GST and Law-বঙ্গ-Law-টীকা – Dipakranjan Bhattyacharya

GST Law-বঙ্গ-Law-টীকা

Law-বঙ্গ-law-টীকা

ষষ্ঠ পর্ব

দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

একজন আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘সব টাকাই কি কেন্দ্রীয় সরকার আদায় করে নেবে? তারপর তারা সেটা রাজ্যগুলোকে সমান ভাগে ভাগ করে দেবে’? যে সব দেশে জি এস টি চালু হয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের দেশের জি এস টি আইনের কিন্তু মস্ত একটা পার্থক্য আছে। সেটা হল আমাদের জি এস টি কিন্তু একই সঙ্গে রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। কেউ কারো অধীন নয়। এই দ্বৈত কর-ব্যবস্থা পৃথিবীতে আর কোনো দেশের নেই। -তিস্তা চৌধুরী, ফিনান্সিয়াল ডিটেক্টিভ। পুরুলিয়ার গ্রামে ব্যাবসায়ীদের জিএসটি সম্পর্কে জানাতে।

INTERLUDE

সদস্যদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় কে তিস্তার কাছে প্রথমে আসবে, কে তিস্তার সঙ্গে কথা বলবে, ওকে তাদের কার্ড দেবে, তাই নিয়ে। ওর হোয়াট্‌স্‌-অ্যাপ ডিটেইল নিতে সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়েছে ওকে ঘিরে। কেউ কেউ আবার ঐন্দ্রিলাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওর থেকেই নম্বর নিতে চায়। সেক্রেটারি অতনুবাবু তিস্তাকে একরকম রেসকিউ করে ওদের সবাইকে পাশের ঘরে নিয়ে না গেলে এই পর্বটা যে কতক্ষণ চলত কে জানে। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা আগে থেকেই করা ছিল। খেতে বসেই কি নিস্তার আছে ! অনেকের প্রশ্ন তো থামতেই চায় না। এখনও দিদিভাইকে ওরা একটুও বিশ্রাম নিতে দিচ্ছে না। ঐন্দ্রিলা তিস্তার হাতে কটা সুগন্ধি পেপার-ওয়াইপ ধরিয়ে দেয়।  কানে কানে বলে, ‘মুখটা শুকিয়ে গেছে দিদিভাই’। তিস্তাকে কেউ যেন ভর করেছিল, হঠাৎ ওর সম্বিত ভাঙে। আলতো অভ্যস্ত হাতে মুখে বুলিয়ে নেয় সেটা চট করে, যা ধুলো। এগুলোতে মধু, আমন্ড আর কী কী যেন মেশানো থাকে, খুব রিফ্রেশিং।ঐন্দ্রিলা একমনে খেয়াল করে তিস্তাকে। ও জানে পারটিকুলারলি এই ফ্রাগ্রান্সটা দিদিভাইয়ের খুব পছন্দের। এবার অনেকটা রিল্যাক্সড লাগছে দিদিভাইকে। 

খাওয়া-দাওয়ার পর্ব মিটিয়ে বেরিয়ে আসতেই চিত্তবাবুর মুখোমুখি। উনি কি তিস্তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন?‘আপনার খাওয়া হয়েছে তো? আপনাকে তো কাছেপিঠে দেখলাম না’? তিস্তা জিজ্ঞেস করে। উনি বলেন, ‘বাব্বা, আপনার কাছে যাই সাধ্য কী’! একটু থেমে আবার, ‘একটা কথা বলব মা’, বলেই জিভ কাটেন চিত্তবাবু, ‘সরি ম্যাম’…

-‘না চিত্তবাবু এটা আমার ওপর অত্যন্ত অবিচার করা হবে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্বোধনটা এইভাবে ফিরিয়ে নিলে চলবে না’, তিস্তার গলার স্বর কেমন অভিমানীর মতো শোনায়। 

-‘আচ্ছা আচ্ছা তাই হবে’। একটুখানি চুপ করে থেকে চিত্তবাবু আবার বলেন, ‘ঠাকুরদার তো বিশাল লাইব্রেরি। পড়েই আছে এখন, কে পড়বে! সেখান থেকে ঠুকরে ঠুকরে বেদ উপনিষদ কিছু কিছু আমি পড়েছি। বলার মতো নয়। কিন্তু মা, এই যে ঋষিদের গল্পটা বললে, সেটা কোথা থেকে পেলে বলতো? মনে করতে পারলাম না তো কিছুতেই?

– প্রশ্নোপনিষদ্‌ নামের একটা উপনিষদে এই গল্পটা আছে। ছয় ঋষির নানান প্রশ্ন আর মহর্ষি পিপ্পলাদের উত্তর, এই নিয়েই প্রশ্নোপনিষদ্‌। আমার বোধহয় সেটা বলে দেওয়া উচিত ছিল, তাই না?

– না মা। সেটা খুব দরকারি ছিল না। তবে যেভাবে তুমি দশ হাতে এই বুড়ো মানুষগুলোর তির-বল্লম সামলালে মা, সাক্ষাৎ দশভূজাই মনে হচ্ছিল তোমায়। 

-এ তো জানা-অজানার লড়াই চিত্তবাবু। এর বেশিটাই প্রেডিক্‌টেবল। কত চোরাগোপ্তা আক্রমণ যে এখনও আমাদের মেয়েদের প্রতিদিন সামলাতে হয়! কোনো কোনো সময় সত্যিই নিজেকে লারজার দ্যান লাইফ মনে হয়। আচ্ছা আসি। কাল আবার দেখা হচ্ছে’, তিস্তা হাত জোড় করে নমস্কার করে। 

একদিনেই যেন আত্মীয়। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠতেও বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। তারপরই ঠা ঠা মাঠঘাট। হাওয়ার বেগে গাড়ি ছুটছে। আঃ! প্রাণ ভরে শ্বাস নেয় তিস্তা। পলাশে-শিমুলে আবির মাখিয়ে দিয়েছে গোটা রাস্তাটাকে।

পঞ্চকোট-র এরাস্তা সে রাস্তা
চিরুগরা -র এরাস্তা সে রাস্তা

ঐন্দ্রিলা বলে, একটা জায়গায় একটু আটকে গেছি দিদিভাই। ‘কী রে’, জানতে চায় তিস্তা। ‘তুমি যে জি এস টি-র ছ’রকম ট্যাক্স রেট বললে, সেখানে একটা রেট ছিল ৫%, তাই না দিদিভাই? কিন্তু ছউ-নাচের মুখোশ বিক্রির একজাম্পলে রেট ছিল ৬% – ৪০০০/- টাকার ওপর ২৪০ টাকা। এটা ঠিক বুঝতে পারলাম না…’। ঐন্দ্রিলার কথা শেষ হতে না হতেই তিস্তা মাঝের সিটের দিকে ঘুরে ওর থুতনিটা একটু নেড়ে দিয়ে বলে, ‘এই জন্যেই তো ঐন্দ্রিলা, ঐন্দ্রিলা’! তোর মাথাটা আমায় একটু ধার দিস তো? ‘ যা, কী যে বল না’, ঐন্দ্রিলা লাজুক হাসি হাসে। তিস্তা বলে, প্রথমে ঠিক হয়েছিল রেটটা হবে ৬%, তারপরে আলাপ-আলোচনায় সেটা ৫% এ নেমে এসেছে। আমার পাওয়ার পয়েন্টটা তৈরি করা সেই সময়ে। ভাগ্যিস তুই ধরলি, ওদের কেউ বললে তো মুখ পুড়ত’ ! উজ্জ্বল ঐন্দ্রিলার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘চেষ্টা করে যা, তোর হবে। যেখানে যেটা অসুবিধা হবে, না না, দিদিভাইকে ব্যস্ত করিস না – আমার কাছ থেকে…’। ওর কথার মাঝখানেই সবাই, ‘থাক উজ্জ্বলদা, গুলতাপ্পি বন্ধ করো’ বলে ওঠে। উজ্জ্বল হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ঐন্দ্রিলাকে তখন বলে, ‘আরে, ওটা তো জাস্ট একটা উদাহরণ, কীভাবে জি এস টি ফাংশন করছে – ৫% না হয়ে ৬% হলেও তুই ঠিকই বুঝতে পারবি’, তারপর তিস্তার দিকে ঘুরে উজ্জ্বল একবার শুধু বলে, ‘একটা কথা বলব দিদিভাই’? ‘বল বল’, তিস্তার আগ্রহ দেখে সে জিজ্ঞেস করে, ‘কী করে বুঝলে তুমি চিত্তবাবু তোমাকে কিছু বলতে চান’? তিস্তা উজ্জ্বলের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, ‘খুব সহজ। আমি দেখলাম মিঃ সিং দেও-র হাত দুটো বুকে জড়ো করা।এক পায়ের ওপরে অন্য পা-টা তুলে রাখা। ইংরেজির চারের মতো। বডি ল্যাংগুয়েজের ভাষায় একে কী বলে জানিস? এ হল ফিগার ফোর।ওর ভেতরে যে একটা তর্ক একটা উলটো যুক্তি ঘনিয়ে উঠছে, সঙ্গে সঙ্গেই তার আভাস পেয়ে গেলাম’। ব্যস্‌ যায় কোথায়, ঐন্দ্রিলা রিলে-রেসের ব্যাটনটা অমনি হাতে তুলে নেয়, ‘আচ্ছা, যদি তাই হয়ও, চিত্তবাবুর ঠাকুরদা সম্পর্কে তুমি এত কথা জানলে কী করে’! মুচকি হেসে তিস্তা বলে, ‘ সেটাই তো মিস্ট্রি’!  বলে চুপ করে যায়। এতক্ষণ একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। ঐন্দ্রিলা যা বোঝার বোঝে। দিদিভাই এখুনি আর কথা বলতে চাইছে না। সে আবার বিতানদের সঙ্গে যোগ দেয়। হই হই করতে করতে গান গাইতে গাইতে ফিরে আসছে উজ্জ্বলরা। মাঝে মাঝে বিতান একটা মজার কথা বলতে গিয়ে নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ছে। চুপ করে গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে তিস্তা।

GST and Finacial Ditective Last Part - Dipakranjan Bhattyacharya
পুরুলিয়ার সাঁওতাল গ্রামের আনাচ কানাচ

নিজেকে দেখছে। নিজের ভেতরটাকে। গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার নেমে আসছে শালপিয়ালের জঙ্গলের ওপর। ওরা যেখানে আছে, তার নাম আয়না। নিজেকে দেখার আয়না। কতদিন দেখেনি! আয়নায় ফিরে আসতে আসতে আকাশ ফেটে পড়েছে জোছনায়। চারিদিক যেন পরিদের দেশ। গাড়ি থেকে নেমেই তিস্তা আকাশের দিকে তাকায়। এই আকাশ সে কি চেনে? এই জোছনার বান-ডাকা প্রথম বসন্তের আকাশ? ঠাণ্ডা একটা হাওয়া আসছে জঙ্গলের দিক থেকে। হাওয়ার সোঁ সোঁ উঠছে থেকে থেকে। দূরে কোথাও যাত্রার আসর বসেছে বোধহয়। ঐন্দ্রিলা উজ্জ্বল বিতান সঞ্জয় সবাই গাড়ি থেকে নেমেই দৌড়ে গেছে কেয়ারটেকারের খোঁজে। আজ  নাকি ওরা বন-ফায়ার করবে। চিত্তবাবুর প্রশংশা আজ সারা গায়ে মেখে নিয়েছে তিস্তা। ঐন্দ্রিলার দুষ্টুমিগুলোও ও দারুণ উপভোগ করে। কখনো কখনো প্যাম্পারড হতে সবারই বোধহয় ভালো লাগে।তিস্তা নীচুগলায় ডাক দেয়, ‘নীল! কোথায় তুমি? কত দূরে’? কেউ কোত্থাও নেই। হুহু করছে সন্ধেরাত।দুটো হাত দুদিকে ডানার মতো মেলে উঁচুনিচু ঢেউখেলানো মাঠের ওপর দিয়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যায় তিস্তা। কোমর থেকে আলগা হয়ে ধুলোয় লুটোচ্ছে শাড়ি, হুঁশ নেই তার। গাছগাছালিকে সাক্ষী রেখে  গুনগুন করে তিস্তা আবৃত্তি করে –

‘মনে কি তোমার এখনো ওড়েনি পাখি

যতবার তাকে আন্‌মনে বেঁধে রাখি

উড়ে যায় দূরে বনে

এখনও ওড়েনি পাখি কি তোমার মনে ? …’


  • উদ্ধৃত কবিতাটি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘মনে কি তোমার’ কবিতার অংশ।

 

To the Writter

* indicates required field

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *