GST OVERVIEW, LEVY, RATE, others – Dipak Ranjan Bhattyachariya

GST OVERVIEW, LEVY, RATE, others

Law-বঙ্গ-law-টীকা

দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

পঞ্চম পর্ব

‘যে-সব সরকারি সংস্থা টিডিএস কাটবে, তাদের রেজিস্ট্রেশন নিতেই হবে। যাদের টিডিএস কাটবার ঝক্কি নেই, তারা পাবে ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার’ – জানাচ্ছেন তিস্তা চৌধুরী, ফাইনান্সিয়াল ডিটেকটিভ

লেখক তার তিস্তা চৌধুরী, ফাইনান্সিয়াল ডিটেকটিভ – এর মধ্যস্থতায় খুব প্রাঞ্জল ভাষায় জিএসটি-র নিরস জটিল ত্তত্ত্ব পেশ করছেন। এমন প্রবন্ধ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য-ও সহজ গ্রাহ্য।

উজ্জ্বল ঐন্দ্রিলা সঞ্জয় বিতানদের যত দেখে অবাক হয়ে যায় তিস্তা। অফিসে তো খুনসুটি লেগেই আছে। অলোকদার হয়তো একটু ঢুলুনি এসেছে, ব্যাস্‌, একটা ছবি উঠে গেল। সঞ্জয়ের ঘাড়ে ‘ ভেরিফায়েড’ স্ট্যাম্প লাগানো। কেউ একটু ফেসবুক করছে হয়তো, যায় কোথায়, সঙ্গে সঙ্গে ক্লিক! শুধু তীর্থর শান্ত ব্যক্তিত্বকে ওরা একটু সমঝে চলে। এইখানে কিন্তু, এতজনের মধ্যে কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপ করে খাতায় নোট করছে, মন দিয়ে শুনছে সমস্তটা। পরে সময়মতো জিজ্ঞেস করবে হয়তো। ওদের জন্য গর্ব হয় তিস্তার।

GST OVERVIEW, LEVY, RATE & OTHERS

একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিল তিস্তা, এইসময় একজন প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা ম্যাম, ভ্যাট বা সারভিস ট্যাক্স কি থাকবে,না উঠে যাবে’?

– আপনার নাম-টা প্লিজ? তিস্তা জিজ্ঞেস করে। ঐন্দ্রিলা এদিকে ভাবে, এইসব প্রশ্নের আড়ালে দিদিভাই আসলে নিজেকে রিবুট করে নেয়। গুছিয়ে নেয়। টেস্টে ব্যাট করতে নেমে ঝড়ো বোলিংয়ের সামনে যেমন নামি ব্যাটস্‌ম্যান নিজের ছন্দ খুঁজে পেতে কিছুক্ষণ ভি-এর মধ্যে খেলে, এও অনেকটা তেমন।

সঞ্জীব ঘোষাল, ভদ্রলোক জানান। তিস্তা বলে, ‘সঞ্জীববাবু একটা দামি কথা তুলেছেন, সেটা হল জি এস টি এলে কোন করগুলো থাকবে, কোনগুলো থাকবে না। এবার একটু তাকান তো এই স্লাইড-টার দিকে’। তারপর নির্দিষ্ট একটা স্লাইডে গিয়ে নীল একটা আলোর ফুটকি লেখাগুলোর ওপর ফেলতে ফেলতে তিস্তা বলে চলে, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের ৮ ধরনের ট্যাক্স উঠে যাবে। যার মধ্যে আছে সেন্ট্রাল এক্সাইজ, সারভিস ট্যাক্স এইগুলো। আর রাজ্য সরকারের ৯ রকমের ট্যাক্স উঠে যাবে, যার মধ্যে আছে ভ্যাট, সেন্ট্রাল সেলস ট্যাক্স, এন্ট্রি ট্যাক্স, পারচেস ট্যাক্স, লটারির ওপর ট্যাক্স, এইসব’

তাহলে আর বাইরে থাকল কী, সবই তো চলে এল, সেক্রেটারি অতনু মাহাত বলেন।

-পেট্রল, ডিজেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, ইলেকট্রিক, অনেকে যে উষ্ণ-পানীয় সেবন করেন, সেগুলো আপাতত জি এস টি-র আওতার বাইরে, তিস্তা জানায়।

হলের ভেতর আবার একটা চাপা ফিশফিশ শোনা যায়। কেউ কেউ শিশুর মতো এ-ওর গায়ে ঢলে প’ড়ে হাসতে লাগে। একজন বলে ওঠে, ‘ম্যাম, সরকার বড়ো দয়ালু। আমাদের দুঃখ বুঝে দরকারি জিনিসগুলোতে ছাড় দিয়েছে। সকালে বাইকের পেট্রল, বিকেলে শরীরের পেট্রল, সাধু সাধু’, যেন একটা ট্রফি জিতেছেন এইভাবে গোড়ালি একটু তুলে হাত উঁচু করে ভদ্রলোক ঘুরে ঘুরে সাধুবাদ জানাতে থাকেন। ‘কী করছেন আপনারা’, চিত্তবাবু একটা চাপা ধমক দিতেই সবাই নিজের জায়গায় আবার বসে পড়ে। তাকে যে সবাই বেশ মেনে চলে, সেটা বোঝা যায়।

-ভদ্রলোকের কাণ্ড দেখে তিস্তাও হাসি চাপতে পারে না। এরা কি স্কুলপড়ুয়া আর সে কি দিদিমণি, যে শাসন করবে? মনিটর হতে মন চায় না আজ তিস্তার। আর সে নিজেই তো আজ রাশ আলগা করেছে।  একটু অপেক্ষা করে তিস্তা। ভদ্রলোকের উৎসাহ খানিক থিতিয়ে এলে সবার দিকে আবার তাকিয়ে বলে, ‘বিটুইন দ্য লাইন্‌স বলে একটা কথা আছে না ? দুটো লাইনের মাঝখানে অদৃশ্য যা লেখা থাকে চলুন আমরা  পেশাদাররা সেটা পড়ে ফেলি। এইগুলোকে জি এস টি-র আওতার বাইরে রাখা হল কেন ভেবে দেখি। আপাতত রাজ্য সরকারগুলোকে ইচ্ছেমতো ভ্যাট আদায় করার সুযোগ করে দেওয়াই কি এর উদ্দেশ্য? কী বলেন আপনারা?

‘ক্যাশ কাউ ক্যাশ কাউ’, কে যেন কোণ থেকে মিনমিন করে ওঠে। একজন বলেন, তাহলে বিড়ি সিগারেট-ও কি একইভাবে জি এস টি-র আওতার বাইরে থাকবে?

-‘না। বিড়ি সিগারেট বা তামাক থেকে তৈরি অন্যান্য নেশার জিনিসে যেমন তেমনি অনেক বিলাসবহুল জিনিসপত্রেও সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স তো লাগানো হবেই, তার ওপরেও আদায় করা হবে সেস। সেসের টাকা থেকেই রাজ্যগুলোকে ভর্তুকি দেওয়া হবে বলে সবাই ভাবছেন’।

-আচ্ছা ম্যাম, জি এস টি-তে কি করের হার একটাই থাকবে?

-না না। একদম না। বলতে গেলে ৬ রকম করের হার থাকবে। সরকারি ঘোষণা মতে অবশ্য ৪ রকম।চাল ডাল এইসবে করের হার হল ০%। ০% করের হার কেন বলছি, কেন আমার খাতা থেকে ওটা বাদ দিয়ে দিচ্ছিনা, তার কিন্তু একটা রহস্য আছে। সেটা সময়মতো বলব।আচ্ছা, এবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন সাবান ইত্যাদিতে করের হার হচ্ছে ৫%। এছাড়াও আরও তিনটে হার আছে – ১২%, ১৮% আর ২৮%। তার ওপরে দুয়েকটা জিনিসে বাড়তি বসবে সেস। শোনা যাচ্ছে সেসের হার ১৫% হবে।উত্তর দিতে দিতেই তিস্তা দেখে চিত্তবাবু মাথা নীচু করে বসে আছেন। কী যেন ভাবছেন। তিস্তা গলা একটু তুলে হঠাৎ বলে ওঠে, ‘মিঃ সিং দেও, আপনি কি রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র’?

খানিকটা হকচকিয়ে যান চিত্তবাবু, ‘হ্যাঁ ম্যাম। আপনি জানলেন কী করে’? তিস্তা আবারও জিজ্ঞেস করে, ‘ আপনি পঞ্চকোটের রাজবাড়ির ছেলে?  রাজাবাহাদুর জ্যোতিপ্রসাদ সিং দেও আপনার কেউ হন’?পঞ্চকোটের রাজবাড়ির ছেলে?  রাজাবাহাদুর জ্যোতিপ্রসাদ সিং দেও আপনার কেউ হন’?

http://www.indianrajputs.com/i/t/i/thumb800_panchkot-Raja-Jyoti-Prasad-Singh-Deo-of-Panchkote-Raj-1.jpg
মহারাজা জ্যোতিপ্রসাদ সিং দেও

আবেগে, বংশগৌরবে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ান চিত্তবাবু, ‘তিনি আমার আপন ঠাকুরদাদা

-নামের মাঝখানের ‘প্রসাদ’-টা কোথায় লুকোলেন মিঃ সিং দেও?

-‘ওটা বাই-ডিফল্ট চিত্তদার নামের মাঝখানে আছে ম্যাডাম। অ্যাপেন্ডিক্সের মতো, দেখা যায় না’! তালপাতার সেপাই এক মেম্বার এক মুখ হেসে জবাব দিল।

-আঃ, থামো কেষ্ট, ভদ্রলোককে এক দাবড়ানি দেন মিঃ সিং দেও। ‘কিন্তু ম্যাম,মিঃ মাহাত কি আপনাকে এসব কিছু বলেছেন? এত কথা আপনি জানলেন কী করে’, খানিকটা অবাক হয়ে চিত্তবাবু জানতে চান।

তিস্তা বলে, পুরুলিয়া আসছি আর রাজাবাহাদুর জ্যোতিপ্রসাদ-এর মতো এমন একজন বিদ্যোৎসাহী মানুষের কথা জানব না, তা কি হয়? একশো বছর আগে একটা ছাপাখানা খুলে নানান বই ছাপানোর উদ্যোগ নেন তিনি। সারস্বত সমাজের প্রতিষ্ঠা করেন। শাস্ত্রীয় গানবাজনা ছাড়াও যাত্রা নাটক সাহিত্যচর্চা, সব কিছুর চর্চা হতো সেখানে। ঠিক বলছি তো ? আপনার নামে ‘প্রসাদ’ না থাকায় প্রথমটা একটু বিপদে পড়েছিলাম। তবু, নিছক অনুমানের ভরেই…’। কথাটা শেষ করেনা তিস্তা। চিত্তপ্রসাদ একটু ইতস্তত করে বলেন, ‘সে নয় হল। কিন্তু আমার স্কুলিং আপনি জানলেন কী করে’? তিস্তা হাসিমুখে বলে, ‘স্কুল থেকে বেরোলেই কি স্কুলিং মুছে যায় মিঃ সিং দেও? আমি দেখলাম আপনার হাত দুটো বুকের কাছে উঁচু করে জড়ানো। তখনি স্বামী বিবেকানন্দের আমেরিকায় বক্তৃতা দেবার সেই চেনা ছবিটা মাথায় এসে গেল। আর সেখান থেকেই রামকৃষ্ণ মিশনের কথা। পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের কথা তো সবাই জানেন’। ভীষণ অবাক হয়েছেন এই প্রৌঢ় সুদর্শন মানুষটা। তিস্তা ফের তাকে জিজ্ঞেস করে,‘ জি এস টি নিয়ে কিছু বলতেন আমায় মিঃ সিং দেও’?

আবারও চমকে ওঠেন চিত্তবাবু। তারপর কিছুটা সামলে নিয়ে বলেন, ‘ম্যাম, তখন যে ছো-মুখোশের নিয়ে কথা হল, আমরা সবাই খুব মন দিয়ে শুনেছি। তাতে কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার হল না। এখন যেভাবে ভ্যাট আদায় করে জমা করা হয়, সেখানেও তো একই ভাবে লাভের অংশটুকুর ওপর ট্যাক্স দিতে হয়। ওই একই উদাহরণ ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্সে, মানে ভ্যাট-এও দেওয়া যেত। তাহলে জি এস টি-র নতুনত্বটা কী? দুটোই হরে দরে এক, তাই না’?  

http://www.anandabazar.com/polopoly_fs/1.450926.1470484784!/image/image.jpg
ছো-মুখোশ

– একেবারেই না। ভ্যাট আর জি এস টি-তে ফারাক কিন্তু আসমান-জমিন। কেন সেটা বোঝা যাচ্ছে না জানেন মিঃ সিং দেও ? আমরা শুধু কাঁচামালে দেওয়া ট্যাক্সটা বিক্রির সময় ছাড় পাচ্ছি কি না, সেটুকুই খেয়াল রাখছি। আচ্ছা বেশ, আমি একটু চেষ্টা করে দেখি তো তফাতটা বোঝানো যায় কি না। অতনুবাবু যে ছৌ-নাচের মুখোশ বিক্রির উদাহরণটা এনেছিলেন, তাতে কখন ট্যাক্স হচ্ছিল বলুন দেখি ?

-কেন, বিক্রি করার সময়?

– বিক্রি কখন হয় বলুন তো? মালিকানা আর দায় যখনই বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতার কাছে চলে যায়, আমরা বলতে পারি বিক্রি হয়ে গেল। এমনও হতে পারে, বিক্রি হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু হাত বদল হল না। সেটা হয়তো হল বিক্রির পরে কোনো একটা সময়। 

-একটু ভেঙে বলুন ম্যাম, সিং দেও বলেন।

-অফিস থেকে ফিরছেন কেউ। মাজন বিস্কুট এইসব কেনবার একটা লম্বা ফর্দ নিয়ে স্টেশনারি দোকানে ঢুকলেন। কেনাকাটা হল। টাকা মেটানো হল। জিনিসগুলো গুছোতে গিয়ে দেখেন, জিনিসপত্র নেবার ব্যাগটাই আনতে ভুলে গেছেন। দোকানিকে তিনি বললেন, মালগুলো একটু সরিয়ে রাখবে? কাল নিয়ে যাব। হাত বদল হল না। যেখানকার জিনিস সেখানেই রয়ে গেল। কিন্তু মালিকানা বদল হয়ে গেল। মানে বিক্রি হয়ে গেল। ভ্যাট-এ এইভাবে বিক্রি করবার সময় ট্যাক্স হচ্ছে।  

-হ্যাঁ ম্যাডাম, আসলে মাঝেমাঝে খেয়াল থাকে না।

-তিস্তা বলতে থাকে, ‘এবার বলুন তো, এক্সাইজ ডিউটি কখন দিতে হয়? কোনো একটা জিনিসের নাম বলুন যাতে এক্সাইজ লাগে’?

একজন বলেন, ‘ম্যাডাম, আমি একটা কোম্পানি জানতাম যারা আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করতো। ওদের এক্সাইজ দিতে হতো। আর একজন তখন বলেন, ‘কেন, স্টিল? তার ওপরও তো এক্সাইজ হয়’?

তিস্তা বলে, ‘ সকালে চায়ের সঙ্গে আপনারা বিস্কিট খান না? সেটাও তো এক্সাইজের কবলে! ঘুম থেকে উঠে ঘুমোতে যাবার আগে পর্যন্ত যেসব জিনিস আমরা ব্যবহার করি, যেগুলো কারখানায় তৈরি হয়, তার বেশিরভাগটাতেই এক্সাইজ লাগে, খুব ছোটোখাটো ব্যবসা বাদ দিলে। আপনারা দুজনেই ঠিক বলেছেন। আপনার নামটা একবার বলুন’?

যিনি আয়ুর্বেদিক ওষুধের কথা বলছিলেন, তিনি তার নাম জানালেন, সাধন প্রামাণিক। তিস্তা বলে, ‘ মিঃ প্রামাণিক, সেই ওষুধ তৈরির কারখানায় কখন এক্সাইজ দিতে হতো, জানেন কিছু? সাধনবাবু বললেন, ‘ম্যাডাম, মাল তৈরি হল তো? এবার ট্যাক্স না দিয়ে কারখানা থেকে সেটা বের করাই যাবে না। এক্সাইজ ইন্সপেক্টর এসে দেখলেন কত মাল তৈরি হয়েছে, ট্যাক্সের হিসেব মেলালেন ঠিক আছে কি না, তারপরে ট্যাক্স দেওয়া হল, তবে বিক্রির কথা’।

তিস্তা বলে, ‘প্রায় ঠিক বলেছেন। তাহলে এক্সাইজে ট্যাক্স নেওয়া হল তৈরির সময়, তাই তো? ভ্যাট-এ ট্যাক্স ছিল বিক্রির সময়। সারভিস ট্যাক্সে কখন ট্যাক্স হয় বলুন দেখি কেউ’, হলের জমায়েতের দিকে তাকিয়ে জানতে চায় সে।

চিত্তবাবুই বললেন, আমার একজন মক্কেল আছে ম্যাম। ওরা সার্ভে করে ম্যাপ তৈরি করে। সারভিস ট্যাক্স আছে ওদের। ধরুন ম্যাম, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা রেললাইন যাবে। এখন সেই জায়গাটার সার্ভে করতে হবে, ম্যাপ তৈরি করতে হবে,ডিসাইন করতে হবে, এইসব নানান কাজ। এই সব কাজ শেষ হলে রেলকে বিল দেওয়া হল। তখন আমার মক্কেলকেও সারভিস ট্যাক্স দিতে হয়।

তিস্তা সবার দিকে তাকিয়ে বলে,‘বেশিটাই বলে দিয়েছেন মিঃ সিং দেও।ওর কথার সঙ্গে আরও দুটো-একটা কথা হয়তো যোগ করা যেত, আজ আর বলছি না। আজ আমি সমস্ত কথা বলব জি এস টি-কে নিয়ে।

একজন একটু টিটকিরি কাটার মতো করে বলে, ‘কোথায় শুধু জি এস টি নিয়ে কথা হচ্ছে? এই তো এক্সাইজ, ভ্যাট, সারভিস ট্যাক্স এইসব নিয়ে আপনি নিজেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে যত প্রশ্ন করছেন। ওইসব বাতিল ট্যাক্সগুলো জেনে আজ আমাদের লাভ কী’ ?

তিস্তা একবার ভদ্রলোকের দিকে তাকায়। ব্যাস্‌। কোনো উত্তর দেয় না সে। আবার চিত্তবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘যে কথা বলছিলাম, আপনারাই বললেন, এখন যে ট্যাক্সগুলো আছে তার কোনোটা তৈরির সময়, কোনোটা বিক্রির সময়, কোনোটা আবার পরিষেবা দেওয়া শেষ হলে তবে ট্যাক্স হয়। এই জায়গাটায় মোটামুটি সবাই একমত তো?

সবাই এক সঙ্গে সাড়া দিয়ে ওঠে। তিস্তা এবার বলে, ‘কিন্তু, জি এস টি-তে এই সবকটাতেই ট্যাক্স হবে সরবরাহের সময়। হাত বদলের সময়। ট্যাক্স হবার মুহূর্তটা বদলে গেল। এইটাই সবচেয়ে বড়ো কথা।

-তাতে কী-এমন তফাৎ হবে? একজন জিজ্ঞেস করেন।

-আচ্ছা,  দোকানে ফর্দ নিয়ে মাল কিনতে যাবার উদাহরণটা আর একবার ভেবে দেখুন। টাকা পয়সা দিয়ে বিল মিটিয়ে দিলেও মাল আপনি পরের দিন নেবেন বলেছেন। ধরে নিন দোকানটা বিহারের সীমানায় আর আপনার বাড়িটা পশ্চিমবঙ্গে। ভ্যাট চালু থাকলে ট্যাক্স কে পাবে?

সবাই বলে ওঠে, বিহার।

-কেন?

-কেননা, মালিকানা বদল হয়েছে দোকানেই। আর মালিকানা বদলের সময়েই ভ্যাট হয়। হই হই করে অনেকে একসঙ্গে বলে ওঠে।  

– তিস্তা সত্যিই এবার খুব খুশি হয়। বলে, বাহ্‌, আপনারা তো শিখেই গেছেন দেখছি! এবার বলুন দেখি, জি এস টি এলে ট্যাক্স কে পাবে?

সবাই কেমন চুপ হয়ে যায়। দুএকজন এটা বলে তো ক’জন বলে অন্যটা। তিস্তাই বলে দেয় তখন, পশ্চিমবঙ্গ। অনেকে জিজ্ঞেস করে, ‘কেন’?

-কেননা হাত বদল হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। আর হাত বদলের সময়েই জি এস টি হয়, একটু আগেই বলেছি।

-তাই তো ম্যাডাম!  

-ভাবুন তো, মালিকানা বদলের জায়গায় হাত বদলে ট্যাক্সের ব্যাপারটা চলে আসতেই কী কাণ্ড ! কার ট্যাক্স পাবার ছিল, কে পেল ! একজন আবার ভিড়ের মধ্যে মাথা নামিয়ে ফোড়ন দেয়, ‘ঘোর কলি। কারো পৌষমাস, কারো সর্বনাশ’।

তখন চিত্তবাবু বলেন, ‘ম্যাম, তাহলে এটা তো ঠিক, জিনিসটা যেখানে ডেলিভারি করা হবে ট্যাক্স সেখানেই দিতে হবে’?

তিস্তা যেন আন্দাজ করতে পারে চিত্তবাবুর পরের প্রশ্নটা। যেন দাবায় ফিরতি একটা চাল দিচ্ছেন তিনি। হেসে  তিস্তা বলে, ‘একদম ঠিক বলেছেন। কিন্তু আপনি বোধহয় আরও কিছু বলতে চান, তাই না’?

-হ্যাঁ ম্যাম। যদি একটা জিনিস যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানেই ট্যাক্স হয়, তাহলে সেখানকার রাজ্য সরকারের তো জি এস টি চালু করতে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়’?

-সবার জন্য একটু বুঝিয়ে বলুন তো মিঃ সিং দেও? তিস্তা বলে।

-দেখুন ম্যাম, খবরে পড়েছি পশ্চিমবঙ্গের থেকে  তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র কিংবা গুজরাতে মাল তৈরি হয় বেশি। আমাদের রাজ্যে আবার জিনিস কেনাকাটা হয় বেশি। আমাদের তাহলে তো ট্যাক্স কালেকশন বেড়ে যাবার কথা’?

– তাই তো। তামিলনাড়ু সরকারের যা হিসেব, তাতে শুধু সেন্ট্রাল সেলস-ট্যাক্স উঠে যাওয়াতেই বছরে ওদের লোকসান ৩৫০০ কোটি। অকট্রয় উঠে যাওয়াতে মহারাষ্ট্রের কত লোকসান, জানেন? ১৪,০০০ কোটি। ভাবুন একবার। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ মূলত ব্যবহারকারী রাজ্য অর্থাৎ কনসিউমিং স্টেট, আমাদের রেভিন্যু অনেক বেড়ে যাবার কথা।

-‘আমাদের রাজ্যের আপত্তির মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারি না’, চিত্তবাবু নিজের মনেই বিড়বিড় করে ওঠেন।

এবার সেই ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ান যিনি একটু খারাপভাবে কথা বলেছিলেন। মুখটা ছোট্ট করে বলেন,  ‘ম্যাডাম, আমি ভীষণভাবে দুঃখিত। এখন আমি বুঝতে পারছি, ট্যাক্সিং ইন্সিডেন্স যে সেল বা মানুফাকচার বা প্রভিসন অফ সারভিস থেকে সাপ্লাইয়ের দিকে সরে এসেছে, যার ফলে রাজ্য সরকারগুলোর কর আদায়ের হিসেবপত্র একেবারে ওলটপালট হয়ে গেছে, সেটা বোঝাতেই আপনি আগের করগুলোর প্রসঙ্গে বলছিলেন’।

লোকটাকে দিয়ে ওর ভুল স্বীকার করিয়ে ছেড়েছে দিদিভাই, ঐন্দ্রিলা ভাবে। তিস্তাকে চেনে ওরা। ভদ্রলোক যখন ওইভাবে কথা বলছিলেন, ওদের ভারি রাগ হচ্ছিল দিদিভাইয়ের ওপর। অবাকও হয়েছিল খানিক। দিদিভাই কোনো জবাবই দিল না? সবাই ভাববে না, দিদিভাইয়ের বলার কিছু নেই ? কিন্তু এত সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্রি তো তিস্তা চৌধুরী নয়! যাক বাবা, দমটা যেন বুকের কাছে এসে আটকে ছিল। ঐন্দ্রিলা এতক্ষণে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

একজন জানতে চাইলেন, তাহলে যে রাজ্য সরকারগুলোর লোকসান হচ্ছে তারা তো মনের মতো ভর্তুকি না পেলে জি এস টি চালু করতেই দেবে না ম্যাম?

তিস্তা বলে,‘দেবে, দেবে। দিতে বাধ্য হবে। রাজি না হলে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যখন কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়া আর কারোরই কোনো কর নেবার সাংবিধানিক অধিকার থাকছে না। রাজ্য সরকারগুলো ধীরে ধীরে সে সব কথা বুঝতে পারবে’।

অন্য একজন আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘সব টাকাই কি কেন্দ্রীয় সরকার আদায় করে নেবে? তারপর তারা সেটা রাজ্যগুলোকে সমান ভাগে ভাগ করে দেবে’?

-না। তবে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ভদ্রলোক কেমন বোকা হয়ে যান। ‘কেন ম্যাডাম? আমাকে ধন্যবাদ কেন? আমার উত্তরটা তো ঠিক হয় নি বললেন’?

-একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আপনি সামনে এনে দিয়েছেন। যে সব দেশে জি এস টি চালু হয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের দেশের জি এস টি আইনের কিন্তু মস্ত একটা পার্থক্য আছে। সেটা হল আমাদের জি এস টি কিন্তু একই সঙ্গে রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। কেউ কারো অধীন নয়। এই দ্বৈত কর-ব্যবস্থা পৃথিবীতে আর কোনো দেশের নেই।*১

বেশ একটা শোরগোল ওঠে। একজন নাটকীয় ঢঙে বলে ওঠেন, ‘হামারা ভারত মহান’। একজন আবার গলা খাঁকিয়ে নিয়ে যাত্রার ঢঙে ‘ভাইয়ো অর বহেনো’ বলতেই চিত্তবাবু বিড়বিড় করেন, ‘করো করো, যত পারো আহ্লাদ করো। এবার যখন একই হিসেব দেখবার জন্য রাজ্য-কেন্দ্র দুই মহাজনই খাতা নিয়ে টানাটানি করবে, একই সঙ্গে দুজনে আখের গোছাতে চাইবে, বুঝবে তখন ঠ্যালা’। চিত্তবাবুকে থামিয়ে একজন করুণ স্বরে কোণ থেকে বলে ওঠে, ‘একটু বুঝিয়ে বলুন না ম্যাম’।

তিস্তা বলে, ‘যে কোনো সাপ্লাই, অর্থাৎ বিক্রি, পরিষেবা বা উৎপাদন যেটাই হোক না কেন, যদি একই রাজ্যের দুজনের মধ্যে ঘটে থাকে, তাহলে দু-ধরনের কর আদায় করা হবে। ধরে নিন জি এস টি আইন চালু হয়ে গেছে।জুলাই মাস আর কত দেরি? এটাই ধরা যাক জুলাই মাস। আমি আপনাদের অ্যাসোসিয়েশনকে জি এস টি নিয়ে পরামর্শ দেবার জন্য ১০,০০০/- টাকার বিল দিলাম। আবারও ধরে নিচ্ছি আমার বেলায় জি এস টি-র হার ১৮%। আমি আমার বিলে আমার সাম্মানিক লিখলাম ১০,০০০/- টাকা। এর সঙ্গে লিখলাম সেন্ট্রাল জি এস টি ৯% বা ৯০০/- টাকা আর স্টেট জি এস টি ৯% বা আরও ৯০০/- টাকা। তাহলে আমার পুরো বিল হল ১১,৮০০/- টাকা। বোঝা গেল’?

-আচ্ছা ম্যাডাম, এই একই বিল যদি আজ বিহারের কোনো বার অ্যাসোসিয়েশনকে করেন, একই ট্যাক্স নেবেন? না কি তখন আবার খোল-নলচে সব পালটে যাবে ?

-দারুণ একটা প্রশ্ন করেছেন। আগে একটা কথা বলে নিই। সেন্ট্রাল জি এস টি কিন্তু সব রাজ্যেই আদায় করা হবে। এবার স্টেট জি এস টি-র কথা। আমি আর আপনাদের আসোসিয়েশন, দুজনেরই ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গ। তাই স্টেট জি এস টি নিতে হল। বিহারে যখন বলতে যাব তখন আমাকে কিন্তু নিতে হবে আই জি এস টি বা ইন্টিগ্রেটেড জি এস টি। সেটা হল যে রাজ্যে মাল পাঠাচ্ছি সেখানকার ট্যাক্স আর সেন্ট্রাল জি এস টি-র যোগফল। তখন আমার বিলে আমি লিখব, সাম্মানিক ১০,০০০/-, ইন্টিগ্রেটেড জি এস টি ১,৮০০/- টাকা। অর্থাৎ ১১,৮০০/- টাকা। একটা কথা আপনাদের জানিয়ে রাখি। একই জিনিসের স্টেট জি এস টি কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ আর বিহারে আলাদা হতে পারে। ধরুন আমাদের রাজ্যে যেটার কর ৯% বিহারে সেটা ৭% হতেও পারে। যদিও এর একটা সীমার মধ্যে সেটা ওঠানামা করবে। গোয়া দমন দিউ-এর মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর আবার আর এক রকমের ট্যাক্স-কাঠামো! 

-একজন জিগ্যেস করলেন, ‘ম্যাডাম, তাহলে যে “ওয়ান ইন্ডিয়া ওয়ান ট্যাক্স” বলা হচ্ছে’ ?

একজন বলে, ‘কবি বলেছে শোনেন নি, “বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান”? আর একজন সঙ্গে সঙ্গে তাল দেয়, ‘রাজ্যগুলোর যেন দেশের কথা ভেবে ঘুম হচ্ছে না, কী যে বলেন! সবাই নিজের আখের গুছোয়’।

-‘আজ থাক ম্যাডাম। আজ আর কিছু মাথায় ঢুকছে না। আপনারা কী বলেন’? সেক্রেটারি অতনুবাবুর কথায় সবাই মত দেন। ‘বাপ্‌রে! পড়াশুনো কি চাট্টিখানি ব্যাপার’, কে-একজন বলে ওঠে।


Students’ Corner:

  • GST is a tax on consumption of goods and services in Consuming State/s.
  • The GST would replace the following taxes: (i) Currently Central taxes: Central Excise duty b. Service Tax etc (ii) Currently State taxes : a. State VAT b. Central Sales Tax c. Luxury Tax d. Entry Tax (all forms) e. Entertainment and Amusement Tax (except when levied by the local bodies) f. Taxes on advertisements g. Purchase Tax h. Taxes on lotteries, betting and gambling i. State Surcharges and Cesses (only the relevant portion mentioned).
  • Alcohol for human consumption, petroleum crude, motor spirit (petrol), high speed diesel, natural gas and aviation turbine fuel& Electricity are kept outside the purview of GST.
  • The GST to be levied by the Centre on intra-State supply would be called the Central GST (CGST) and that to be levied by the States would be called the State GST (SGST). Similarly Integrated GST (IGST) will be levied and administered by Centre on every inter-state supply of goods and services.

 


ডিসক্লেইমার – লেখাটি শেষ হওয়া অবধি এসজিএসটি ছাড়া বাকি আইনগুলো পাশ হয়ে গেছে। প্রস্তাবিত জি এস টি আইনে খুঁটিনাটি রদবদল লেগেই আছে। কোনো পেশাদারি বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নেবার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে তখনকার পরিস্থিতি জেনে নেওয়া অবশ্য-প্রয়োজনীয়।


তথ্যসূচি –

  • রিভাইস্‌ড মডেল জি এস টি আইন। এফ এ কিউ এবং এম সি কিউ
  • ড্রাফট মডেল সি জি এস টি, এস জি এস টি এবং আই জি এস টি আইন

*১ সংবিধানের ১০১ তম সংশোধনী ২০১৬ তে রাজ্য এবং কেন্দ্রকে এক সঙ্গে কর আদায়ের অধিকার দেওয়া হয়েছে। ২৪৬এ ধারায় কেন্দ্র ও রাজ্যকে জি এস টি ধার্য করা ও সংগ্রহ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে।


To the Writter

* indicates required field
 

One thought on “GST OVERVIEW, LEVY, RATE, others – Dipak Ranjan Bhattyachariya

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *