চা বাগানের দেশে – a trip to Darjeeling and Makaibari – তুহিনা পাল

trip Darjeeling makaibari

চা বাগানের দেশে

তুহিনা পাল

অনেকদিন হয়ে গেল বাড়ি থেকে বেড়োনো হয় না। অফিস, বাড়ি, সংসার – চক্রায়ত ঘুরনন্তে। এই যখন হাঁসফাঁস অবস্থা, হঠাৎই বেমক্কা ক্যালেন্ডারের লাল কালি জানান দিল — ছুটি, ছুটি, ছুটি। দোল আর তার পরের দিন এবং শনি – রবি, সর্বসাকুল্যে চারটি দিন । চলো তাই ই সই । বাঙালির দীপুদার (দীঘা, পুরী, দার্জিলিং) দার্জিলিং – ই ঠিক হল ডেস্টিনেশন। তার সঙ্গে মকাইবাড়ি স্পেশাল – গরম চায়ের আমেজ ঠেকায় কে ?

প্ল্যানিং না হয় হল। কিন্তু ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে তো মাথায় হাত। ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী, থুড়ি রেলগাড়ী। হুট করে বেড়াতে যাওয়ার তিন দিন আগে প্ল্যান করলে যা হয় আর কি ! আগত্যা তৎকালেই টিকিট কাটা হলো । কিন্তু প্রথম বারের অনভিজ্ঞতায় টিকিট ওয়েটিং লিস্ট ৪৮ , ৪৯ – এ গিয়ে ঠেকল । এবার ব্যাপার টা আরও জটিল হয়ে গেল । যাওয়ার টিকিট , ফেরার টিকিট , হোটেল বুকিং কিছুই কনফার্ম নয় । যাওয়ার আগের দিন ও অনিশ্চিত যাওয়াটাই আদপে হবে কিনা । বাস-এ খোঁজ নিলাম । কিন্তু বিন্দুমাত্র উৎসাহ পেলাম না । এত সময় লাগছে যে, চারদিনের ছুটি রাস্তাতেই পগারপার । আপাততঃ টিকিট তৎকালে ৪ঠা মার্চ এনজিপি স্পেশাল ট্রেন রাত ১১টা ৫৫ -য় হাওড়া থেকে । সারাটা সকাল বিকেল কেটে গেল রাতের ট্রেনের আপডেট চেক করতে করতে । অফিসের কাজে মন বসাতে পারছি না । অফিস থেকে ফিরেও বসে আছি , ব্যাগ গোছানো রইল পড়ে – আগে টিকিট তো কনফার্ম হোক । শেষমেষ , রাত ৮টায় চার্ট কমপ্লিট দেখাল , আমরা পড়ে রইলাম ওয়েটিং লিস্টের চক্রজালে ।

মন ভীষণ খারাপ । রাতে বসে ঠিক হল উড়ানপথেই করা যাক শেষ প্রচেষ্টা। কিন্তু , এপথে যে আমার রাহুর দশা , যতবারই টিকিট কাটা হয়েছে আগে, প্রতিবারই ভগাদা মুচকি হাসেন আর যাওয়াটাই কোনও না কোনও ভাবে হয়ে যায় মাটি। এবারেও প্রথমে তার অন্যথা হল না, নেটওয়ার্ক এতো জ্যাম হল বুকিং সাইট – এ ঢোকাই গেলো না। দোলের দিন সকালে গালে হাত দিয়ে বসে আছি, এমন সময় মুশকিল আসান আমার ভ্রাতৃদেব মুঠোফোন বার্তা পাঠাল , যাওয়া আসার টিকিট উদ্ধার করা গেছে। ৬ই মার্চ সকাল ১০.৪০ মিঃ – এ রওনা। মাঝে আড়াই দিন। ৯ তারিখে আবার উড়ানপথে ফিরেই আমার পতিদেব যাবে অফিস আর আমি মালপত্তর নিয়ে সোজা বাড়ি।

ভীষণ ব্যস্ততায় সারাদিন ধরে প্যাকিং চললো । দৌড়-দৌড় , ঝুপ-ঝাপ , গোছ-গাছ । এটা ভুলি তো ওটা ঢোকাই – সে এক হই-হই , রই-রই ব্যপার আর একরাশ মজা ।

suitcase
ছবি প্রিয়াঙ্কা বি

প্রথমবার ফ্লাইটে চাপব, তা সে যতই হোক না ৫০ মিনিটের – একটা শিরশিরানি , গুড়গুড়ানি তো হচ্ছিল-ই । তখনও অবিশ্বাসের দোলাচলে ভাসছি । সত্যি রাহুর দশা কাটবে তো !!! তারপর সত্যি সত্যি একসময় প্লেনটি মারল এক ছুট । ছুট ছুট । ভোঁ ও ও ও । এক লাফে মাটি ছেড়ে ধীরে ধীরে মেঘেদের ছুঁয়ে ফেলল ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি  তুহিনা পাল

আর উল্টোরথে কলকাতার জঙ্গলটাও ছোট হতে হতে একটা জ্যামিতি হয়ে গেল । writer's sciptইন্ডিগো – র মহিলা ক্রুদের (এমনকি পাইলটও মহিলা) হাসি হাসি, বক্‌ বক্‌ , পাশে বরের নাকডাকানি – আমার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না । আমি খালি দূরের ছোট ছোট নদী নালা, গাড়ি বাড়ি , রেলগাড়ি – সব মিলিয়ে আমার বাংলাকে ছোট্ট ঝুলন মেলা হয়ে যেতে দেখছিলাম । তারপর হঠাৎ , হঠাৎই – দেখি দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা সপার্ষদ সভা করতে বসেছেন ।  কনুই দিয়ে গোত্তা মেরে বরকে ডাকলাম । ঐ দেখ কাঞ্চনজঙ্ঘা !!! আমাদের পুরো ভ্রমণ পথে নায়কেরwriter's scipt2 ঐ একবারই দর্শন । বাকি দিনগুলোয় উনি মেঘে মুখ ঢেকে থাকবেন ।

বাগডোগরা এয়ারপোর্টে সামান্য খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা ‘জিন’ নাম্নী জিপ ড্রাইভার কে পেলাম । আমরা যাব মিরিক ঘুরে দার্জিলিং । উনি নেবেন ২৫০০/- । তাই সই । তখনই জুটে গেল আর্মির এক রিটায়ার্ড কর্ণেল । ড্রাইভার আর ভদ্রলোকের অনেক দর কষাকষির পর ভদ্রলোক নিজে ১০০০/- আর আমরা ১৫০০/- দেব , এই চুক্তিতে রওনা দেওয়া গেল । কিন্তু ভদ্রলোকের ঐ দর কষাকষির আফটার এফেক্ট ও ড্রাইভার মশাই-এর পিছনে খোঁচা আর তার প্রত্যুত্তরে জিন বাবার উত্তর প্রত্যুত্তর সারা রাস্তা ধরে চলল । মাঝে মাঝে বেশ বিরক্ত লাগছিল , আবার কখনো কখনো এঁদের মজাদার কথোপকথন মুগ্ধও করছিল।

শহরের ঘিঞ্জি ছাড়িয়ে কিছু পরেই শুরু হল মোহিনী বনজ সম্পদের অপরূপ শোভা । ঝিরঝিরে ভাল লাগায় অচিরেই মন হয়ে যায় ফুরফুরে।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

এই পুরো জার্নির দুটো জিনিস খুব বেশি করে মনের কড়া নেড়ে গেছে । এক তো , বিভিন্ন মেজাজের , প্রদেশের বা বিদেশের মানুষের সঙ্গে ভাবের আদান – প্রদান । দুই , খুব ভীষণভাবে উপলব্ধি , আমাদের বাংলা সত্যিই কত সুন্দর । দরকার শুধু একটু যত্ন , একটু পরিচর্যা আর বিশেষভাবে রক্ষণাবেক্ষণের , যা আমরা একবিন্দুও করে উঠতে পারছি না বলেই দিন দিন কংক্রিটের জঙ্গলে ভরে উঠছে পরিবেশ । দার্জিলিং , কার্শিয়াং , মিরিক সব জায়গাতেই একই কথা , একই প্রতিচ্ছবি ।

আর্মি ভদ্রলোক নৈনিতালের মানুষ । এখন থাকেন মুম্বাই । নিজেকে থার্ড জেনারেশন আর্মি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন । নাম কর্ণেল ভি কে পান্থ । অনর্গল সুন্দর ইংরাজীতে কথা বলে চলেন ; সৌমদর্শন আর অভিজ্ঞতায় ভরপুর । প্রথম দর্শনে একদম বাজারু দরদাম করতে দেখে খারাপ লাগলেও খুব শীগ্‌গিরি সেটা কেটে যায় । সারা রাস্তা নিজের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শোনালেন । এমনকি তিনি কতটা শৌখিন তাও বোঝা গেল তার বাড়ীর সুসজ্জার বিস্তারিত বর্ণনা শুনে । বাড়ীতে মদের বার থেকে শুরু করে গোছান বাগান, মায় মেঝেতে বিছানো বাইসনের চামড়া । তারপর যখন মিরিক এল , গাড়ীটা থামল লেকের কাছে কিছুক্ষণ ।

ছবি তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

হঠাৎ করেই ভীষণ ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করল । আমরা সবাই গরম জামা নামিয়ে নিলাম । ভদ্রলোক দেখি প্রচন্ড কাশতে শুরু করলেন । সেইমাত্র জানতে পারলাম, উনি শেষ সাত বছর ধরে লাঙ্গস ক্যান্সারে ভুগছেন । লাস্ট স্টেজ । তাই এই সময় ঘরে মনমরা হয়ে বসে না থেকে জীবনের অপুর্ণ সাধ ও ভ্রমণগুলো সম্পূর্ণ করতে বেরিয়ে পড়েছেন । অদ্ভুত জীবন , অদ্ভুত মানুষ । এত সাহসী মানুষ , বাইরে থেকে কিন্তু বোঝার উপায় নেই । একা একাই চলেছেন নিজের সাধ আহ্লাদগুলো যতটা পারেন আস্বাদন করতে ।

অন্যদিকে ড্রাইভার জিন বাবা ; এম আর জিন । চেহাড়া, টাক, চিবুক থেকে নেমে আসা দু’গাছা দাড়ি – সব মিলিয়ে পুরো আলাদিনের জিনি । গায়ের ও গলার জোরে প্রমান করেই ছাড়বে রাস্তার মাইল ফলকগুলো কোনো মাতালে এসে লাগিয়ে গেছে – তাই সব ভুল, দার্জিলিং -এ প্যারাগ্লাইডিং হতেই পারে না ইত্যাদি প্রভৃতি । কিন্তু এদিকে আবার খুব বাঙালী প্রীতি । নিজের জায়গা সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান, গাড়ীকেও ভালবাসে প্রাণ দিয়ে ।

যাইহোক, এই রাস্তায় পড়ল কিছু অসাধারণ চা বাগান আর শাল সেগুনের বন ।

ছবি তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

আকাশের মুখ মেঘে ঢাকা । তাই ৩ টের সময়ই মনে হয় যেন সাঁঝবেলা । ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা জঙ্গলের অদ্ভুত এক মনপাগলা গন্ধ নিতে নিতে বিকেল ৪.৩০ টে নাগাদ আমরা পৌছালাম দার্জিলিং ।

Darjeling place of interest
ছবি : তুহিনা পাল

আমরা ছিলাম পুরো ছুটির ম্যুডে । কোনো তাড়া নেই কোথাও যাওয়ার । শুধু প্রচন্ড চা পানের নেশা চাপলো । ৬ তারিখে দার্জিলিং -এ পুরোদমে দোল খেলা হয়েছে, তাই বিকেলে অর্ধেকের বেশি দোকান বন্ধ । আরও সবচেয়ে আশ্চর্য্যের , দার্জিলিং – এ গিয়ে চা পাতা কিনে ফেলা যতটা সহজ , চা পান করতে চাইলে কেস ততই জন্ডিস । তোমার দেখা নাই রে , তোমার দেখা নাই। শেষমেষ সি সি ডি ভরসা । একেই বলে ‘দার্জিলিং-এ চা বিভ্রাট’ । যাইহোক , সেখানে বসে ধাতস্থ হয়ে ফোন লাগালাম Diocesan Guest House । http://wikitravel.org/en/Darjeeling -এ এদের বেশ প্রশংসা ছিল । কিন্তু গিয়ে সম্পূর্ণ হতাশ হতে হলো । এরপর ঘণ্টা দুয়েক ধরে মালপত্তর নিয়ে  Hill Cart Road (হিল কার্ট রোড) , কুচবিহার রোড চক্কর মারতে লাগলাম । শেষমেষ দাঁড়ালো এই , এক এক জায়গায় আমি মালপত্তরের চৌকিদার হয়ে দাঁড়াই আর আমার পতিদেব গিয়ে ঘরগুলো দেখে আসে । প্রথম প্রথম বেশ লাগছিল , বেশ একটা ভবঘুরে ভবঘুরে ব্যপার । কিন্তু এক এক করে যখন দেখা গেল , হয় ঘর খালি নেই , নয় প্রচণ্ড ভাড়া , নয় তো ঘর অত্যন্ত  জঘন্য – তখন বিরক্ত লাগতে শুরু করল । এমন-ই দাঁড়িয়ে আছি , এক স্থানীয় নেপালী ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ ।  আমাদের অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে দেখছেন , এমনকি আমাকে চৌকিদারি করতেও । তাই এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলেন কি ব্যপার ?? ভাড়া অত্যধিক শুনে দুঃখ প্রকাশ করলেন , দার্জিলিং-এর ব্যবসায়ীরা এতকিছুর পরেও বোঝে না পর্যটকই অন্নসংস্থানের দ্বার । উনি নিজে এনসিসি তে কর্মজীবন কাটিয়েছেন । শান্তিনিকেতনে ছিলেন বহুবছর । সেই সূত্র ধরে আমার ছাত্রীজীবন , ওনার কর্মজীবন – এইরকম খেজুরে আলাপ চলল । ভদ্রলোকের এখন রিটায়ার্ডমেন্ট-এর পর গাড়ীর ব্যবসা । ওনার মেয়েরাই মুলতঃ এই ব্যবসা সামাল দিচ্ছে । পাহাড়ী মেয়েদের কর্মদক্ষতার আরো এক দস্তুর উদাহরণ । ছেলে জে এন ইউ  থেকে পাশ করে চাকরী নিয়ে বাইরে আছে । ইত্যবসরে বাসস্থান জুটল । আমরা গিয়ে উঠলাম Hotel White Yak -এ । নতুন হোটেল , বয়স মেরেকেটে ৬ মাস । ভাল ব্যবস্থা , মোটামুটি আন্তর্জাতিক স্তরের পরিকাঠামো । ২০০০/- টাকার বিনিময়ে থাকা ও প্রাতঃরাশ বিনে পয়সায় । যদিও খাওয়াদাওয়া পুরোপুরি নিরামিষ । কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার বেড়িয়ে পড়লাম । হালকা হাঁটাহাটি করে Glenary -তে কন্টিনেন্টাল নৈশভোজ সেরে হোটেল ফিরে এক ঘুমে সকাল ।

খুব তাড়া ছিল না , সেই শনিবারে । তাই ধীরে সুস্থে বিনিপয়সার প্রাতরাশটি সেরে ম্যালমুখী হাঁটা শুরু হল । সেখান থেকে গেলাম চিত্তরঞ্জন দাশের শৈল শহরের বাসস্থান দেখতে । ১৬ই জুন , ১৯২৫ সালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে এই বাড়ীতেই ‘দেশবন্ধু’-র অকাল প্রয়াণ ঘটে ।  Step Aside – নামক বাড়ীটি বর্তমানে সরকার দ্বারা সংরক্ষিত ।

তারপর হাঁটতে হাঁটতে লোকজনকে জিগ্যেস করে করে ভুটিয়া বস্তি আর দার্জিলিং-এর সবচেয়ে পুরনো Monastery (মনেস্ট্রি) ছাড়িয়ে দূরে লেবং-এর সৌন্দর্য্য  উপভোগ করতে করতে অবশেষে পৌঁছালাম Tibetan Refugee Self Help Centre-এ । টুকটাক কেনাকাটা করে ওদেরই ঠিক করে দেওয়া গাড়ীতে পৌঁছালাম রোপওয় চড়তে সিংগামারি স্টেশনে । গাড়ীর ড্রাইভার সোনম , পাক্কা টিবেটন । অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলেন , একসময় দিল্লী দলাই লামার অফিসে কর্মজীবন কাটিয়েছেন , এখন অবসরপ্রাপ্ত । অত্যন্ত সৎ ভদ্রলোক । ৪০০/- টাকায় সেন্টর থেকে ঠিক হলেও যখন বুঝলেন একটা ভুল বোঝাবোঝি হয়েছে , আমরা মাত্র অর্ধেক পথেই নেমে যাব – উনি ২০০/- টাকার বেশি কিছুতেই নিলেন না ।

রোপওয়ে-তে দূর্গাপূজোর লাইন । সেসব পেরিয়ে রওনা দিতেই কয়েক মিনিটেই দার্জিলিং এর ঘিঞ্জি এক্কেবারে ভ্যানিশ । পরিবর্তে পাহাড়ী উপত্যকার গায়ে চা বাগানের সবুজ প্রলেপ । অপূর্ব সে দৃশ্য । দূরে পাহাড়ের পর পাহাড়ের সমুদ্র আর তার মাঝখানে সবুজের সমারোহ । বাগানের কিছু দূর দূর হলুদ কার্ড লাগানো – চাষ পদ্ধতির ডিটেইলিং ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

এত সৌন্দর্য্যের মাঝে হঠাৎই চোখে ধাক্কা দেয় অতিবিকট কংক্রীটের এক বেখাপ্পা নির্মিয়মান বহুতল বাড়ী । কী করে যে এমন জায়গায় হোটেল বা বাড়ী করার অনুমতি পাওয়া যায় !!! ভাবলেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে মনটা বিষিয়ে ওঠে ।

আন্দাজ ২০ মিনিট পর Tukvar Downhill Tea Garden -এ নেমে টুকটাক খেয়ে আবার রোপওয়ে চড়ে ফিরে এলাম স্টার্টিং পয়েন্ট – এ ।

tea garden Darjeeling ছবি : তুহিনা পাল

এরপর আমাদের গন্তব্য দার্জিলিং রেলওয়ে স্টেশন ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

সেখানে পৌঁছে দেখি মানুষের ঢল । ভাগ্যক্রমে , কয়লা ইঞ্জিনের ‘Joy Ride‘ – এর শেষ দুটি টিকিট পাওয়া গেল । আহা , সেদিন যদি একটা বাম্পার লটারি কাটা যেত । ওমা , দেখি আর্মির কর্ণেলটি এখানে নেপালি টুপি পড়ে হাজির । দিব্যি ইঞ্জিনে চড়ে হনুমানটি হয়ে পোজ দিয়ে ফোটো তুলছেন । তারপর , আমাদের হাত নাড়তে নাড়তে আগের ডিজেল ট্রেনটায় বেরিয়ে গেলেন ।

বিকেল ৪ টে তেই চারিদিকে ঝুমঝুমি সন্ধ্যা নেমে এল । সেই সঙ্গে শিরশিরে ঠান্ডা । তার মধ্য দিয়ে ‘কু ঝিক ঝিক’ আওয়াজ তুলে ছুটে চলল আমাদের World Heritage (ওয়ার্লড হেরিটেজ) ছোট্ট টয় ট্রেনটি । পুরো নস্ট্যালজিক ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

কিন্তু এখানেও কষ্ট দেয় , কংক্রীটের জঙ্গল । শহরটা বাড়তে বাড়তে পুরো পথটাকেই গ্রাস করে ফেলেছে । ট্রেন বাতাসিয়া লুপ হয়ে ঘুম স্টেশন অবধি গিয়ে আবার ফিরে এল দার্জিলিং-এ ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

খুব ঠান্ডা লাগছিল এবার । হিসেবের ভুলে গরম জামাকাপড় আনা হয়নি তেমন । তাই গরম জামার উদ্দ্যেশে দোকানে দোকানে ঢুঁ মারতে লাগলাম । কিন্তু একে ঠান্ডা টায় মনের মত জিনিস না পেয়ে সাত তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম হোটেলে । পরের দিনের জন্য গাড়ী ঠিক করে ( নো চয়েজ ওনলি সোনম জী ) ঘরেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া গেল ।

পরের দিন ভোর ৫টা তেই সোনম জী হাজির । লটবহর সব চাপিয়ে গাড়ী ছুটল টাইগার হিলের উদ্দ্যেশে । সানরাইজ দেখব । অত ভোরেও রাস্তা আর ফাঁকা নেই , খালি গাড়ীর সারি । পৌঁছে দেখি সে এক দক্ষযজ্ঞ । গাড়ী , মানুষ , চা – চা , কফি – কফির তুমুল আহ্বান , ছবি – গরম জামার পসরা । কে বলবে সবে ভোর ৫টা । ওয়াচ টাওয়ার টাকে তিনতলা বানিয়ে মাথাপিছু এবং তলা পিছু ৩০/- , ২০/- , ১০/- টাকা ভাড়া ঠিক করা হয়েছে । ৩০/- , ২০/- আগেই শেষ । ১০/- এ প্রায় জনসমুদ্র । এদিকে আকাশ মেঘে ছাওয়া । অনেক অপেক্ষা শেষে হলদে কমলা বলটাকে টুপুক করে উঠতে দেখা গেল আকাশে আর তার এফেক্টে উল্টোদিকে সপার্ষদ কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়েও দেখা গেল রঙের ছটা । কিন্তু সে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য , মেঘের কারনে খুব স্পষ্টও নয় ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

এবার আমরা যাব কার্শিয়াং । সোনম জী ভারী মিশুকে ।  তাই পুরো পথ জুড়ে চলল আমাদের চলন্ত আড্ডা ।  দার্জিলিং-এর রাজনীতি ও নেপালি সংখ্যাগরিষ্ঠদের পাশে টিবেটনদের অবস্থান , ওনার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা , বাপরে বাপ , বিষয় কি কিছু কম পড়িয়াছে !! ঐ সূত্রেই বললেন , একবার ওনার কর্মজীবনে দিল্লিতে নেতাজী সুভাষের অনুগামীদের সঙ্গে এক সেমিনারে আলাপ হয়েছিল । তাদের এখনও পর্যন্ত নেতাজীর জন্য বেঁচে থাকা আবেগের কথা বলতে বলতে ওনার গলাও ভারী হয়ে গেল । মাঝে রাস্তায় একটি জায়গায় প্রাতরাশ সেরে আমরা পৌঁছালাম কার্শিয়াং শহর । সেখানে উনিই উৎসাহ ভরে আমাদের প্রথমে নিয়ে গেলেন দূরবিন দারায় ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট । কার্শিয়াং , দার্জিলিং , দূরে মকাইবাড়ী সহ অন্যান্য টি এস্টেট – পুরো ছবি । যেন এক চালচিত্র । আমাদের ভাগ্য খারাপ , সেদিনও মেঘলা আকাশ । নইলে দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখা যেত ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

রাস্তায় ভালো হোটেল পড়লেও আমার প্রথম থেকেই ইচ্ছে মকাইবাড়ী HOME STAY – তেই থাকবো । সেইমতো গেলাম । মাথাপিছু ৮০০/- টাকার পরিবর্তে সুন্দর পারিবারিক থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা । সেইখানেই থাকা মনস্থির করে সোনম মশাইকে বিদায় জানান হল ।

মকাইবাড়ী সম্বন্ধে সোনম জী-র কাছে এক মজাদার খবর পাওয়া গেল । ওখানকার ম্যানেজার রাজা ব্যানার্জী সম্পর্কে । রাজা ব্যানার্জী মেজাজে নাকি পুরো ব্রিগেডিয়ার । মোটা গোঁফ , মুখে চুরুট , হাতে লাঠি , মাথায় হ্যাট (Hat) – সব মিলিয়ে পাক্কা সাহেব । কিন্তু মানুষটি বড় ভাল । আর চা সম্পর্কে ওনার জ্ঞানও অফুরন্ত । শ্রমিক , কর্মচারীরাও ওনাকে ভগবানের মত শ্রদ্ধা করে ।

মকাইবাড়ী Home Stay নিয়েও দুকথা না বললেই নয় । এস্টেটের মধ্যে মোট ২২টা বাড়ীতে একখানা করে ঘর , অ্যাটাচ্‌ড বাথরুম নিয়ে চালু হয়েছে এই ব্যবস্থা । কারখানার ১০০ মিটারের মধ্যেই এর অফিসঘর । নয়ন লামা স্থানীয় ছেলে , বুদ্ধি করে কারখানার কর্মচারীদের বাড়ীতে এই সুবন্দোবস্ত করে সমস্ত ব্যাপারটা একাই পরিচালনা করছে ।  দেখতে এমনিতে আলাভোলা , সাধাসিধে গোবেচারা , কিন্তু কনভেন্টে পড়ার দৌলতে ইংরাজীতে এক্কেবারে চোস্ত । অতিথিদের মধ্যে আবার বেশিরভাগই যে বিদেশি । বিদেশিদের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নিয়মকানুনের ব্যবস্থাও পুরো পাকা । ভারতীয়দের জন্য অবশ্য কিছুর দরকার নেই । থাকা খাওয়ার সুন্দর ব্যবস্থার পাশাপাশি এর সবচেয়ে বড় আকর্ষন – বাড়ী থেকে দু পা ফেললেই আদি দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগান ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

ঘুরে বেড়াও যত্রতত্র , বাধা দেওয়ার কেউ নেই । আর বাড়ীগুলোর লোকেরাও যেন একদম নিজেদের বাড়ীরই সদস্য । আমারা যে বাড়ী পেলাম তার কর্তাটি চা বাগানে কাজ করেন , কর্ত্রী বাচ্চাদের ক্রেশে । কুলিকামিনরা তাদের বাচ্চাদের ঐ ক্রেশে সারাদিনের জন্য গচ্ছিত রেখে নিশ্চিন্তে বাগানে কাজ করতে যায় । ছেলেটি আর বাড়ীর মেয়েটি ঘন্টাখানেকের উপর পথ পায়ে হেঁটে পড়তে যায় সুদূর স্কুলগুলিতে । ওদের কাছেই শুনলাম , বহু বিদেশি নাকি এখানে এসে গ্রামের এক একটি ছেলে মেয়ের পড়াশুনার সমস্ত খরচা বহন করার দায়িত্ব নিয়েছে ।

যাইহোক , আমরা ঘরে ঢুকেই স্নান খাওয়া সেরে দিলাম  টানা এক ঘুম । বিকেলে সেজেগুজে বেরিয়ে দেখি এক ফ্রেঞ্চ জুটি পাওলিন ও রেমি অফিসঘরে বসে আছে । কথায় কথায় জানা গেল ওরা এখন এন জে পি যাবে  । উদ্দেশ্য রাতের বারাণসী যাওয়ার ট্রেন ধরা । আমরা একসঙ্গেই কার্শিয়াং শহরে রওনা দিলাম । মেয়েটি ভীষণ মিষ্টি । দুজনেই সাধারণ ফ্রেঞ্চদের তুলনায় অনেক বেশি পরিষ্কার ইংরাজীতে কথা বলতে পারে । কার্শিয়াং শহর থেকে মকাইবাড়ী কিছু না হলেও ৪-৫ কিমি । ওরা নাকি আসার সময় পিঠের অত বোঝা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই চলে এসেছিল !! এদের রক্তে অ্যাডভেঞ্চার । কিন্তু এখন ফেরা নিয়ে ভীষণ কনফিউজড । তো , আমারাই উদ্যোগ নিয়ে ওদের জন্য কার্শিয়াং শহর থেকে একটা গাড়ী রিজার্ভড করে দিলাম । গাড়ীর লোকগুলোকেও দেদার জ্ঞান দিয়ে মাটি থেকে কিছু না হলেও দু ফুট তুলে দিলাম , ওরা বিদেশি , আমাদের অতিথি , আমাদের দেশের সন্মানের প্রশ্ন ইত্যাদি ইত্যাদি বলে – যাতে রাস্তায় কোনভাবেই ওদের ঝামেলায় না পড়তে হয় । এদিকে বিদেশি অতিথিরাও আপ্লুত । পটাপট মেইল অ্যাড্রেস দিয়ে টিয়ে ওদের দেশে যাওয়ার একপ্রস্থ আমন্ত্রণই জানিয়ে ফেলল ।

এরপর গেলাম নেতাজী সুভাষ বোস মিউজিয়াম , গিদ্দাপাহাড় । এটি আসলে নেতাজীর দাদা শরৎ চন্দ্র বসুর শৈলনিবাস । স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য নেতাজী আসতেন এখানে । বর্তমানে এটি এন এস সি বোস ইনস্টিটিউট অফ এশিয়াটিক স্টাডিজ সেন্টর । সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে । সংরক্ষণের গুনেই হোক , নেতাজীর মাহাত্য বা চারিদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্যই হোক – মনটা অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে যায় এখানে এসে । বুঝিবা অন্য এক অন্তর্লোকে পাড়ি দেয় সে ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

এখানে সন্ধ্যার পর কিছুই করার নেই । তাই ফিরে এসে ঘরেই দুজনে আড্ডা দিচ্ছিলাম । এমন সময় কানে এলো  Marjolaine Obrist – এর গলা । ছোট্ট নাম মামা (Mama) । বিকেলেই আলাপ হয়েছিল এই সুইস মেয়েটির সঙ্গে । ঘরে ফিরল সেও – আমাদের ঠিক উল্টো দিকের বাড়ীতে । একঘেয়েমি কাটাতে আমরা দুটিতে হানা দিলাম ওর আস্তানায় । এই বাড়ীর কর্তাটি আবার রাজা ব্যানার্জীর ড্রাইভার । নিজস্ব একটি অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবাও আছে । সেও যোগ দিল আমাদের আড্ডায় । একটু পরেই এল মকাইবাড়ীর স্পেশাল চা । প্রতিমাসে প্রতিটি কর্মচারী কারখানা থেকে এই চা ৪০০ গ্রাম করে পায় । কিভাবে খেতে হবে ড্রাইভার মশাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে দিলেন ।

আশ্চর্য্য মেয়ে এই মামা । এত বিচিত্র প্রজাতি , আমি বাঙালিনী বলেই হয়তো আরও বেশি করে তফাৎটা ধরা পড়ে। আজ্ঞে হ্যাঁ , সাদা চোখেই । সুইজারল্যান্ডের মত ছবির দেশে জন্মেছে । ওর নিজের কথাতেই , ওদের মত সুন্দর দেশে খাওয়া পড়া থাকা কোনকিছুরই অভাব নেই কোনো । কিন্তু নিত্যনতুন টেকনোলজির আমদানিতে বর্তমান জেনারেশন বিভ্রান্ত , দিশাহারা । Tech সর্বস্ব দুনিয়াতেই তাদের সর্বক্ষণের বিচরণ । বাইরের দুনিয়া রসাতলে গেলেও এদের কিছু যায় আসে না । এমন পরিস্থিতিতে , ৬ বছর আর্কিটেকচার ফার্মে কাজ করার পর ও ঠিক করে , অনেক হয়েছে চাকরি ঘর-সংসার । যা ছিল সম্বল সব নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে – দেখব এবার জগৎটাকে । এখানেও আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় , ওর স্বামী আবার এই সময়েই সবছেড়ে নতুন বিজনেস শুরু করেছে । তাই ওকে পুরো সঙ্গ দিতে পারেনি । কিন্তু এ নিয়ে দুজনের কোনও অভিযোগ নেই , নেই টাকাপয়সা ব্যাঙ্ক ব্যালান্স নিয়ে মাথাব্যথা । এদের দাম্পত্যে প্যাঁচপ্যাঁচানি আর অন্যের উপর আঁঠা হয়ে লেগে থাকার ঝুলোঝুলি – কিছুরই স্থান নেই । দুজন পরিণত মানুষ দুজনের একান্ত নিজস্ব জগতের পরিসরে নিজেদের মানসিক চাহিদাকেই সবচেয়ে আগে রেখেছে ।  তাই বলে সম্পর্ককে অমর্য্যদাও করে না । তিন সপ্তাহ অস্ট্রেলিয়া ঘুরে সোজা ঢুকে পড়েছে এশিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে । কখনও একা , কখনও সফর সঙ্গী জুটেছে রাস্তায় , কখনও পতিদেব সঙ্গত করে ফিরে গেছে । আমাদের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছে ততদিনে ৬-৭ মাস হয়ে গেছে ওর পরিব্রাজকের জীবন । অথচ দেখে বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই । কোনও ক্লান্তির ছাপ নেই , চোখ মুখ পুরো ঝলমল করছে । সবেতেই প্রচন্ড উৎসাহ । কিছুদিন আগের বসন্ত উৎসব শান্তিনিকেতনে কাটিয়ে এসে দোলের মাদকতায় আর রঙিন আনন্দে মশগুল । জানালো , শান্তিনিকেতন থেকে এন জে পি আসার ট্রেন-এ এসি-তে টিকিট না পেয়ে স্লিপার ক্লাস-এ আসার অভিজ্ঞতা । স্লিপার-এর নোংরা তথৈবচ অবস্থা দেখে ওর সঙ্গীদের তো অবস্থা কাহিল । আর ওদিকে , মোজার উৎকট গন্ধ , নাক ডাকানির সুর মুর্ছনা সব মিলিয়ে  Marjoline-র বহু দিনের স্বপ্নপূরণ । নিজেই বলছে , ‘ I was so excited . I can’t believe that , oh my God ! I was at Indian train !! ‘  সেদিনের ঘুমটাও নাকি এই স্বর্গীয় পরিবেশে হয়েছিল তোফা । ভাবা যায় !! কোনো নালিশ নেই , নাক সিটকানো নেই – সবই ছেলেমানুষের মন নিয়ে দেখা , তাই সব নতুন । অঙ্কোরভাটে গিয়ে নাকি একদিন ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেটে পুরো সকাল থেকে দুপুর গার্ডেনিং করে কাটিয়েছে । জাস্ট ফর এক্সপেরিয়েন্স !! ইন এ ট্রু সেন্স , আ ওয়ার্ল্ড ক্লাস টুরিস্ট । এত সাহসী মেয়ে এর আগে আমি খুব কম দেখেছি । স্যালুট ।

পরেরদিন মকাইবাড়ী কারখানার কর্মকান্ড দেখার ব্যবস্থা নয়নই করে দিল ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

মকাইবাড়ীতে সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে চা চাষ করা হয় । এমনকি কীটনাশকও অর্গানিক । বিভিন্ন মানের চা আছে এদের । Golden Tip , Silver Tip , Black Tea , White Tea , Green Tea ইত্যাদি ইত্যাদি । সবেতেই নাকি একই চা পাতা, খালি প্রসেসিং-এর কল্যাণে চা হয়ে ওঠে এক এক ধারার । এর মধ্যে Golden Tip-টির গতবছরে বাজারদর উঠেছিল প্রতি কেজি একলাখ বারো হাজার টাকা । এটিই সবচেয়ে মূল্যবান চা এখানকার । অত্যন্ত বিশেষ পদ্ধতিতে পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্নায় এই চা তোলা হয় সারা রাত ধরে – তাও দুটি পাতা একটি কুঁড়ি নয় । শুধুমাত্র কুঁড়িখানি । আমরা যখন গিয়েছিলাম তখনও চা তোলার সময় হয়নি । মার্চের শেষ থেকে শুরু হবে তোলা । সেইসময় বেড়াতে গেলে পর্যটকরাও কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে নেমে পড়তে পারেন চা তুলতে ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

এরপর আমরা রওনা দিলাম বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে । এন জে পি থেকে কার্শিয়াং হয়ে দার্জিলিং যাওয়ার তিনটি প্রধান পথ । সবচেয়ে পুরানো রাস্তা হিলকার্ট রোড , পংখাবাড়ী রোড আর নতুন তৈরী রোহিণী রোড । আমরা যেহেতু পংখাবাড়ীর পথেই ছিলাম , তাই এই পথ ধরেই এগিয়ে চললাম । রাস্তা একটু ভাঙাচোরা , এবড়ো খেবড়ো , কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের কোন তুলনা নেই ।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

ড্রাইভার মশাইও উদারহস্ত । নিজেই গাড়ী দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে ফোটো তোলার জন্য । আদিম পথ বেয়ে , যতটা পারা যায় জোরে জোরে বুকভরা অক্সিজেন নিতে নিতে আমরা ফিরে চললাম আমাদের গুহায়।

ছবি : তুহিনা পাল
ছবি : তুহিনা পাল

শুধু দুঃখ , গুহাগুলো আর উদ্দাম প্রকৃতির মধ্যে বিরাজ করে না – ছোট ছোট দেশলাই বাক্সের কংক্রীটে সাজানো থাকে মাত্র । বিদায় সবুজ , বিদায় কাঞ্চনজঙ্ঘা – আবার যেন ফিরতে পারি তোমাদের কোলে।

 

 

10 thoughts on “চা বাগানের দেশে – a trip to Darjeeling and Makaibari – তুহিনা পাল

  1. 1. Better Bengali Translator tool is recommended. Naholey bhromon kahinir moja ta aaschchey na.
    2. Flightey khaoa dey na.
    3. Bagdogra tey ekta canteen aachey at airport lobby. Food is so so.
    4. Do not follow Wikitravels while trying to book a hotel at Darjeeling. Its totally misleading
    5. Darjeeling ey bhalo chayer dokan nei. “SEKI” ?? YES. Ja paoa jay tao bihari dudh cha, chutir din bondho thakey, sutorang sadhu sabdhan. Amra chakri , chakri korey mori, kintu business potential dekheo dekhi na. obvesh. Ekidey Paris ey jao , entar chayer dokan – menu card ey Darjeeling Tea lekha
    6. Darjeeling er historical importance niyey ekta point dekhlam na. Asha korchi porer post ey dekhbo

     
    1. ট্রান্সলেটর এর সুবিধা দিতে আমরা আগ্রহী, যাতে অনেক বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারি আমাদের সংগ্রহ । তবে পাঠকদের কাছে এ জন্য কিছু সময় চেয়ে নিচ্ছি । আপনাদের পরামর্শ ও মতবাদ আমাদের কাছে মূল্যবান । সঙ্গে থাকুন ।

       
    1. ধন্যবাদ ! পাঠকদের মতামত আমাদের ঋদ্ধ করবে । সঙ্গে থাকুন ।

       
  2. ichhe gaon mon voriyeche. makaibari prottasha bariyeche. parer episode kabe prokashito have tar prohor guni. vramon kahini noi, vromoner dinolipi, barnona, anuvuti attonto sabolil. pranjol lekhonir sathe ekatto hote pari. homeroam er prochestar proti shuvechha roilo

     
    1. অশেষ ধন্যবাদ ! আপনারা এভাবেই সঙ্গে থাকলে আগামিতে আরও অনেক কিছু HomeRoam পৌঁছে দেবে ।

       
  3. চমৎকার বর্ণনা সাথে সুন্দর সব ছবি। ভ্রমণ কাহিনীগুলো এমনটি হওয়া উচিৎ… কিছুটা স্থানীয় মানুষের পরিচয় তাদের জীবন কেমন, স্থানগুলো ঐতিহ্য… সব মিলিয়ে অসাধারণ হয়েছে। মনে হয়েছে নিজেরই ভ্রমণ করছিলাম …

     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *