিছুকে এত আপন করে আঁকড়ে ধরেনই বাঙালি কখনও। আর কারওর সঙ্গে এত সময় কাটায়নি। চেয়েও কি দেখেছে এমন করে, যেমন করে সে চেয়েছে তার এলইডি স্ক্রিনে? সেলফোন এখন তার অন্তরাত্মা, মোবাইল এখন তার ম্যানারিজ্‌ম।

হুস করে যেমন কাক তাড়ায়, তেমন হুঁশ ফেরাতে কিছু মবাইল-ম্যানার্সমন্ত্র।

  • চেল্লাবেন না। পাবলিক প্লেস-এ কিংবা বাথরুমে উন্মাদের মত চেঁচিয়ে কথা বলবেন না। মনে রাখবেন, ফোন ব্যাপারটা আবিষ্কার হয়েছিল এইজন্য, যাতে দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়। উল্টোদিকের লোকটি ভদ্রভাবে কথা বললেই শুনতে পাবেন, আপনার গলার জোরে নয়।
  • এটা ঠিক, সংবিধান প্রণীত কথা বলার অধিকার আমাদের প্রথম দিয়েছে সেলফোন। কোম্পানিরা দিয়েছে অফুরান অফার। তার মানে এই নয়, সারাদিন আপানাকে কানে ঠুলি গুঁজে বাকতাল্লা করতে হবে। আপনার অদরকারের গল্পগাছা যেন অন্যের বিরক্তি না বাড়ায়।
  • ফ্লন্ট করবেন না একদম। যতটুকু ব্যস্ততা আপনার রয়েছে, পাশের লোককে শুনিয়ে তাকে তিন দিয়ে গুন করবেন না । মনে রাখবেন, আপনি কোম্পানির টাই-পরা চাকর বিশেষ, বেশি ইংরেজি ঝেড়ে স্ট্র্যাটেজি প্ল্যানিং-এঁর নামে নিজের গুরুত্ব বাড়াবেন না ট্রেনে বা বাসে। আপনি তো আর আর্কিমিডিস ন্ন যে, ‘ইউরেকা’ বলে চৌবাচ্চা থেকে লাফ মারবেন, চারটে ভুল ছাড়া আর কিছুই আবিষ্কার করেননি নিজের জীবনে, ফলে ফোন কানে অত উত্তেজনার কিছু নেই, ভাই!
  • বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ঠান্ডা রাখতে মোবাইল হাতে তুলে দেবেন না। ওতে আপনার সাময়িক শান্তি হলেও, সভ্যতার অশান্তি ভবিষ্যতে বাড়বে।
  • হটেল, রেস্তোরাঁ, কফি শপ-এ সেলফোন ব্যবহার করা উচিত নয়। গুরুত্বপূর্ণ কোন কল হলে ওখান থেকে বেরিয়ে কথা বলুন। বাকি মানুষদের শান্তিতে থাকতে দিন।
  • পারিবারিক বা নিকট বন্ধুদের আড্ডায় সেলফোন কাছে না রাখা ভাল। নিখাদ আড্ডার অন্তরঙ্গতা সবসময়ই মোবাইল ভেঙে চৌচির করে দেয়।পরিবারের যে মানুষরা এই ফোন ব্যবহারে সড়োগড়ো নন, চেষ্টা করুন তাঁদের সামনে ফণীভূষণ না সাজতে।
  • যে কোন গেট টুগেদার-এ মোবাইল পার্কিং এখন ভীষণভাবে জরুরী। গাড়ী পার্কিং-এর মতোই, মোবাইল পার্কিং লট তৈরী করুন বাড়ীতে।
  • কারওর সঙ্গে মুখোমুখি হতে চান না বলে কিংবা নিজের সঙ্গে একা থাকবেন বলে, বালির মধ্যে মুখ গোঁজা বন্ধ করুন। একাংশ মানুষের উপস্থিতি অগ্রাহ্য ফোনের দিকে আপনার ঠায় চেয়ে থাকা, অপমানিত করে সহযোগীদের। এ অভ্যেসে মানুষের মাথা হেঁট হয়।
  • সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করার সময় বেঁধে নিন। দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় তার জন্য থাক। কিন্তু আপনার গাড়ীর সঙ্গে নিজের ফোটোর পিছনে ক’টা লোক বুড়ো আঙ্গুল ধ্যাবড়াচ্ছে, প্রহরে প্রহরে সেই খুচুর-খুচুর দেখার হ্যাবিট দৃষ্টিকটু।
  • কলার টিউন আস্তে রাখবেন। আপনার পছন্দের গানটি প্রতিটি কল-এ তারস্বরে বাজিয়ে লোককে মনোরঞ্জন বা উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা না করাই ভাল।
  • মোবাইল কোথায় রাখছেন সে ব্যাপারে সিওর হন। ফোন বাজলেই বডির বিভিন্ন অঙ্গ চাপড়ে চাপড়ে ফোন খোঁজার চেষ্টা করবেন না। আপনার পকেট হয়তো বা অনেক বেশি, কিন্তু বাকি লোকেদের ধৈর্য অতটা নয়।
  • বাড়িতে ফিরলে ল্যান্ডলাইন ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষই তাই করে। সেলফোন তৈরী হয়েছে বাইরে ফোন করার সুবিধার জন্য, বাড়ী ফিরে সেটিকে ও নিজেকে একটু রেস্ট দিন, প্লিজ।
  • ফোন ঘষে ঘষে হাতের সব রেখা তুলে না ফেলে পাশের মানুষের জন্য হাত বাড়ান। একটা হাতে মোবাইল আছে বলে নিজেকে ফিফ্‌টি পারসেন্ট অকেজো করে তুলবেন না।
  • সেলফোন একটা যন্ত্রমাত্র। যেমন, ক্যালকুলেটর, ডিজিটাল ক্যামেরা। টেকনোলজির উন্মাদনায় উন্মার্গগামী হয়ে উঠবেন না। প্লিজ মনে রাখবেন, আপনার ফোন ব্যবহারই আপনার পরিচয়।

আর হ্যাঁ, বলতে ভুলে গিয়েছি, যাঁরা যাঁরা রোজ সকালে গুড মর্নিং, তারা মা-র মহিমা,  জ্ঞানের বাণী ও অশ্লীল জোক্‌স নিয়ম করে পাঠাচ্ছেন, আমার চার্জার দিয়ে তাঁদের সেলফোনের মাথায় গদাম করে মারব, এই বলে দিলাম। 


বৃহৎ পাঠকের জন্য সংগৃহীত। সমস্ত কৃতিত্বে প্রতিদিন ‘রোববার’ ।  HomeRoam অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের অনুরাগী। যেকোনো রকম আপত্তিতে সংগ্রহটি শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে নেওয়া হবে।

প্রচ্ছদ চিত্রণঃ বিল্টু দে

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *