Financial Detective (Law-বঙ্গ-law-টীকা) – D R BHATTYACHARIYA

Law-বঙ্গ-law-টীকা

Law-বঙ্গ-law-টীকা

প্রথম পর্ব

দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

PRELUDE

‘দিদিভাই, এবার বেরোও প্লিজ। গাড়ি এসে গেছে তো। দেরি হয়ে যাবে যে’। দরজায় টক টক করে টোকা দেয় উজ্জ্বল। তিস্তার আজ কী হয়েছে কে জানে, কিছুতেই ইচ্ছে করছে না তাড়াহুড়ো করতে। কলকাতা থেকে এতটা এসেইছে তো কাজের সঙ্গে অ-কাজকে জড়িয়ে নিতে।

পুরুলিয়া ট্যাক্স প্রাক্টিশনার্‌স অ্যাসোসিয়েশন থেকে যখন প্রস্তাবটা আসে, এক রকম লুফেই নেয় তিস্তা। কী,না, ওদের মেম্বারদের জি এস টি আইনের ওপর একটা ওয়ার্কশপ করাতে হবে। ওর ফিস নিয়েও বিস্তর কথা হয়েছে। ওরা ভেবে নিয়েছিলেন তিস্তা বোধহয় মোটা একটা টাকা চেয়ে বসবে।  উলটে, তিস্তার প্রস্তাবে প্রথমে কিছুটা হকচকিয়েই গেছেন ওরা।

তিস্তা ওদের বলেছে, একটাই শর্ত আমার, আমি পুরুলিয়া শহরে থাকব না। থাকব একটু দূরের পাখিপাহাড়ে। প্রতিদিন আমি সেখান থেকে একটা পরিযায়ীর মতো আপনাদের কাছে এসে গল্পটল্প করে আবার ফিরে যাব। ‘কেন ম্যাম, আমাদের ওখানে কাজ চালাবার মতো দুয়েকটা হোটেল তো আছে। তাছাড়া পাখিপাহাড় তো সেই বাগমুণ্ডিতে, অযোধ্যা পাহাড়ের মাঠা রেঞ্জে’! ওদের সেক্রেটারিকে একরকম হাত জোড় করেই থামাতে হয়েছে কথার মাঝপথেই, ‘ প্লিজ। ধরে নিন এইটাই আমার ফিস’। ‘ঠিক আছে ম্যাডাম, সব ব্যবস্থা আমরা করছি। ওখানে জঙ্গলের মধ্যে চিরুগোরা বলে একটা ছবির মতো সাঁওতাল গ্রাম আছে। সেটা পেরিয়ে পারদি বাঁধ। একটা চমৎকার ন্যাচারাল লেক আছে।

পারদি বাঁধ
পারদি বাঁধ

পারদিতে একটাই মাত্র কটেজ। দুটো ঘর তার। ভারি সুন্দর। ওখানেই আপনাকে রাখব আমরা’, সেক্রেটারি ভদ্রলোক খুশি মনে বলে উঠেছেন। তিস্তাকে ফের বলতে হয়েছে, ‘এইবারটা আমি পাখিপাহাড়ে থাকি। আমার মনে হয় আরও দু-তিন বার আমাকে যেতে হবে আপনাদের কাছে। তখন না হয় অন্যরকম ভাবা যাবে’। ‘বেশ ম্যাম, আমরা বাধা দিচ্ছি না। আপনার কম্ফোর্টটাই শেষ কথা। কিন্তু একটা কথা, সব খরচ আমাদের’।

এইসব কথা হচ্ছিল তিস্তার অফিসে বসেই। দুজন, সেই পুরুলিয়া থেকে ওর অফিসে এসেছেন ব্যাপারটা সেট্‌ল করতে। সেদিন ছিল সোমবার। রিপোর্টিং ডেট। সারা সপ্তাহের ক্লায়েন্ট-অফিসের হাল-হকিকত জানানো আর আগামী সপ্তাহের জন্য টোটকা জেনে নেওয়া, সোমবারে ছেলেমেয়েদের কাজ মোটামুটি হল এই। কাজেই সবাই উপস্থিত। সবারই কান খাড়া এই দিকটায়।

কথার ফাঁকে হঠাৎ উজ্জ্বল বলে বসে, ‘আমার একটা প্রস্তাব ছিল দিদিভাই। বলব’? উজ্জ্বল বাইরে থেকে তিস্তাকে ফোন করলেও বিনীত ভাবে জেনে নেয়, ‘ দু মিনিট একটা কথা জিগ্যেস করার ছিল দিদিভাই। বলব’? তিস্তা রাজি হয়ে ঘাড় নাড়তেই উজ্জ্বল বলে, ‘ভাবছিলাম, খরচ তো খুব বেশি নয়। গাড়িটা সেই এতটা রাস্তা ফাঁকা যাবেই। তার চেয়ে আমরা যদি নিজেরা একটু ব্যবস্থা করে নিয়ে তোমার সঙ্গে যাই। তুমিও বোর হলেনা, আর আমদেরও খানিক বেড়ানো হয়ে গেল। তাছাড়া ঐন্দ্রিলা, বিতান বেশ কদিন ধরেই বলছে অনেকদিন অফিসে বন্দি, তাই…’। ঐন্দ্রিলা আর বিতান কিছু একটা বলতে যেতেই উজ্জ্বল ওদের দিকে ঘুরে কী যেন একটা ইশারা করে। দুজনেই সেই থেকে স্পিকটি নট। এক্কেবারে চুপ। শুধু মিটমিট করে হাসছে।

উজ্জ্বলের কথার মাঝখানেই ভদ্রলোক ওর হাত দুটো ধরে ফেলেন, ‘ এ কী কথা! আপনারা সবাই আমাদের অতিথি। দেখবেন খরচ করে দূরে দূরে বেড়াতে যাবার কোনো মানে হয় না। আমাদের পুরুলিয়াতেই আপনি সবকিছু পাবেন। পাহাড়, জঙ্গল, সমস্ত’! তিস্তা ভদ্রলোককে বোঝাতে চায়, ‘ প্লিজ, ওরা ছোটো ছেলেমেয়ে। ওদের যদি নিয়ে যাই,আমাকে কিন্তু বেয়ার করতে দেবেন’। বোঝা যায় এই কথাটায় ভদ্রলোক বেশ আহত হয়েছেন, ‘ না না, তা কি হয়? কী বলব আমি মেম্বারদের। তাছাড়া আপনাকে দেব বলে একটা অঙ্ক তো আমরা ভেবেই রেখেছি ম্যাম’। দেখো কাণ্ড!

ওদিকে উজ্জ্বল বিতান ঐন্দ্রিলাদের চোখগুলো যেন ঝকঝক করছে খুশিতে। তা, ওরা গেলে অবশ্য মন্দ হয় না। এ ক’দিন অলোকদা আর তীর্থ দিব্বি সামলে নিতে পারবে। অফিসে ধরেবেঁধে কিছু শেখানোর নানান বাধা। একজনকে পায় তো অন্যজন নেই। কিন্তু নতুন আইন এলে কাজটা তো করবে ওরাই! তিস্তার অর্ধেকটা দিন তো ক্ল্যায়েন্টের রকমারি সমস্যা শুনতেই কেটে যায়। বাকিটা আইনে, রুল-বইয়ে, নোটিফিকেশনে, সারকুলারে, হাই কোর্ট কিংবা সুপ্রিম কোর্টের নানান কেস ল-য়ে ঘাড় গুঁজে শেষ। কখন নজর দেবে ওদের দিকে? এ-ই বোধহয় ভালো হল।

তিস্তা
তিস্তা

পাখিপাহাড়ে সকাল

‘দিদিভাই। ও দিদিভাই। দেরি হয়ে যাবে যে’! আবার দরজায় শব্দ। এখনকার শাওয়ার জেলগুলো এত পিছল যে গা থেকে যেতেই চায় না। না কি এখানকার জলে মিনারেল-টিনারেল কিছু আছে? যাই হোক, দ্রুত হাতে স্ক্রাবারটা গায়ে ঘষতে থাকে তিস্তা। জলটা কী-যে ঠাণ্ডা আর হালকা। গায়ে ঢালতে প্রথমটা একটু ভয় করছিল ঠিকই, কিন্তু একবার ঢেলে নিতেই আর থামতে ইচ্ছে করছে না। স্নান আর সুগন্ধি, এই মাত্র দুটো বিলাসিতা ওর। কিন্তু আজ আর তেমন সুযোগ নেই। টাওয়েল জড়িয়ে তাড়াতাড়ি কলঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হয় ওকে। আজ প্রথম দিন তো, এথনিক পোশাকই ভালো। নইলে কারো কারো সেন্টিমেন্টে আঘাত লাগতে পারে।

অন্য ছেলেমেয়েরাই উজ্জ্বলকে ঠেলেঠুলে পাঠায় আবার তিস্তাকে ডেকে আনতে। এই নিয়ে তিন বার! ‘ দিদিভাই আজ মুডে আছে। যাও না, উজ্জ্বলদা। রোদ উঠে যাবে যে, প্লিজ’! ঐন্দ্রিলাকে  একটা রাগ-রাগ ভাব দেখিয়ে গজগজ করতে করতে উজ্জ্বল আবারও যায় ডাকতে, ‘কারোর সাহস নেই, সেই আমাকেই যেতে হবে। আমি না আসলে তখন করতিস-টা কী’? তারপর ‘দিদিভাই’ বলে যেই-না ডাকতে যাবে, তার আগেই দরজা খুলে যায় তিস্তার ঘরের। হালকা চন্দন রঙের একটা শাড়ি পড়েছে আজ তিস্তা। চুলটা ছড়িয়ে রেখেছে। একটু এলোমেলো। এখন বাঁধবে না। আঁচড়াবেও না। তাতে চুল ছিঁড়ে যায়। ওর হাঁটু অবধি এক কালো ঝরনা যেন গড়িয়ে পড়েছে। ঐন্দ্রিলা এসে তিস্তার কড়ে আঙুলটা টুক করে কামড়ে দেয়। ঐন্দ্রিলার চিবুক ধরে তিস্তাও চোখ ভাসিয়ে বলে, ‘ও খুকি, আমি কি তেমন খুকি’? ঐন্দ্রিলা ফিরতি জবাব দেয়, ‘ ইশ্‌, বুড়ি হতে তোমার বয়েই গেছে’! হই হই করে হেসে ওঠে সবাই।এবার গাড়িতে ওঠার পালা।

রাস্তা তো ফাঁকাই। বড়াভূম স্টেশনের লেভেল-ক্রসিঙে কিছুটা সময় গেছে, এই যা। ঘণ্টাখানেক লেগেছে ওদের পৌঁছোতে। সে কী খাতির! বুকটা একটু কেঁপে ওঠে তিস্তার। পারবে তো এদের ভালোবাসার, সম্মানের যোগ্য প্রতিদান দিতে?

এরপর

 

 

5 thoughts on “Financial Detective (Law-বঙ্গ-law-টীকা) – D R BHATTYACHARIYA

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *