ঈশোপনিষৎ – রাজা রামমোহন রায়

ঈশোপনিষৎ - রাজা রামমোহন রায়

ঈশোপনিষৎ

রাজা রামমোহন রায়

।।  ভূমিকা  ।।

ওঁ তৎ সৎ । ভগবান্ বেদব্যাস ব্রহ্মসূত্রের দ্বারা ইহা ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমুদায় বেদ একবাক্যতায় বুদ্ধি মন বাক্যের অগোচর যে ব্রহ্ম কেবল তাঁহাকে প্রতিপন্ন করিতেছেন । সেই সকল সূত্রের অর্থ সর্ব্বসাধারণ লোকের বুঝিবার নিমিত্তে সংক্ষেপে ভাষাতে বিবরণ করা গিয়াছে। এক্ষণে দশোপনিষৎ যে মূল বেদ ও যাহার ভাষ্য ভগবান্ শঙ্করাচার্য্য করিয়াছেন তাহার বিবরণ সেই ভাষ্যের অনুসারেতে ভাষাতে করিবার যত্ন করা গিয়াছে। সম্প্রতি সেই দশোপনিষদের মধ্যে যজুর্ব্বেদীয় ঈশোপনিষদের ভাষাবিবরণ ছাপানো গেল ; আর ক্রমে ক্রমে যে যে উপনিষদের ভাষাবিবরণ পরমেশ্বরের প্রশাদে প্রস্তুত হইবে তাহা পরে ছাপানো যাইবে ।
এই সকল উপনিষদের দ্বারা ব্যক্ত হইবে যে পরমেশ্বর একমাত্র সর্ব্বত্র ব্যাপী আমাদের ঈন্দ্রিয়ের এবং বুদ্ধির অগোচর হয়েন ; তাঁহারি উপাসনা প্রধান এবং মুক্তির প্রতি কারণ হয়, আর নাম রূপ সকল মায়ার কার্য্য হয় ।

যদি কহ পুরাণ এবং তন্ত্রাদি শাস্ত্রেতে যে সকল দেবতাদের উপাসনা লিখিয়াছেন সে সকল কি অপ্রমাণ, আর পুরাণ এবং তন্ত্রাদি কি শাস্ত্র নহেন ? তাহার উত্তর এই যে, পুরাণ এবং তন্ত্রাদি অবশ্য শাস্ত্র বটে, যেহেতু পুরাণ এবং তন্ত্রাদিতেও পরমাত্মাকে এক এবং বুদ্ধি মনের অগোচর করিয়া পুনঃ পুনঃ কহিয়াছেন । তবে পুরাণেতে এবং তন্ত্রাদিতে সাকার দেবতার বর্ণনা এবং উপাসনার যে বাহুল্যমতে লিখিয়াছেন সে প্রত্যক্ষ বটে । কিন্তু ঐ পুরাণ এবং তন্ত্রাদি সেই সাকার বর্ণনের সিদ্ধান্ত আপনিই পুনঃ পুনঃ এইরূপে করিয়াছেন যে, যে ব্যক্তি ব্রহ্মবিষয়ের শ্রবণ মননেতে অশক্ত হইবে সেই ব্যক্তি দুষ্কর্ম্মে প্রবর্ত্ত না হইয়া রূপ কল্পনা করিয়াও উপাসনার দ্বারা চিত্ত স্থির রাখিবে । পরমেশ্বরের উপাসনাতে যাহার অধিকার হয় কাল্পনিক উপাসনাতে তাহার প্রয়োজন নাই । প্রমাণ স্মার্ত্তধৃত যমদগ্নি বচন, —

                          চিন্ময়স্যাদ্বিতীয়স্য নিষ্কলস্যাশরীরিণঃ ।
                         উপাসকানাং কার্য্যার্থং ব্রহ্মণো রূপ-কল্পনা ।
                         রূপস্থানাং দেবতানাং পুংস্ত্র্যংশাদিককল্পনা ।।

জ্ঞানস্বরূপ আদ্বিতীয় উপাধিশূন্য শরীররহিত যে পরমেশ্বর, তাঁহার রূপের কল্পনা সাধকের নিমিত্তে করিয়াছেন । রূপ কল্পনার স্বীকার করিলে পুরুষের আবয়ব স্ত্রীর আবয়ব ইত্যাদি আবয়বের সুতরাং কল্পনা করিতে হয় । বিষ্ণুপুরাণের প্রথমাংশের দ্বিতীয়াধ্যায়ের বচন, –

               রূপনামাদিনির্দ্দেশবিশেষণবিবর্জ্জিতঃ ।
               অপক্ষয়বিনাশাভ্যাং পরিনামার্ত্তিজন্মভিঃ ।
               বর্জ্জিতঃ শক্যতে বক্তুং যঃ সদাস্তীতি কেবলম্ ।।
               রূপ নাম ইত্যাদি বিশেষণরহিত নাশরহিত আবস্থান্তরশূন্য, দুঃখ এবং জন্মহীন পরমাত্মা হয়েন; কেবল আছেন এই মাত্র করিয়া তাঁহাকে কহা যায় ।

 অপসু দেবা মনুষ্যাণাং দিবি দেবামণীষিণাং ।

কাষ্ঠলোষ্টেষু মূর্খানাং যুক্তস্যাত্মনি দেবতা ।।

          জলেতে ঈশ্বরবোধ ইতর মনুষ্যের হয়, গ্রহাদিতে ঈশ্বরবোধ দেবজ্ঞানীরা করেন, কাষ্ঠমৃত্তিকা ইত্যাদিতে ঈশ্বরবোধ মূর্খেরা করে, আত্মাতে ঈশ্বরবোধ জ্ঞানীরা করেন। শ্রীভাগবতে দশম স্কন্ধে চৌরাশি অধ্যায়ে ব্যাসাদির প্রতি ভগবদ্বাক্য, ———-
               কিং স্বল্পতপসাং নৃণামর্চ্চায়াং দেবচক্ষুষাং ।
               দর্শনস্পর্শনপ্রশ্নপ্রহবপাদার্চ্চনাদিকম্ ।
          ভগবান্ শ্রীধর স্বামীর ব্যাখ্যা । তীর্থস্নানাদিতে তপস্যা বুদ্ধি যাহাদের আর প্রতিমাতে দেবুতাজ্ঞান যাহাদের, এমতরূপ ব্যক্তিসকলের যোগেশ্বরদের দর্শন স্পর্শন নমস্কার আর পাদার্চ্চন অসম্ভাবনীয় হয় ।

 

(ভাষা সকল অপরিবর্তিত)

ক্রমশঃ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *